বর্ষার শুরুতেই রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে খরস্রোতা মেঘনা। প্রবল ঘূর্ণিস্রোত আর ঢেউয়ের তোড়ে ভাঙছে নদীর কূল। গত কয়েক দিনের ভাঙনে চাঁদপুর সদর উপজেলার ইব্রাহিমপুর ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক বসতবাড়ি, ফসলি জমি, ছোট একটি বাজার ও বিআইডব্লিউটিসির টার্মিনালের একাংশ বিলীন হয়েছে মেঘনায়।
ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে আশপাশের কয়েক হাজার মানুষ। ভাঙন ঠেকাতে স্থানীয়রা হোগলা পাতার বাঁধ দিয়ে চেষ্টা চালাচ্ছেন। এখনই কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নিলে মেঘনা গ্রাস করে নেবে এই অঞ্চলটি। হয়তো এই বর্ষাতেই মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে ইব্রাহিমপুর ইউনিয়নের বিশাল একটি অংশ।
আবদুল মান্নান ব্যাপারী নামে সত্তর বছরের বৃদ্ধ মেঘনা নদীর ভাঙনের ছয় যুগের সাক্ষী। মেঘনা তার যৌবনকাল থেকে এখন পর্যন্ত নয়বার গ্রাস করেছে মাথা গোঁজার ঠাঁই। হিন্দুলী গ্রাম থেকে শুরু করে ইব্রাহিমপুরের মধ্যে নয়বার বসতভিটা কেড়ে নিয়েছে নদী। জীবনের শেষ বয়সে এসেও নদী তার পিছু ছাড়ছে না। বর্ষার যৌবনা মেঘনা প্রতিনিয়তই হুমকি দিয়ে যাচ্ছে আবদুল মান্নানের শেষ আশ্রয়স্থল বসতভিটা কেড়ে নেওয়ার। আর তাই সময় পেলেই অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন নদীর দিকে। এই বয়সে এসে বসতভিটা হারালে যাওয়ার আর জায়গা যে নেই তার।
ছয় ছেলে, দুই মেয়ের জনক আবদুল মান্নান ব্যাপারী বলেন, জন্মের পর থেকেই নদীভাঙনের শিকার হয়ে আসছি। এখন ভাঙনের শিকার হলে মাথা গোঁজার আর কোনো ঠাঁই থাকবে না আমাদের। এসব মনে এলেই ভয়ে হিম হয়ে যায় শরীর।
একই অবস্থা ৬০ পেরোনো আবদুল কাদির খাঁয়ের। ছয় ছেলে, দুই মেয়ে আর স্ত্রীসহ পরিবার নিয়ে কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। ইতিমধ্যে আশপাশের অনেকের বসতভিটা কেড়ে নিয়েছে মেঘনা। অভাব-অনটন আর দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্ত মানুষগুলো কেউ কেউ আত্মীয়দের বাড়িতে স্থান নিয়েছেন। অনেকেই করছেন মানবেতর জীবনযাপন। গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা যায়, মেঘনার ভাঙনের শিকার হয়ে ইতিমধ্যে অনেকেই বসতভিটা হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন পাশর্^বর্তী শরীয়তপুর জেলায় আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে। ভাঙনরোধে শেষ আশ্রয়স্থলটুকু বাঁচাতে প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নিজেদের সাধ্যমতো আশপাশের চর থেকে সংগ্রহ করা হোগলা পাতা দিয়ে বাঁধ তৈরি করছেন। কয় ঘণ্টা বা কত মিনিট টিকবে এই বাঁধÑ জানা নেই তাদের। তবু নিজেদের বসতভিটা রক্ষায় চেষ্টা করে যাচ্ছেন তারা।
ইব্রাহিমপুর ইউনিয়নের এই দুটি পরিবারের মতো তিন শতাধিক পরিবারের এখন একটাই আকুতি, ভাঙন রোধে যেন দ্রুত ব্যবস্থা নেয় কর্তৃপক্ষ। বাপ-দাদার ভিটেমাটি নদীতে বিলীন হয়ে বাস্তুহারা হতে চান না কেউই। স্থানীয়রা বলেন, আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। তাই সরকারের কাছে আকুল আবেদন, আমাদের ঘরবাড়ি রক্ষার্থে নদী ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
চাঁদপুর জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বাবুল আখতার বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে বালিভর্তি বস্তা ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় এসব বস্তা ফেলা হবে।