রংপুরের বদরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র উত্তম কুমার সাহা ৬ কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বুধবার বেলা ১১টায় পৌরসভা কার্যালয়ে ১১ জন কাউন্সিলর সংবাদ সম্মেলন করে এ অভিযোগ করেন।
তারা মেয়রের বিরুদ্ধে করোনার ত্রাণের ছয় লাখ টাকা এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ডেঙ্গু প্রতিরোধে বরাদ্দ আট লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেন।
অভিযোগে জামায়াত সমর্থক পরিবারের সন্তানেরা পৌর সভায় নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন কাউন্সিলরেরা।
ওই সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর খোকন কুমার দাস।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন, কাউন্সিলর একবামুল হক, ইউনুস আলী, খায়রুল আনাম, নীলকান্ত পাইকাড়, মিজানুর রহমান, তহিদুল ইসলাম বাবু, মোকছেদুর রহমান, মোকছেদুর আলম, মহিলা কাউন্সিলর আজিমা বেগম ও মিতু রানী দাস।
অপরদিকে জানা গেেছে, নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার চার দিন আগেই কোটি টাকা নিয়ে মেয়র তার পছন্দের ছয় প্রার্থীকে নিয়োগ দিচ্ছেন বলে দুই প্রার্থী স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযোগের অনুলিপি দিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের য়মন্ত্রী, অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন ও অনুবিভাগ), যুগ্ম সচিব (নগর উন্নয়ন-২ অধি শাখা, উপসচিব (পৌর-২) ও রংপুর জেলা প্রশাসক বরাবরে ।
শনিবার পৌরসভা কার্যালয়ে ছয় কর্মচারী পদে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ওইদিন বিকেল ৪টায় লিখিত এবং সন্ধ্যা ছয়টায় মৌখিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করা হয়। ওই ফলাফলে সর্ব্বোচ নম্বর পেয়েছেন যাদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ ছিল তারাই।
ওই নিয়োগ পরীক্ষায় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারি কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (ভিপি শাখা) মো. রাহাত বিন কুতুব, পৌর সচিব আবু হেনা মোর্শেদ আলী, ইঞ্জিনিয়ার নজরুল ইসলাম ও মহিলা কাউন্সিলর ফেরদৌসী বেগম।
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারাই নিয়োগ পরীক্ষায় সর্ব্বোচ নম্বর পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. রাহাত বিন কুতুব বলেন, ‘পরীক্ষা সঠিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করা হয়েছে। সর্ব্বোচ নম্বর প্রাপ্তরা মেধা তালিকায় এসেছে।’
এর বাইরে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বদরগঞ্জ পৌরসভার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, পৌর সভার আট কর্মচারী নিয়োগের ছাড়পত্র চেয়ে গত বছরের ১০ অক্টোবর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে আবেদন করেন পৌর মেয়র উত্তম কুমার সাহা। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি ওই মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (পৌর-২) ফারজানা মান্নান স্বাক্ষরিত ছয় কর্মচারী নিয়োগের অনুমতি পান বদরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র।
ছয় মাসের মধ্যে বিধি অনুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয় মন্ত্রণালয় থেকে। ওই নির্দেশ পেয়ে ছয় কর্মচারী নিয়োগের জন্য বদরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ২০ ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। ওই বিজ্ঞপ্তির আলোকে বাজার পরিদর্শক পদে আট, সহকারি কর নির্ধারক পদে ১০, কর আদায়কারী ১১, গার্ড আট, মালি দুই ও দারোয়ান পদে পাঁচ প্রার্থী আবেদন করেন।
