দেশে টানা তিন মাসের বেশি সময় লকডাউনের পর এখন সীমিত পরিসরে সবকিছু খুলেছে। শপিং মলও খোলা। কিন্তু ক্রেতা নেই বললেই চলে। এই পরিস্থিতিতে বেশ বিপাকেই পড়েছে দেশি ফ্যাশন হাউজগুলো। দেশের চারটি স্বনামধন্য ফ্যাশন ব্র্যান্ডের স্বত্বাধিকারী ও জনপ্রিয় ফ্যাশন ডিজাইনারদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন মাসিদ রণ
আস্তে আস্তে অনলাইনের দিকে ঝুঁকছি: বিপ্লব সাহা, স্বত্বাধিকারী, বিশ্বরঙ
দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছে বিশ্বরঙ। সারা দেশে আমার অনেকগুলো শোরুম। কিন্তু লকডাউনের কবলে পড়ে যে ক্ষতির মুখে পড়েছে ব্যবসা তা থেকে উত্তরণের জন্য ন্যূনতম লোকবল দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি। তারপরও শোরুমে ক্রেতার অভাবে ন্যূনতম খরচও অনেক সময় উঠে আসছে না। এখন ব্যবসা অনেকটাই অনলাইননির্ভর হয়ে গেছে। তাই এতদিন দেশি ব্র্যান্ডগুলো ফেইসবুক লাইভের মাধ্যমে ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ না করলেও এখন করতে বাধ্য হচ্ছে। আমরা বিশ্বরঙের পেজ থেকেও নিয়মিত ফেইসবুক লাইভ করছি। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তো চলতেই হবে। কিন্তু দেশি ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে যে বিশাল ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে সবচেয়ে বেশি দরকার সরকারি পদক্ষেপ। আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, যেন দেশের বিশাল সম্ভাবনাময় এই শিল্পকে আগের মতো প্রাণচঞ্চল রাখতে দ্রুত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
পুরো বছরটাই ব্যর্থ হতে পারে: লিপি খন্দকার, স্বত্বাধিকারী, বিবিয়ানা
সবার মতো আমার ব্যবসায়ও করোনার প্রভাব ভালোভাবেই পড়েছে। সবাই জানেন যে, লকডাউনের মধ্যেই কেটে গেছে দেশের সবচেয়ে বড় দুটি উৎসব পহেলা বৈশাখ আর রোজার ঈদ। মূলত এই দুটি উৎসবেই দেশি ফ্যাশন হাউজগুলোর ভালো ব্যবসা হয়। এবার আমরা তার কিছুই করতে পারিনি। এখন কোরবানির ঈদও যদি এভাবে যায় তাহলে এ বছর পুরোটাই ব্যর্থ হবে। সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা করতে পারি। কিন্তু তা সময়মতো কতটা হবে তা নিয়ে আমি সন্দিহান। সরকার যে প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আমরা লোনের জন্য বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা বলছে, সরকারি কোনো আদেশ তারা পায়নি। ফলে লোনটাও অনিশ্চিত। এভাবে চলতে থাকলে অনেক ব্যবসায়ীর জন্য ব্যবসা টিকিয়ে রাখা দুঃসাধ্য হয়ে যাবে।
বাড়ির মালিকদের সঙ্গে বসে বিষয়টি সুরাহা দরকার: হুমায়রা খান, স্বত্বাধিকারী, আনোখী
লকডাউনের কবলে পড়ে আমার ব্যবসার ভীষণ ক্ষতি হয়েছে। আমি মনে করি, আমার মতো সব দেশি ফ্যাশন হাউজেরই এমন ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমার শোরুম বনানীতে। সেখানে অনেক ছেলেমেয়ে কাজ করত। এছাড়া ফ্যাক্টরিতে আরও লোক ছিল। সবাইকে কয়েক মাস কোনো ব্যবসা ছাড়া চালানোটা কষ্টকর হয়ে গেছে। বিশেষ করে বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ বিলসহ নানা বিল দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। তারওপর আবার এখন সেভাবে ক্রেতাও নেই। এখন টুকটাক ব্যবসা করছে অনলাইনে যারা বিদেশি পণ্য বিক্রি করে তারা। আমরা তো সারা জীবন শোরুমের মাধ্যমে ব্যবসা করে এসেছি। এখন হুট করে অনলাইনে ব্যবসা করাটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাছাড়া শোরুমের ক্রেতারাই আলাদা। একটি ভালো ব্র্যান্ডে এসে তারা শুধু কাপড় কেনেই না, এটা একটা ট্রাডিশন। তারা অনেকগুলো ডিজাইন চোখের সামনে দেখবে, হাতে ধরে অনুভব করবে। সেটা তো সম্ভব নয়। সরকারের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, দেশি ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির দিকে একটু নজর দিন। বাড়িওয়ালাদের সঙ্গে বসে একটা সিদ্ধান্ত নিন। অন্যান্য বিলের ক্ষেত্রেও আমাদের একটু ছাড় দিন।
স্বল্প সুদে ব্যাংক লোন ছাড়া টিকে থাকা কঠিন: সৌমিন আফরিন, স্বত্বাধিকারী, হুর
আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এই লকডাউনের কারণে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবসা না থাকায় হাতে যে লভ্যাংশ ছিল তা শেষ হয়ে পুঁজিতেও হাত দিতে হয়েছে। তাছাড়া শোরুম ভাড়া, কর্মচারী- সবমিলিয়ে নাজেহাল অবস্থা। যদিও অনলাইনে লাইভের মাধ্যমে হুরের ফেইসবুক পেজ থেকে কিছু বিক্রি করছি। কিন্তু শোরুমে সেভাবে ক্রেতা আসছে না। গুলশান পিংক সিটির মতো জায়গায় কেমন খরচ তা সবাই জানেন। লকডাউন শুরুর আগেই ছিল পহেলা বৈশাখ। তারপর গেল ঈদ। এই দুটি বড় উৎসবেই আমাদের বিক্রি ভালো হয়। কিন্তু এবার পহেলা বৈশাখের অনেক কালেকশন আনলেও বিক্রি করতে পারিনি। সেগুলো এখন সাধারণ সময়ে বিক্রিও হবে না। যার ফলে পুঁজির একটা অংশ সেখানে আটকে পড়েছে। সামনে কোরবানি। এখন যদি পুঁজির অভাব হয় তাহলে আমার মতো ছোট ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়বে। তারা কী দিয়ে ঈদের নতুন কালেকশন তৈরি করবে। সরকার তো সব খাতেই প্রণোদনা দিচ্ছে। আমাদের দিকেও একটু দৃষ্টি দিলে ভালো হয়। বিশেষ করে এসএমই লোনের আওতায় যদি স্বল্প সুদে পুঁজির সাপোর্ট দেয় তাহলে অনেক ব্যবসায়ী বেঁচে যাবে। নয়ত এই ক্ষতি পুষিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা দুঃসাধ্য হয়ে যাবে। অনেক লোক কর্মহীন হয়ে যাবে।