সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিতরণে অনিয়ম দুর্নীতি, নিয়মবহির্ভূত ডিলারকে দিয়ে তালিকা প্রস্তুত করা, মৃত ব্যক্তিসহ একই ব্যক্তির নাম তালিকায় বার বার অন্তর্ভুক্ত করাসহ নানা অভিযোগে নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইমদাদুল রহমান মুকুলকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
উপ-সচিব মোহাম্মদ ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ কথা জানিয়েছেন বলে বুধবার হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক কামরুল আহসান নিশ্চিত করেছেন।
চেয়ারম্যান মুকুল নবীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি।
গত ১৯ জুন দৈনিক দেশ রূপান্তরের শেষ পৃষ্ঠায় সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি: নবীগঞ্জে ৪ বছর ধরে চাল আত্মসাত আ.লীগ নেতার! শীর্ষক সংবাদ প্রকাশিত হয়।
সংবাদটি সংশ্লিষ্টদের নজরে পড়লেন গঠন করা হয় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি।
তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পেয়ে জেলা প্রশাসক স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন ২০০৯ এর ৩৪ ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করেন। মঙ্গলবার স্থানীয় সরকার বিভাগ ২০০৯ এর ৩৪(১) ধারায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, গজনাইপুর ইউনিয়নে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি দরের চালপ্রাপ্তির তালিকায় মোট উপকারভোগী রয়েছেন ১ হাজার ১৮৫ জন। ২০১৬ সালে ওই তালিকা তৈরি করা হয়। তখন থেকে উপকারভোগীদের চাল পাওয়ার কথা থাকলেও অনেকেই এখনো পাননি সে সুবিধা।
কোনো কোনো ব্যক্তির নাম ৩ থেকে ৪ বার রয়েছে। এদেরই একজন কুটি মিয়া। বাড়ি ইউপি চেয়ারম্যানের নিজ গ্রাম সাতাইহালে। তার নাম রয়েছে তালিকার ৬৬৬, ৬৮০, ৭২০ ও ১০৭৩ নম্বরে। এছাড়া একাধিক ব্যক্তির নাম প্রায় ৫০টির মতো রয়েছে তালিকায়। রয়েছে কয়েকজন মৃত ব্যক্তির নামও। আবার কয়েকটি গ্রামে কোনো হিন্দু পরিবার বসবাস না করলেও ওই গ্রামের তালিকায় দেওয়া হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ভুয়া নাম। তালিকায় নাম থাকলেও কোনো সময়ই চাল জুটেনি, এমন লোকের সংখ্যাও কম নয়।
তারালিয়া গ্রামের প্রায় ২২ জনের নাম আছে সুবিধাভোগীর তালিকায়। কিন্তু বাস্তবে চাল পাচ্ছেন ৩ জন। তালিকায় ৪৯৯ নম্বর থেকে ৫০৮ নম্বর পর্যন্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের ‘সরকার’ পদবিধারী বেশ কয়েক জনের নাম রয়েছে সুবিধাভোগী হিসেবে।
কিন্তু গ্রামবাসী জানান, গোপ পদধারী লোকজনের সেখানে বসবাস। তালিকায় যে সরকার পদধারী নাম রয়েছে গ্রামবাসী তাদের কাউকেই চেনেন না।
তালিকায় থাকা কয়েকজন মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও আলাপ করে জানা যায়, তারা জীবিত থাকতেও কোনো সময় চাল পাননি, মারা যাওয়ার পরও তাদের স্বজনরা জানেনই না যে তালিকায় নাম আছে।
সবচেয়ে অস্বাভাবিক হলো গজনাইপুর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকের বসবাসই নেই। কিন্তু এই গ্রামের তালিকার কিছু কল্পিত নামে স্বামী মুসলমান স্ত্রী হিন্দু আবার ছেলে হিন্দু বাবা মুসলমান দেখানো হয়েছে।
তালিকার ৫৮২ নম্বরে থাকা নাম আ. আহাদ, বাবার নাম দেওয়া হয়েছে গিরিজা সরকার। ৫৮৬ নম্বরের সুবিধাভোগীর নাম মহেশ সরকার, বাবার নাম দেওয়া হয়েছে সুনুজ উল্লা। ৫৯২ নম্বরের সুবিধাভোগীর নাম স্বরসতী সরকার, যার স্বামীর নাম দেওয়া হয়েছে আকবর মিয়া।
অর্থাৎ একই পরিবারের দুই ধর্মাবলম্বী দেখানো হয়েছে। যা বাস্তবে নেই।
গজনাইপুর ইউনিয়নের কয়েকজন ইউপি সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, তারা ইউপি চেয়ারম্যান ইমদাদুর রহমান মুকুলের নির্দেশে তালিকায় ৫০টি করে নাম দিয়েছেন। বাকি নামের বিষয়ে কোনো কিছুই তাদের জানা নেই। তারা নাম দেননি অথচ নিজ এলাকার তালিকা ভুয়া নামে ভরা দেখে নিজেরাই বোকা বনে গেছেন।