জ্ঞান অর্জনের নির্দেশনা

আল্লাহতায়ালা মানবজাতিকে জ্ঞান অর্জনের যোগ্যতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এর মাধ্যমে মানুষ যেমন তার পার্থিব প্রয়োজন পূরণের উত্তম পন্থা আবিষ্কার করতে পারে, তেমনি আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি, ন্যায়-অন্যায় এবং আখিরাতের সফলতা-ব্যর্থতার জ্ঞানও অর্জন করতে পারে। মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণীর এ যোগ্যতা নেই। শিক্ষার মাধ্যমে অজানাকে জানার এবং জানা বিষয়কে কাজে লাগিয়ে অজানার সন্ধান করার যোগ্যতা একমাত্র মানুষেরই আছে।

ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুল (সা.)-এর ওপর হেরা গুহায় সর্বপ্রথম ওহি নাজিল হয়, ‘পড়ো, তোমার পালনকর্তার নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা আলাক, আয়াত : ০১)

পার্থিব জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় ও কল্যাণকর জ্ঞান অর্জন ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকেও কাম্য। বিধানগতভাবে জাগতিক জ্ঞান দুই প্রকার : এক. যা চর্চা করা অপরিহার্য। দুই. যা চর্চা করা নিষিদ্ধ। প্রথমটি হচ্ছে ওইসব জ্ঞান, যা জীবনযাপনের ক্ষেত্রে অপরিহার্য। যেমন চিকিৎসা, গণিত, এমনিভাবে কৃষি, রাষ্ট্রনীতি, প্রয়োজনীয় বিজ্ঞান ও দর্শন ইত্যাদির মৌলিক পর্যায়ের জ্ঞানও অপরিহার্য। পুরো জনপদে যদি এই জ্ঞানের পারদর্শী কেউ না থাকে, তাহলে সবাই অসুবিধায় পতিত হবে। পক্ষান্তরে দ্বিতীয়টি, যা মানুষকে অকল্যাণের দিকে নিয়ে যায়, তা চর্চা করা হারাম। তদ্রুপ অকল্যাণকর ও অপ্রয়োজনীয় বিষয় চর্চা করাও নিষিদ্ধ। (ইহইয়াউ উলুমিদ দীন : ১/২৯-৩০)

তবে হ্যাঁ, জাগতিক জ্ঞান অর্জনেরও একটি বিশুদ্ধ ধর্মীয় দিক রয়েছে। সে ক্ষেত্রে তা দীনি খিদমত হিসেবেই গণ্য হয়ে থাকে। যেমন বর্তমান বিজ্ঞান-প্রযুক্তির চরম উন্নতির যুগে মুসলমানদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে সর্বোচ্চ পারদর্শিতা অর্জন, দীন প্রচারের জন্য কম্পিউটার শিক্ষা ও অন্যান্য অত্যাধুনিক মাধ্যমগুলোর জ্ঞান অর্জন ইত্যাদি দীনি খিদমতের উদ্দেশ্যে হলে তা সম্পূর্ণরূপে ইসলামের খিদমত-সেবা হিসেবে গণ্য হবে। কোরআনে কারিমে মুসলমানদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ‘তোমরা তোমাদের সাধ্যমতো শক্তি অর্জন করো।’ (সুরা আনফাল, আয়াত : ৬০)

অনুরূপ হালাল পন্থায় জীবিকা উপার্জন, মা-বাবা ও আত্মীয়স্বজনের খিদমত, পরিবার-পরিজনের হক আদায়, সমাজসেবা ইত্যাদির উদ্দেশ্যে জ্ঞান অর্জন করলে এতেও সওয়াব রয়েছে। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘হালাল রিজিক সন্ধান সব মুসলমানের ওপর ফরজ।’ (আল মুজামুল আওসাত, হাদিস : ৮৬১০)

ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করে বহু আয়াত ও হাদিস বর্ণিত হয়েছে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ইমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বহু গুণ বাড়িয়ে দেবেন।’ (সুরা মুজাদালা, আয়াত : ১১)

রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে কোরআন শিক্ষা করে এবং শিক্ষা দেয়।’ (বোখারি, হাদিস : ৫০২৭)

অন্যত্র তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের জন্য কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)

আরেক হাদিসে আছে, ‘আল্লাহতায়ালা যাকে প্রভূত কল্যাণ দিতে চান, তাকে দীনের প্রজ্ঞা দান করেন।’ (বোখারি, হাদিস : ৭১)

রাসুল (সা.) আরও বলেন, ‘যে ইলম-জ্ঞান অনুসন্ধানে বের হয়, সে ফিরে আসা পর্যন্ত আল্লাহর রাস্তায় থাকে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৬৪৭)

তবে দীনি ইলমের ওই ফজিলত লাভের জন্য শর্ত হলো ‘ইখলাস’ তথা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি। পার্থিব কোনো উদ্দেশ্যে দীনি ইলম অর্জন করা হলে তার পরিণাম হবে ভয়াবহ। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়াবি স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে এমন ইলম শিখল, যা কেবল আল্লাহর জন্যই শেখা হয়, সে কিয়ামতের দিন জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৬৬৪)

ইসলামে দীনি শিক্ষার যেমন গুরুত্ব রয়েছে, তেমনি রয়েছে জাগতিক শিক্ষার গুরুত্ব। পার্থিব প্রয়োজন পূরণ ও সামাজিক ব্যবস্থাপনা ও ভারসাম্য ঠিক রাখার জন্য জাগতিক শিক্ষা অতীব জরুরি। উপরন্তু বহু দীনি কাজের জন্যও জাগতিক শিক্ষার প্রয়োজন পড়ে। পক্ষান্তরে জীবনের সব কাজ ইসলামের বিধান মোতাবেক করার জন্য দীনি শিক্ষার বিকল্প নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সমাজ যতই উন্নতি লাভ করুক, ইমান ও আল্লাহভীতি না থাকলে নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানবিক সমাজ গঠন অসম্ভব।