প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে সরকারের দেওয়া ২ শতাংশ নগদ সহায়তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বৈধপথে রেমিট্যান্স বাড়ছে। একই সময়ে করোনা সংকটের কারণেও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বেশি ঋণ আসছে। কমেছে আমদানি দায় পরিশোধের চাপ। এসব কারণে দেশের ইতিহাসে গতকাল বুধবার প্রথমবারের মতো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। এ নিয়ে এক মাসের মধ্যেই দুই রেকর্ড হলো রিজার্ভে।
এর আগে গত ৩ জুন প্রথমবারের মতো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে। আর গতকাল দিন শেষে রিজার্ভের পরিমাণ ৩৫ দশমিক শূন্য ৯ বিলিয়ন ডলার বা ৩ হাজার ৫০৯ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। যা টাকার অঙ্কে ২ লাখ ৯৮ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা বিনিময় হার হিসেবে)।
বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বিশে^ বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে ৫২তম। ৩৬ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ নিয়ে বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে মিসর, নাইজেরিয়া, চিলি ও বুলগেরিয়া। এভাবে রিজার্ভ বাড়তে থাকলে হয়তো আগামী কয়েক মাসে এসব দেশকে অতিক্রম করতে পারবে বাংলাদেশ। বিশে^ সবচেয়ে বেশি মার্কিন ডলারের রিজার্ভ রয়েছে চীনের হাতে। চলতি বছরের মে পর্যন্ত চীনের হাতে ৩ হাজার ১০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রিজার্ভ রয়েছে। ১ হাজার ৩৭৮ ডলার রিজার্ভ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জাপান। আর ৫০৭ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ নিয়ে ভারত রয়েছে পঞ্চম অবস্থানে।
আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রার মজুদ থাকতে হয়। বাংলাদেশের কাছে এখন যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ আছে তা দিয়ে প্রায় আট মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, দুই শতাংশ নগদ সহায়তার কারণে বিশ^ব্যাপী করোনা সংকটের মধ্যেও বৈধপথে প্রচুর রেমিট্যান্স আসছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংকট সত্ত্বেও চলতি মাসের ১৮ জুন পর্যন্ত প্রবাসীরা ১২০ কোটি ৮০ লাখ ডলার সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। আগের বছরের পুরো জুন মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৩৬ কোটি ৮২ লাখ ডলার। এ হিসেবে আগের বছরের তুলনায় চলতি জুনে রেমিট্যান্স বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আবার রেমিট্যান্স বাড়লেও করোনায় আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ায় এখন আমদানি দায় পরিশোধের তেমন চাপ নেই। যে কারণে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রচুর ডলার কিনতে হচ্ছে। মঙ্গলবারও কয়েকটি ব্যাংক থেকে প্রায় ১০ কোটি ডলার কেনে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া করোনা, উন্নয়ন ও বাজেট সহায়তায় বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি থেকেও প্রচুর ঋণ আসছে। এসব কারণেই রিজার্ভে একের পর এক রেকর্ড হচ্ছে।
প্রথমবারের মতো রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছিল ২০১৭ সালের ২২ জুন। এরপর থেকে রিজার্ভ ৩২ থেকে ৩৩ বিলিয়ন ডলারে ওঠানামা করছিল। তবে করোনাভাইরাসের সময়ে ডলারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় একের পর এক রেকর্ড হচ্ছে। তবে বেসরকারি পর্যায়ে বৈদেশিক মুদ্রার ঋণের দায় ও এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) দায় শোধ করলে এ রিজার্ভ আবারও কমে যাবে বলছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, ইরান, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপÑ এই নয়টি দেশ বর্তমানে আকুর সদস্য। এ দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ যেসব পণ্য আমদানি করে তার বিল দুই মাস পরপর আকুর মাধ্যমে পরিশোধ করে থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত দেশে ১ হাজার ৭৪৫ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। গত মার্চ থেকে মে পর্যন্ত টানা তিন মাস রেমিট্যান্স কমার পরও এ হারে প্রবৃদ্ধি রয়েছে। করোনাভাইরাসের প্রভাব শুরুর আগে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অবশ্য রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি থাকলেও আমদানি দায় পরিশোধ কমে যাওয়ায় রিজার্ভ বাড়ছে।
চলতি অর্থবছরের মে পর্যন্ত রপ্তানি আয় দেশে এসেছে ৩ হাজার ৯৬ কোটি ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ১৮ শতাংশ কম। এর মধ্যে মে মাসে রপ্তানি কমেছে ৬১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। আর গত এপ্রিলে কমেছিল ৮৩ শতাংশ। গত এপ্রিল পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ৪ হাজার ৬৪৪ কোটি ডলারের পণ্য, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ কম।