দেশে করোনা পরীক্ষার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে। গত মাসেও যেখানে গড়ে প্রতিদিন পরীক্ষা হয়েছে ১৫ হাজার ২৫১টি, সেখানে এ মাসের ১১তম দিনে সে পরীক্ষা নেমে এসেছে ১১ হাজারে। এমনকি এ সংখ্যা এ মাসের সর্বনিম্ন। অথচ এত কম পরীক্ষায়ও একদিনে সর্বোচ্চ সংক্রমণ হয়েছে গত ২৪ ঘণ্টায়। গত দু’মাস ধরেই পরীক্ষা অনুপাতে সংক্রমণের হার ২১-২২ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছিল। এবার তা একলাফে ২৪ শতাংশে উঠে গেছে।
কম পরীক্ষায় সর্বোচ্চ সংক্রমণের এ হারকে দেশের করোনা পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগজনক মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, জনসংখ্যার মধ্যে সংক্রমণ বেড়ে গেছে। কারণ এখন অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অর্থাৎ উপসর্গ দেখা দেওয়া ব্যক্তিরাই কেবল পরীক্ষার আওতায় আসছেন ও শনাক্ত হচ্ছেন।
এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরামর্শক ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরীক্ষা অনুপাতে শনাক্তের হার এক লাফে ২১-২২ শতাংশ থেকে ২৪ শতাংশে উঠেছে। পরীক্ষা কম হলে শনাক্ত কম হতে পারে। শনাক্তের হার ২৪ শতাংশ বেশ কিছু বিষয়ে ইঙ্গিত দেয়। যেমন- সংক্রমণের হার বেড়ে গেছে। কারণ সুস্পষ্ট লক্ষণ হলে এই হারটা বাড়বে। এখন যাদের উপসর্গ রয়েছে এমন নির্দিষ্ট লোকজনের নমুনা নেওয়া হচ্ছে। আরেকটা হতে পারে ল্যাবরেটরি এখন পারফেক্ট একটা জায়গা এসেছে। সেখানে ফলস নেগেটিভ কম হচ্ছে। তবে যেহেতু ১১ হাজার (গতকাল) নমুনা পরীক্ষা করে ২৪ শতাংশ শনাক্ত হার পাওয়া গেছে, তার মানে এটা স্পষ্ট যে, জনসংখ্যার মধ্যে সংক্রমণ হারটা বাড়ছে। বিশেষ যে সব এলাকায় মহামারী বেশি। সেখান থেকেই নমুনা বেশি আসে। যেমন- ওয়ারীতে খুব সুনির্দিষ্টভাবে নমুনা নেওয়া হচ্ছে। সেখানে শনাক্তের হার ৫০ শতাংশ।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, যেহেতু সারা বাংলাদেশে থেকে ১১ হাজার ১৯৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, তাই এই পরীক্ষার ফলের প্রথম বৈশিষ্ট্য সংক্রমণের হার বাড়ছে। অর্থাৎ জনসংখ্যার মধ্যে সংক্রমণ বেড়ে গেছে।
তবে দেশে সংক্রমণ বাড়ছে না বলে মনে করেন আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের যে তথ্য উপাত্ত, তাতে এখন সংক্রমণ কমার কথা। কমছে। কিন্তু হঠাৎ করে অনেক কমে যাবে, তা না। যেমন আস্তে আস্তে বেড়েছে, তেমনি আস্তে আস্তে কমবে। এখন করোনা ভাইরাসের রিপ্রোডাকশন রেট (আর-নট) এক এর নিচে আছে। এক এর নিচে যত কমতে থাকবে, ততই সংক্রমণ কমতে শুরু করবে। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে আর-নট একের নিচে আছে। আমরা সর্বশেষ দেখেছিলাম শূন্য দশমিক ৯৯ শতাংশ ও বিশেষজ্ঞ কমিটি শূন্য দশমিক ৯৩ দেখেছিল। তার মানে সংক্রমণ কমা শুরু করেছে। আমাদের লক্ষ্য ছিল একের নিচে নামানো। একের নিচে নেমে আসার অর্থই হলো সংক্রমণ কমে আসা। এক পর্যন্ত এপিডেমিক। এর নিচে যাওয়া ভালো লক্ষণ।
