ইসলামে বর্ণবৈষম্যের স্থান নেই

ইসলামে সব শ্রেণির মানুষ মর্যাদাশীল। জাতি, ধর্ম, বর্ণের কোনো ভেদাভেদ নেই। শ্বেতাঙ্গের মর্যাদা যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনি কৃষ্ণাঙ্গেরও মর্যাদা রয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা বেশি মর্যাদাবান সেই, যে তোমাদের মধ্যে বেশি তাকওয়া অবলম্বনকারী।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১৩)

অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি। আমি তাদের স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি। তাদের উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদের অনেক সৃষ্ট বস্তুর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ৭০)

গত ২৫ মে আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক জর্জ ফ্লয়েডকে এক ঠুনকো কারণে প্রকাশ্যে দিবালোকে রাস্তায় উপুড় করে ফেলে এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা ৮ মিনিট ৫৬ সেকেন্ড তার গলা মাটিতে চেপে ধরে হত্যা করে। এতে বাকি তিন পুলিশ সদস্য নীরব সমর্থন দেয়। কারণ তারা অঘোষিতভাবে নিজেদের কৃষ্ণাঙ্গ হত্যায় দায়মুক্ত মনে করে। অবশ্য আমেরিকার এ বর্ণবাদী চরিত্র নতুন কিছু নয়।

কৃষ্ণাঙ্গদের মানবাধিকার রক্ষায় লড়াকু সৈনিক আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ মানবাধিকারকর্মী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। ১৯৬৪ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। কিন্তু শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের ক্ষোভ এতে আরও জ্বলে ওঠে। ১৯৬৮ সালের এক সকালে হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নির্মল বায়ু উপভোগরত অবস্থায় এক উগ্রপন্থি শ্বেতাঙ্গের গুলিতে তিনি প্রাণ হারান।

আরেকজন সুপ্রসিদ্ধ কৃষ্ণাঙ্গ মুষ্টিযোদ্ধা ছিলেন ক্যাসিয়াস ক্লে। যিনি ১৯৬০ সালে বক্সিংয়ে বিশ্ব অলিম্পিকে সোনা জিতেও কেবল কৃষ্ণাঙ্গ বলে একটি রেঁস্তোরায় কাজ করার সুযোগ পাননি। পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করে মোহাম্মাদ আলী ক্লে নাম ধারণ করেন। পাশাপাশি নিজেকে মানবতার সেবায় উৎসর্গ করেন। ২০১৬ সালে তার ৭৪ বছরের সংগ্রামী জীবনের অবসান হয়। তিনি আমেরিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নোবেল জয়ী বারাক হোসেন ওবামাকে দেখে যেতে পেরেছেন। কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ে সব নাগরিকের মুখে সমানাধিকারের হাসি দেখে যেতে পারেননি। আট বছরের ওবামা শাসন কৃষ্ণাঙ্গদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

অথচ রাসুল (সা.)-এর আগমনের পর কৃষ্ণাঙ্গ মানুষগুলো পেয়ে যায় শ্বেতাঙ্গ মানুষের সমান মর্যাদা, যা কেবল সম্ভব হয়েছে ইসলামের ছায়াতলে আসার কারণে। দেড় হাজার বছর আগে সব মানুষের সমান অধিকার ঘোষণা করে হাদিসে নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘অনারবদের ওপর আরব দেশের লোকের, আরব দেশের লোকের ওপর অনারবদের কোনো মর্যাদা নেই। কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের, শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সম্মান, মর্যাদা কেবল তাকওয়ার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২৩৪৮৯)

বিদায় হজের সময় আইয়ামে তাশরিকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বনবী (সা.) বক্তৃতা করেছিলেন। তাতে তিনি বলেছিলেন, ‘হে লোকজন! সাবধান, তোমাদের আল্লাহ একজন। কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের ও কোনো আরবের ওপর কোনো অনারবের, কোনো কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের ও কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কোনো ধরনের শ্রেষ্ঠত্ব নেই; আল্লাহভীতি ছাড়া। তোমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহভীরু ব্যক্তি সেই আল্লাহর কাছে সর্বাধিক মর্যাদাবান। আমি কি তোমাদের পৌঁছিয়েছি এ বাণী? সাহাবিরা বললেন, হ্যাঁ অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল, আপনি পৌঁছিয়েছেন। তখন তিনি (সা.) বললেন, তাহলে যারা এখানে উপস্থিত আছে, তারা যেন অনুপস্থিত লোকদের কাছে এ বাণী পৌঁছে দেয়।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৪১১)

অন্তরে খোদাভীতিই যেহেতু মানুষের মর্যাদা আনে, তাই বাহ্যিক দিক (চেহারা) বিবেচনা না করে তাকওয়াবান হওয়া উচিত। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা তোমাদের চেহারা-আকৃতি ও সম্পদ দেখেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও কাজ-কর্ম দেখেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৬৪; ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪১৪৩)

আর আন্তরিক নিষ্ঠা, স্বচ্ছতা ও পরহেজগারির কারণে রাসুল (সা.)-এর আগমনের আগেও কৃষ্ণাঙ্গদের মহামর্যাদায় সমাসীন করেছেন মহান আল্লাহতায়ালা। আর তারা হলেন লোকমান হাকিম [যার নামে কোরআনে ৩১তম সুরা রয়েছে], বিলাল (রা.) [ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন এবং যার হাঁটার শব্দ রাসুল (সা.) জান্নাতে শুনেছেন], সুমাইয়া (রা.) [সম্ভ্রান্ত নারী ও ইসলামের প্রথম শহীদ], আম্মার ইবনে ইয়াসির, তারিক বিন জিয়াদ, উম্মে আয়মান, উবদা ইবনে আস সামিত, উসামা ইবনে জায়েদ, সাদ আল আসওয়াদ, জুলাইবিব, মিহজা বিন সালাহ (রা.) প্রমুখ।

তাই ইসলামে অন্তর্ভুক্ত প্রত্যেকে মর্যাদাবান ।