সাংবাদিকের ওপর চড়াও হাসপাতালের আনসার

তদন্ত কমিটি গঠন, দুই সদস্য প্রত্যাহার

রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর স্বজন ও ফটো সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় গত শুক্রবার রাতেই হাসপাতালটি থেকে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর দুই সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঘটনা তদন্তে গতকাল শনিবার তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বাহিনীর পক্ষ থেকে। তদন্তসংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানান।

মুগদা জেনারেল হাসপাতালে গত শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে ক্যানসার আক্রান্ত এক রোগীর স্বজন শাওন হোসেনকে মারধরের ছবি তুলতে গেলে বাংলাদেশ প্রতিদিনের ফটো সাংবাদিক জয়িতা রায়কে মারধর করতে উদ্যত হন হাসপাতালের আনসার সদস্যরা। এসব ঘটনার ছবি তুলতে গিয়ে তাদের রোষানলে পড়েন দেশ রূপান্তরের ফটো সাংবাদিক রুবেল রশীদ। এ সময় তাদের হামলায় তার ক্যামেরার ফিল্টার ভেঙে যায়। এ সময় দুই সাংবাদিককে রশি দিয়ে বেঁধে রাখার হুমকিসহ অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করেন। এ ঘটনায় শুক্রবারই মুগদা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন রুবেল রশীদ। ঘটনার প্রতিকার চেয়ে গতকাল তিনি মুগদা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

এদিকে সরকারি ৫০০ শয্যার এ হাসপাতালে আনসার সদস্যদের হাতে দুই ফটো সাংবাদিক রুবেল রশীদ ও জয়িতা রায় লাঞ্ছিতের ঘটনায় গতকাল বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক কাজল হাজরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংগঠনের পক্ষ থেকে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি  হামলায় জড়িত আনসার সদস্যদের শাস্তির দাবি করেছি।

আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর উপপরিচালক (যোগাযোগ) মেহেনাজ তাবাসসুম রেবিন গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুক্রবার মুগদা হাসপাতালের ঘটনার পর আনসারের দুই সদস্যকে হাসপাতাল থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঘটনা তদন্তে শনিবার বাহিনীর পক্ষ থেকে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মুগদা থানার ওসি প্রলয় কুমার সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাংবাদিক রুবেলের করা জিডির বিষয়ে তদন্ত করছেন এসআই আকরাম হোসেন, যিনি শুক্রবার ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।

যদিও মারধরের শিকার শাওন হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, ‘ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তারা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। উল্টো পুলিশের এক কর্মকর্তা মারধর শেষে ঘটনাটি যাতে সাংবাদিকদের না বলি সে বিষয়ে শাসান।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি প্রলয় কুমার বলেন, ‘প্রকৃত ঘটনা জানার জন্যই সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছি তদন্ত কর্মকর্তাকে। কিন্তু আজ (গতকাল) হাসপাতালের কোনো টেকনিশিয়ান না থাকায় সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করতে পারেননি তদন্তকারী কর্মকর্তা।’

মারধরের  শিকার  শাওন হোসেন মুগদা মডেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। গত শুক্রবার তিনি আরও জানিয়েছিলেন, তার মা ক্যানসারের রোগী। কেমোথেরাপি দেওয়ার জন্য করোনাভাইরাস আক্রান্ত কি-না তার প্রতিবেদন লাগে। গত ২০ জুন তিনি মায়ের করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য নমুনা দিয়ে যান। তবে প্রতিবেদন না পাওয়ায় দুইবার নিয়ম অনুযায়ী হাসপাতালের নোটিস বোর্ডে অভিযোগ জানান। পরে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা আবার পরীক্ষার জন্য বলেন। সেজন্য শুক্রবার আবার পরীক্ষার জন্য মাকে নিয়ে হাসপাতালে যান। মাকে নিয়ে ভোর ৫টায় এসে লাইনে দাঁড়ানোর পরেও তাদের সিরিয়াল হয় ৩৬ নম্বরে। সেখানে দুটো লাইন হয়। একটি বিনামূল্যে বুথে নমুনা দেওয়ার, অপরটি ২০০ টাকা দিয়ে হাসপাতালে পরীক্ষা করানোর। হাসপাতালে পরীক্ষা করানোর জন্যই লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন শাওনের মা। শাওন বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী ৪০ জনের পরীক্ষা করার কথা, কিন্তু আমার মায়ের সিরিয়াল ছিল ৩৬ নম্বর। ৩৩ নম্বর সিরিয়াল চলে যাওয়ার পর হঠাৎ আনসার সদস্যরা এসে বলে, আজ আর হবে না। এরপরে বিষয়টি জানতে চাইলে তারা (আনসার) বলে, ৪০ জন হয়ে গেছে। তাই আর হবে না। তখন আমি প্রতিবাদ করলে আনসার সদস্যরা আমাকে কলার ধরে টেনেহিঁচড়ে পাশে আনসার ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে নেওয়ার পর একজন লাঠি দিয়ে, একজন ব্যাট দিয়ে বাড়ি মারে। আরেকজন এসে ৬-৭টি চড় মারে।’