অবশ্য আইইডিসিআরের কর্মকর্তারা দেশে করোনা পরীক্ষার সংখ্যা কমার পেছনে বেশকিছু কারণের কথা বলেছেন। এর অন্যতম কারণ প্রভাবশালীদের অনুরোধে আগে যেসব পরীক্ষা করা হতো, এখন সেগুলো করতে হচ্ছে না। তারা বলেন, শুরুর দিকে করোনা পরীক্ষার জন্য প্রভাবশালীদের চাপ ছিল। ভিআইপিরা প্রতিদিনই তাদের পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজনসহ নানা ধরনের লোকজনের পরীক্ষার জন্য চাপ দিতেন। ফলে আইইডিসিআর কর্র্তৃপক্ষকে তাদেরই বেশি অগ্রাধিকার দিতে হতো। এমনও হয়েছে প্রতিদিনই প্রভাবশালী ও ভিআইপিকে বা তাদের বাড়ির লোকদের পরীক্ষা করতে হয়েছে। সংক্রমণ যত বেড়েছে এ সংখ্যা ততই বেড়েছে। এ সময় তাদের বাড়তি নমুনা সংগ্রহ করতে লোক পাঠাতে হতো। এসব ক্ষেত্রে তাড়াতাড়ি রিপোর্ট দেওয়ার চাপও থাকে। ফলে সাধারণ মানুষের নমুনা সংগ্রহ করতে ও রিপোর্ট পেতে দেরি হতো।
এ ব্যাপারে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, যখন ১৮ হাজার-১৯ হাজার টেস্ট করতাম, সেখানে ২৫ শতাংশ নমুনা থাকত বিভিন্ন অনুরোধের, যাদের কোনো উপসর্গ নেই, নেগেটিভ আসবে, তবুও করতে হতো।
তবে এখন পরীক্ষার সংখ্যা কমায় উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, কারণ অপ্রয়োজনীয় অনেক পরীক্ষা কমেছে। প্রকৃত যে পরিমাণ পরীক্ষা হওয়ার কথা, সেটাই হচ্ছে। আমরা টেস্টের ব্যাপারে একটু কড়াকড়ি করেছি। প্রথমত: উপসর্গ না থাকলে নমুনা নেব না। দ্বিতীয়ত: প্রথম পজিটিভ হওয়ার পর সুস্থ হলে যে নেগেটিভ পরীক্ষা করা হতো, সেই দ্বিতীয় পরীক্ষা বন্ধ করেছি। সেখানে ৬৭ হাজার রোগী এখনো আছে। তাদের একটা অংশের প্রতিদিন পরীক্ষা হতো। সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। তৃতীয় কারণ হলো- পরীক্ষার ফি ২০০ টাকা ও ৫০০ টাকা নির্ধারণ করায় আগে যে রকম সবাই একটু সন্দেহ হলেই পরীক্ষা করত, সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। বরং এখন যে টেস্ট হচ্ছে সেটা প্রকৃত টেস্ট। এটাই সন্দেহভাজন রোগীর প্রকৃত সংখ্যা।
কম নমুনা পরীক্ষার হিসাব দিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, যখন ১৮ হাজার-১৯ হাজার টেস্ট করতাম, সেখানে প্রভাবশালীদের ২৫ শতাংশ এখন আর করতে হচ্ছে না। সেটা বাদ দিলে নমুনা থাকে ১৫ হাজারের মতো। তাতে যে পজিটিভ আসত, সেটা ২৬-২৭ শতাংশ। তাহলে এই ২৬-২৭ শতাংশের মধ্যেই ‘পিক’ থাকার কথা। এখন যে ২২-২৩ শতাংশ পাচ্ছি, প্রকৃত নমুনা পরীক্ষা করে পাচ্ছি।
‘কিন্তু জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে একটা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে’Ñ উল্লেখ করে এই প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, কুরবানি ঈদের ছুটিতে আবার যদি মানুষ দলবেঁধে বাড়িতে যেতে শুরু করে তা হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা যাবে না। আরেকটা ঝুঁকি কোরবানির হাট। জাতীয় পরামর্শক কমিটিও বলেছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে কোরবানির হাট বসানো খুব কঠিন। তারপরও যদি করতে হয় তাহলে বড় খোলা মাঠে নির্দিষ্ট সংখ্যক পশুর বেশি ঢোকা যাবে না। মানুষকে মাস্ক পরে ঢুকতে হবে। বের হওয়া ও ঢোকার জন্য প্রশস্ত জায়গা থাকতে হবে। তারপরও একটা ঝুঁকি থেকেই যাবে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, নতুন ঝুঁকি তৈরি না হলে জুলাইয়ের শেষের দিকে করোনার সংক্রমণ একটা সহনীয় মাত্রায় আসবে। আর যদি কোরবানির ঝুঁকি থাকে, তাহলে পুরো আগস্ট মাস ঝুঁকি থাকবে।
