ক্রিকেট বাইবেলের স্রষ্টা জন উইজডেনের পারফেক্ট টেন

টেস্ট না খেলে ক্রিকেটে অমরত্ব লাভ সম্ভব? খুব সম্ভব। জন উইজডেন কোনো টেস্ট খেলেননি। হলুদ একটা বইয়ের জন্য অমর হয়ে আছেন।

এটুকু পড়ার পর ভেবে নেবেন না শুধু ‘উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালম্যানাক’-এর জন্য অমর হয়েছেন পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চির বেঁটে-খাটো লোকটা। ফাস্ট বোলার ছিলেন। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে হাজারখানেক উইকেটও আছে তার। গড় ১০.৩২। ম্যাচে ৫ উইকেট নিয়েছেন ১১১ বার। ১০ উইকেট নেওয়ায় হাফসেঞ্চুরি করতে পারেননি। ৩৯-এ থেমেছেন। জিম লেকারদের মতো ‘পারফেক্ট টেন’ও আছে একটা। তবে জন উইজডেনের সেই ‘পারফেক্ট টেন’ অন্য সবার থেকে আলাদা। সব ব্যাটসম্যানকে বোল্ড করেছিলেন তিনি।

১৭০ বছর আগের ঘটনা। ১৮৫০ সালের ১৫ জুলাই লর্ডসে সাউথ আর নর্থের ম্যাচে ‘পারফেক্ট টেন’-এর কীর্তিটি গড়েন উইজডেন। সাউথ প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ৩৬ রানে অলআউট। উইজডেন নেন ৩ উইকেট। এর মধ্যে দুটি বোল্ড। জবাবে নর্থ ১৩১ করে। তাই সেদিনই আবার ব্যাট করতে নামে সাউথ। এবার তারা ৭৬ রানে অলআউট। ১০ উইকেটই নিয়েছিলেন উইজডেন। কারও সাহায্য নেননি। সবাইকে বোল্ড। এক দিনে ৩০ উইকেটের পতন হয়েছিল। ২৫ জনই বোল্ড। ম্যাচটি ১৯ রানে জিতেছিল নর্থ। কোনো দলের অধিনায়কের নাম উল্লেখ নেই। দুই দিনের ম্যাচটি বোলারদের দাপটে এক দিনেই শেষ।

ফার্স্ট ক্লাসে মোট ৮৭ জন বোলার ‘পারফেক্ট টেন’-এর কীর্তি গড়েছেন। সবারই কোনো না কোনো উইকেট নিতে ফিল্ডারের সাহায্য লেগেছিল। এদিক থেকে উইজডেনের কীর্তি অনন্য। তার কোনো সাহায্য লাগেনি।

১৮২৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ব্রাইটনে জন্মেছিলেন উইজডেন। অল্প বয়সে বাবার মৃত্যু হয়। পানশালায় কাজ করতে করতে টম বক্সের কাছে আশ্রয় পান। ক্রিকেট শেখেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে সাসেক্সের হয়ে ফার্স্ট ক্লাসে অভিষেক। কেন্টের বিরুদ্ধে সেই ম্যাচে উইজডেন ৯ উইকেট নিয়েছিলেন। ৩৬ ওভার বল করে প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৩ উইকেট। টানা ১৭ বছর সাসেক্সের হয়ে কাউন্টি খেলেছেন। বেঁটে হওয়া সত্ত্বেও দারুণ ফাস্ট বোলিং করতেন বলে উইজডেনকে ‘লিটল ওয়ান্ডার’ নামে ডাকা হতো। ১৮৪৮ সালে কেন্টের বিপক্ষে ১৫ উইকেট নিয়েছিলেন। সেই বছরই নটিংহ্যামশায়ারের বিপক্ষে উইজডেন ১৪ উইকেট নেন। পরের বছর ওই দুই দলের বিপক্ষে আবার ১৩ উইকেট নেন উইজডেন। এরপর ১৮৫০ সালে লর্ডসে তার পারফেক্ট টেনের সেই কীর্তি। ১৮৫২ সালে তিনি যোগ দেন হ্যারো স্কুলে, যেখানে ক্রিকেট খেলার মাঠে অভিজাত ইংরেজ বালকদের চরিত্র গঠন হতো। উইজডেনের কাজ ছিল ছেলেদের খেলা শেখানো।

ব্যাটের হাতও মন্দ ছিল না উইজডেনের। অনেকের চোখে তিনি ছিলেন ‘ফাইনেস্ট অলরাউন্ডার’। ফার্স্ট ক্লাসে দুটি সেঞ্চুরিও আছে তার। ১৮৬ ম্যাচে ১১০৯ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ৪১৪০ রানও করেছেন। গড় ১৪.১২। উইলিয়াম ক্লার্কের অল ইংল্যান্ড একাদশে খেলার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন উইজডেন। ১৮৪৬ সালে ক্লার্কের দলে যোগও দেন। কিন্তু বনিবনা না হওয়ায় দল ছেড়ে বেরিয়ে যান। তখন ইংল্যান্ড জুড়ে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়ছিল। ক্লার্কের সঙ্গে বিদ্রোহ করে সাসেক্স ক্রিকেটারদের নিয়ে ১৮৫২ সালে নতুন দল গড়েন উইজডেন। পরের দশকে ইংল্যান্ডের পেশাদার ক্রিকেট জগৎ দুটি ক্যাম্পে বিভক্ত ছিল। একটা গ্রুপের নেতৃত্ব দিতেন উইজডেন। ১৮৫৬ সালে ক্লার্কের মৃত্যুর পর উইজডেনের উদ্যোগে আবার দুই দল একত্রিত হয়। একসঙ্গে তারা কানাডা আর আমেরিকা সফর করেন।

এর বাইরে উইজডেনের কীর্তি আর ক্রিকেট সমার্থক। ১৫৬ বছরের পরিক্রমায় উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালম্যানাক নামের হলুদ বইটি হয়ে উঠেছে ক্রিকেটের বাইবেল। এখানে একটি শব্দের গরিমা অনেক।

ফ্রেড লিলিহোয়াইটের দ্য গাইড টু ক্রিকেটার্সের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ১৮৬৪ সালে নিজের নামে বার্ষিক প্রকাশনা উইজডেন প্রতিষ্ঠা করেন জন উইজডেন। প্রথম পাঁচ সংস্করণে এর নাম ছিল দ্য ক্রিকেটার’স  অ্যালম্যানাক। ষষ্ঠ সংস্করণ থেকে নাম হয় উইজডেন অ্যালম্যানাক।

১৮৮০ সালে চার্লস পার্ডন, জর্জ কেলি কিংকে সঙ্গে নিয়ে ক্রিকেট রিপোর্টিং এজেন্সি বা সিআরএ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়েন উইজডেন। ১৮৮৭ সালে পার্ডন উইজডেনের সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। তখন থেকেই এটি ক্রিকেট রিপোর্টিং এজেন্সির সহযোগী প্রতিষ্ঠান। ব্রিটেনের প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের (পিএ) সঙ্গে একীভূত না হওয়া পর্যন্ত (১৯৬৫ সাল পর্যন্ত) ক্রিকেট রিপোর্টিং এজেন্সি এ বার্ষিকী প্রকাশনার যাবতীয় দায়-দায়িত্ব বহন করে। শততম সংস্করণ উপলক্ষে ১৯৬৩ সালে ইংল্যান্ড-উইন্ডিজের মধ্যকার টেস্ট ম্যাচে উইজডেন ট্রফি প্রদান করে।