দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের খানপাড়া এলাকার মনছুর আলী (৭০) কানে শোনেন না দীর্ঘদিন ধরে। বয়সের ভারে গায়ের চামড়া ঝুলে পড়েছে। ঘরে জায়গা সংকুলানের অভাবে থাকেন বারান্দায়! বয়স হলেও মাত্র ৭ হাজার টাকার জন্য মিলছে না বয়স্কভাতার কার্ড! হাতে লাঠি আর নাতির উপর ভর করেই চলছে মনছুর আলীর বর্তমান জীবন।
কানে না শোনার কারণে কথাও বলেন না কারো সাথে। ইশারায় একটু আধটু কথা চলে। শেষ বয়সে এসে বয়স্কভাতার কার্ড করানোর জন্য অনেক দৌড়ঝাপ করেছেন তার ছেলে ও মেয়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেখানকার সংরক্ষিত ইউপি সদস্যর দাবি ছিল ৭ হাজার টাকা দিলে কার্ড হবে না দিলে হবে না। এই টাকা দিতে না পারায় মনছুর আলীর বয়স্কভাতার কার্ডটি এখনো হয়নি।
এই অভিযোগ শুধু মনছুর আলীর একার নয়! এর থেকেও গুরুতর অভিযোগ আছে মোস্তফাপুর ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নারী ইউপি সদস্য মোছা. শাহানাজ পারভীনের বিরুদ্ধে। টাকা ছাড়া তিনি কোনো কাজই করেন না। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এসব করতে গেলে অগ্রিম টাকা দিতে হয় ওই ইউপি সদস্যকে।
ওই এলাকার ফামেনা বেগম (৬৯) চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বলেন, ‘আমার ছেলে নেই। এক মেয়ে। তাকেও বিয়ে দিয়েছিলাম অন্যের কাছে হাত পেতে। আমার স্বামী বয়স্ক ভাতার টাকা পেতেন। আমার স্বামী মারা যাবার পর আমি বিধবা হয়ে যাই। জমিজমা না থাকায় বোনের বাড়িতে আশ্রয় নেই। আমার স্বামীর বয়স্ক ভাতার কার্ডটি আমার নামে করে দিতে আমার কাছে ৬ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন ওই মেম্বরনী। একদিন শাহানাজ পারভীনের স্বামী আমাকে জানালেন আমার বয়স্ক ভাতার টাকা আসছে। আমি পার্বতীপুরে টাকা তুলতে গেলাম।
ফাতেমা বেগম বলেন, ‘আমাকে যখন ম্যানেজার (সমাজসেবা কর্মকর্তা) বললেন, আপনার স্বামীর মৃত্যুর টাকা ৩ হাজার এবং আপনার ২ মাসের ৩ হাজার টাকা। মোট ৬ হাজার টাকা আমার হাতে দিলেন। টাকাটা আমার হাতে আসার পরই আমাকে শাহানাজ পারভীন পাশের একটি হোটেলে ডেকে নিয়ে গেলেন। তখন আমি ভাবলাম, আমি পেলাম টাকা আর নাস্তা খাওয়ার জন্য আমাকে হোটেলে ডাকছে মেম্বরনী! হোটেলে বসেই আমার কাছে মেম্বরনী টাকা চাচ্ছে। মেম্বরনী আমার হাত থেকে ৬ হাজার টাকাই কেড়ে নিলেন।
আমাকে বললেন, এটা তোর স্বামীর টাকা নয়। আমি কার্ড করে দিয়েছি এটা আমার টাকা। তখন আমার মেয়েটা বাড়িতে ছিল বিধায় আমাকে ৫০০ টাকা হাতে দিয়ে বাকি সাড়ে ৫ হাজার টাকা শাহানাজ মেম্বরনী নিয়ে গেলেন!’
সরেজমিন ওই এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টাকা ছাড়া শাহানাজ পারভীন কোনো ধরনের কাজই করেন না। শুধু তাই নয়, ওই ইউপি সদস্য নিজের বাপের নামে বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দিয়েছেন এবং মায়ের নামে ১০ টাকার বিশেষ ওএমএসের কার্ড করে দিয়েছেন। এছাড়াও স্বামীকে ৪০ দিনের মাটি কাটার আওতায় নিয়ে এসেছেন। জমিজমা না থাকলেও ওই ইউপি সদস্যর বাবা দিয়েছেন ফ্লাট বাড়ি। যে মানুষ অন্যের বাড়িতে কিছুদিন আগেও কাজ করতেন তিনি এখন ফ্লাট বাড়ির মালিক! নিয়মিত পাচ্ছেন বয়স্ক ভাতার কার্ড এবং মা পাচ্ছেন ১০ টাকা কেজি দরের সরকারি চাল।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি সদস্য শাহানাজ পারভীন সরল বিশ্বাসেই বলে দেন এসব কথা। তবে অন্যের কাছে টাকা নিয়ে কার্ড করে দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
শাহানাজ পারভীন বলেন, ‘আমার বাবা বয়স্ক ভাতার কার্ড পান এবং আমার মা ১০ টাকা কেজির চাল পান। আর ফ্লাট বাড়িটি আমার ভাই গার্মেন্টসে চাকরি করে সে দিয়েছে। তবে এবার নাকি স্কুলের মাঠে বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা যারা পাবেন তাদের স্কুলের মাঠে ডেকেছেন। এজন্য কারো কাছে টাকা চাওয়ার কোনো উপায় নেই বলেও জানান তিনি।’
মোস্তফাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছাবেনুর আলমের সাথে যোগাযোগ করতে চাইলেও তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
তবে পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহানাজ মিথুন মুন্নী বলেন, ‘আমরা কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। আপনার কাছে শুনলাম। ওই ইউপি সদস্য যদি এ রকম করে থাকেন তাহলে অবশ্যই আমরা তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’