কোরবানির সময় সংক্রমণ ঝুঁকি এড়াতে এই বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দেন, ঈদে মানুষকে বাড়ি যেতে দেওয়া যাবে না। এ জন্য কঠিন বিধিনিষেধ দেওয়া উচিত। আর কোরবানির হাটকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। বড় শহরগুলোতে অনলাইনে হাট করা যায়। ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত ইন্টারনেট সুবিধা আছে, সেন্টার আছে। ই-কমার্সের মাধ্যমে দুই-তিন গ্রামের পশু একসঙ্গে করে অনলাইনে বিক্রি করা যায় কি না, ভাবতে হবে। এ দুটো ব্যবস্থা নেওয়া হলে সংক্রমণের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক সংক্রমণের গতিকে উদ্বেগজনক বলছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে সংক্রমণের যে হার, সেটা উদ্বেগজনক এবং সংক্রমিত লোক যারা টেস্টের বাইরে আছে, তারা টেস্টের আওতায় না এলে সংক্রমণের মাত্রা বাড়বে। পাশাপাশি তাদের সংস্পর্শে যারা আসবে, তারাও সংক্রমণ ছড়াবে। সুতরাং সংক্রমণ বাড়বেই। আমাদের দেশে টেস্ট অনুপাতে শনাক্তের সংখ্যা আনুপাতিক হারে বেশি। এর মানে হলো আক্রান্তের সংখ্যা বেশি এবং সেটা বাড়ছে। টেস্ট কম। তারপরও ২৪ শতাংশ মানে সংক্রমিত সংখ্যা বাড়ছে। আগে ছিল ১৯-২২ শতাংশ।
পরীক্ষা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, দিন আনে দিন খায় থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্তরা পর্যন্ত ফ্রি ছিল বলে তারা স্বেচ্ছায় লাইন দিয়ে ভোগান্তি সত্ত্বেও টেস্ট করাতে গেছে। এখন ফি দিতে হচ্ছে। এতে সে টেস্ট করতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। এর ফলে অনেকেই টেস্ট করাতে আসবে না। সংক্রমিত থাকবে এবং রোগ ছড়াবে।
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, পরীক্ষা অবশ্যই বাড়াতে হবে। জনসংখ্যা অনুপাতে পরীক্ষা কম হচ্ছে। কিন্তু পরীক্ষা হচ্ছে সামগ্রিক মহামারী নিয়ন্ত্রণের একটা ধাপ। পরীক্ষার পাশাপাশি আমাদের দেখতে হবে, যে রোগী শনাক্ত হলো তাদের ফলোআপ, আইসোলেট, চিকিৎসা করা হচ্ছে কি না। সরকারের দায়িত্ব প্রত্যেক রোগীর সঙ্গে একজন ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মী যেন নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন, সেটা নিশ্চিত করা। এসব রোগীর কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং করতে হবে। শনাক্ত রোগীদের নমুনা নেওয়ার দুদিন আগে ও শনাক্ত হওয়া পর্যন্ত, এসব লোকজনের সংস্পর্শে যারা গেছেন, তাদের কোয়ারেন্টাইন করতে হবে। আর নাগরিকরা সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবে। এভাবে রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
এই বিশেষজ্ঞ মনে করেন, কিটের স্বল্পতা, ফি আরোপ, একাধিক টেস্ট করা লাগছে না ও বন্যা পরিস্থিতির কারণে পরীক্ষার সংখ্যা কমেছে। বন্যা উপদ্রুত এলাকাগুলোতে নমুনা সংগ্রহের জন্য যাওয়া হচ্ছে না, সেখানকার মানুষও নমুনা দিতে আসছে না।
পরীক্ষা বাড়ানোর ব্যাপারে তিনি বলেন, ল্যাবরেটরির সংখ্যা বাড়ালেই হবে না, সক্ষমতা বাড়ানো দরকার হবে। লোকবল ও কিট বাড়াতে হবে যাতে তিন শিফটে কাজ করতে পারে। তিন শিফটে কাজ করলে এখন যে পরীক্ষা, তার দেড়গুণ বেড়ে যাবে। অনেক ল্যাবরেটরি অনুমতি নিয়েছে। কিন্তু পরীক্ষা শুরু করছে না। ল্যাবরেটরির বায়োসেফটিসহ মান দেখবে আইসিডিডিআর’বি। আর পরীক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ করবে আইইডিসিআর। এই দুটো বিষয় নিশ্চিত করতে হবে।