মালি পদে আবেদনকারী তরুন কান্তি রায় ও গার্ড পদে আবেদনকারী মোস্তাফিজার রহমান লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, ‘নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার চারদিন আগেই মেয়র উত্তম কুমার সাহা রাতের আধাঁরে ছয় প্রার্থীকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিয়েছেন। ঘুষ দেওয়া যুবকদের মধ্যে তিনজনের নাম ওই অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। তারা হলেন, বাজার পরিদর্শক পদে উপজেলার কালুপাড়া ইউনিয়নের বৈরামপুর গ্রামের রিয়াদ হাসান, সহকারি কর আদায়কারী পদে বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের সড়েয়াবাড়ী গ্রামের হাকিমের ছেলে মেজবাউল সরকার, সহকারি কর নির্ধারক পদে কুড়িগ্রামের বাসিন্দা এস এম আহসানুল হক ও গার্ড পদে পৌর শহরের থানাপাড়া গ্রামের তরুন পোদ্দার ছেলে দিপংকর পোদ্দার। এ ছাড়া মালি ও দারোয়ান পদে পৌর মেয়র তার দুই পছন্দের প্রার্থীর কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তারা বলেন, শনিবারের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ফলাফলের পর ওই অভিযোগের সত্যতা মেলে। যাদের নাম অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছিল তাদের একজন বাদে সবাই নিয়োগ ও মৌখিক পরীক্ষায় সর্ব্বোচ নম্বর পেয়েছেন।
গার্ড পদে বাদ পড়া দীপংকর পোদ্দার অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাকে নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চাহিদা মতো টাকা দিতে না পারায় আমাকে পৌরসভায় নেওয়া হয়নি।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিন প্রার্থী অভিযোগ করে বলেন, ১৯৯৯ সালে পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন থেকেই পৌরসভা শাসন করে আসছেন মেয়র উত্তম কুমার সাহা। তিনি টানা ২১ বছরে পৌর সভায় একাধিক কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এবারও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই তার বিরুদ্ধে কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যে প্রার্থীর বিরুদ্ধে মেয়রকে টাকা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, তারাই পরীক্ষায় সর্ব্বোচ নম্বর পেয়েছেন। এতেই প্রমাণিত পরীক্ষা কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়েছে! ।
পৌরসভার এক কর্মচারী বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে সবকিছুই স্থবির হয়ে পড়েছে। এই মহামারি মধ্যেও মেয়র তার পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত। সফলও হয়েছেন তিনি।
উপজেলা কৃষকলীগের সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা মাহাবুবার রহমান হাবলু অভিযোগ করে বলেন, পৌরসভা প্রতিষ্ঠার ২১ বছরে একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরও চাকরি হয়নি। এটা লজ্জাজনক।
আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে মেয়র উত্তম কুমার সাহা বলেন, আমি নিয়োগ প্রার্থীর টাকা নিয়েছি এমন অভিযোগ কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। লিখিত পরীক্ষা স্বচ্ছ হয়েছে। মেধা তালিকায় ফল প্রকাশ করেছেন নিয়োগ পরীক্ষা কমিটি।
তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার আসল কারণ হচ্ছে কয়েকদিন আগে আমাকে এক ব্যক্তি তিনটি শর্ত দিয়ে ছিলেন। শর্তগুলো হচ্ছে, প্রথমত আগামী পৌর নির্বাচনে আর দাঁড়াতে পারব না- স্ট্যাম্পের ওপর আমাকে এমন লিখিত অঙ্গীকার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ওই ব্যক্তির এক প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে হবে। তৃতীয়ত নিয়োগ না দিলে তাকে ১০ লাখ টাকা দিতে হবে।
১১ কাউন্সিলরের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে পৌর সভার মেয়র উত্তম কুমার সাহা বলেন, তিনজন কাউন্সিলর তাদের স্বজনদের চাকরি চেয়েছিলেন। অষ্টম শ্রেণি এসএসসি পাশ। কিন্তু আমরা গার্ড, দারোয়ান ও মালি পদে নিয়োগ দিয়েছি তারা ডিগ্রি ও মাস্টার্স পাশ ছেলে।
জামায়াত সমর্থক সন্তানদের চাকরি দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মেয়র পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, ‘১১ কাউন্সিলরের মধ্যে আটজনই জামায়াত-শিবির ও বিএনপির সমর্থক। তারা সবসময় চায় আমাকে এবং সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে।’
টাকা আত্মসাতের বিষয়ে জানতে চাইলে মেয়র বলেন, কোনো টাকা আত্মসাৎ করা হয়নি। কিছু টাকা রেজুলেশন করে খরচ করা হয়েছে। আর কিছু টাকা পৌরসভার হিসাব নম্বরে আছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপ সচিব (পৌর-২) ফারজানা মান্নান ফোনে বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. হেলালুদ্দীন বলেন, ‘ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’