মেক্সিকোতেই রঙিন হয়েছিল ফুটবল বিশ্বকাপ

প্রথমবার বিশ্বকাপ সম্প্রচার শুরু হয় ১৯৬৬-তে। তখনো রঙিন টেলিভিশন আসেনি। সাদা-কালো যুগের অবসানও হয়নি। কিন্তু ফুটবল সম্প্রচার শুরু হয়ে গেছে। চল্লিশ কোটি দর্শক সেই সম্প্রচার দেখে মুগ্ধও হয়। মেক্সিকো বিশ্বকাপে সেই মুগ্ধতা রীতিমতো প্লাবনের রূপ নিয়েছিল।

৬৬-তে ইংল্যান্ড আর পশ্চিম জার্মানির ফাইনাল যারা টিভির পর্দায় দেখেছিলেন, তারা ফুটবলে মুগ্ধ ছিলেন না। মাঠে ফুটবল হলে না মুগ্ধ হবেন। ওটা ছিল অ্যান্টি-ফুটবল! ঊনবিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকজুড়ে বিশ্বব্যাপী চলে অ্যান্টি-ফুটবলের জয়জয়কার। প্রথমে কার্ল রাপ্পানের হাত ধরে শুরু হয়। পরে এলেনিও এরেরার হাত ধরে তা ইতালিতে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এলেনিও লোকটা ছিলেন আসলে ইন্তার মিলানের গুরু। তিনিই প্রথম শুরু করেন, ‘অত্যন্ত রক্ষণাত্মক ধ্বংসাত্মক শারীরিক ঘরানার ফুটবল যেখানে স্ট্রাইকার বাদে গোটা দলের ফুটবলারদের দাঁড় করানো হয় বলের পেছনে। এভাবেই তারা বিপক্ষের গোল দেওয়া আটকাতে চায়।’

এই অ্যান্টি-ফুটবলের সুন্দর একটা নাম দিয়েছিল ইতালি। কাতানেচিও। ’৬৬ বিশ্বকাপে যার সফল প্রয়োগ। আর সেই প্রয়োগ এত কুৎসিত, এত মারকুটে, এত নেতিবাচক ছিল যে গ্যারিঞ্চা, গিলমার,

সান্তোস, জোয়ারজিনহো, টোস্টাও, গারসেন এবং পেলের ব্রাজিলও মাত্র তিন ম্যাচ খেলে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল। শুধু কি তাই? প্রথম ম্যাচে বুলগেরিয়ার বিরুদ্ধে পেলে গোল করেন। কিন্তু সেই ম্যাচে তাকে এমন ভাবে মারা হয়েছিল যে হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে খেলতে পারেননি। ইউসেবিওর পর্তুগালের বিপক্ষে

তৃতীয় ম্যাচে  খোঁড়াতে খোঁড়াতে মাঠে নামেন। দল হারে ৩-১ এ। পেলেকে এত বেশি ফাউল করা হয়েছিল যে তিনি ক্ষোভে অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেন। পরে মেক্সিকো বিশ্বকাপের আগে অবসর ভেঙে মাঠে ফিরেছিলেন। এবং ইতালির চরম নেতিবাচক ফুটবলের ঢেউ থামিয়ে খেলায় আবার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭০ বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতালিকে  ৪-১ গোলে হারিয়ে ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর লেখা হয়েছিল, ‘কাতানেচিও পরাস্ত, আনন্দে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে শিখল ফুটবল’।

টেলিভিশনের পর্দায় তো বটেই, ’৭০-এর বিশ্বকাপে মাঠের ফুটবলেও রঙের অভাব ছিল না। কার্লোস আলবার্তোর প্রেসিডেন্ট’স গোল তো ছিলই। সঙ্গে ছিলেন ময়ূরপুচ্ছ মেলে ফুটবল পায়ে নাচতে থাকা স্বয়ং পেলে।

প্রেসিডেন্ট’স গোল কী তা জানা যাক। ৭০ বিশ্বকাপ ফাইনালের দিন সকালে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট মেক্সিকো সিটিতে পা দিয়েই বলেন, কাপ জিতবে ব্রাজিল। ফল হবে ৪-১। শেষ গোল করবেন কার্লোস। প্রেসিডেন্টের কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়। প্রেসিডেন্ট’স গোলের জনক কার্লোসও পেয়ে যান অমরত্ব। ফাইনালে যে গোলটা তিনি করেছিলেন তাতে এমনিতেই অমরত্ব পেতেন। পেলের টিমের ডিফেন্ডারের গোলকে সর্বকালের সেরার তালিকায় রেখেছে ফিফা।  কার্লোস আলবার্তো নিজের সেই গোল নিয়ে পরে বলেছিলেন, ‘গোলটার পর মেক্সিকোতে সবাই দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়েছিল। ওটার জন্য ফিফা দু’বার দুটি ট্রফি দিয়েছে আমাকে। শেষটা এই তো ২০১০-এ! আমাকে যদি নিজের ফুটবলজীবনের সেরা ছবি বাছতে বলেন, ওই গোলটাই বাছব। এখনো স্বপ্নের মতো মনে হয়।’

না মনে হওয়ার কোনো কারণ নেই। দলটাও ছিল স্বপ্নের। তারা খেলতোও স্বপ্নময় ফুটবল। ব্রাজিল দলে ছিলেন টোস্টাও, রিভেলিনো, গার্সন, পেলে। সবাই কিন্তু যে যার ক্লাবে আলাদা আলাদা দশ নম্বর জার্সি পরতেন। দল হিসেবে অত ভালো হয়ে উঠতে পেরেছিলেন হয়তো পেলের কারনেই, ‘আমি তখন সক্ষমতার শীর্ষে। দলটাও ছিল অসাধারণ।’ কেমন অসাধারণ? পেরুর ফুটবলার তিয়োফিলো কাবিলাস লিখেছিলেন, ‘মনে হতো দশ নম্বর জার্সিতে চারজন খেলছে। আমরা চার গোল দিলে ওরা আট গোল দেওয়ার ক্ষমতা রাখত।’ সেই গোলও আবার যেমন তেমন নয়। কোনোটা ফুলের মতো। কোনোটা ঢেউয়ের মতো। আর সবগুলোই রঙিন, উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত। 

ঠিক ৫০ বছর আগের আজকের দিনে (১৭ জুন) মেক্সিকো বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলেছিল ব্রাজিল উরুগুয়ের বিপক্ষে। জিতেছিল ৩-১ গোলে। ১৭ জুন ব্রাজিলের আরেকটি সাফল্যের দিন। ১৯৬২’র বিশ্বকাপ জিতেছিল ব্রাজিল চেকসেøাভাকিয়াকে ফাইনালে হারিয়ে। সেই ফাইনালে পেলে ছিলেন না, গ্রুপ পর্বে এই চেকদের বিপক্ষেই দূরপাল্লার একটি শট নিতে গিয়ে ইনজুরিতে পড়ায়।

সর্বকালের সেরা ফুটবলারের শেষ বিশ্বকাপটির ফাইনাল হয়েছিল ৭০-এর ২১ জুন। টিভির পর্দায় রঙিন সেই ফাইনাল আরও মধুর হয়েছিল ফুটবল সৌন্দর্যের কারণে। আক্ষরিক অর্থেই মেক্সিকোতে রঙিন হয়েছিল বিশ্বকাপ।