দেশের বেশিরভাগ জেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার নিম্নাঞ্চলসহ ১২টি জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। সিলেট ও সুনামগঞ্জে কিছুটা উন্নতি হলেও উত্তরাঞ্চলের প্রধান প্রধান নদনদীর পানি বেড়ে তীরবর্তী বিভিন্ন গ্রাম ডুবে গেছে। বানভাসী মানুষ উঁচু বাঁধ ও আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে। সেখানে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকট দেখা দেওয়ায় লাখো মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
গতকাল বুধবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আগামী ২৪ ঘণ্টায় গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, নাটোর, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী ও ঢাকা জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। তবে সিলেট ও সুনামগঞ্জে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
ব্রহ্মপুত্র-যমুনা এবং গঙ্গা-পদ্মা নদনদীর পানি সমতল বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকায় প্রধান নদনদীসমূহের পানি হ্রাস পাবে। তবে পদ্মা নদী সুরেশ্বর পয়েন্টে পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। পর্যবেক্ষণে থাকা নদনদীর ১০১টি পয়েন্টের মধ্যে গতকাল ৫৬টির পানি বাড়লেও হ্রাস পেয়েছে ৪১টির। বিপদসীমার ওপরে রয়েছে ২১টি পয়েন্টের পানি।
কুড়িগ্রামে ডুবছে গ্রামের পর গ্রাম : ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলেফেঁপে ওঠায় গতকাল কুড়িগ্রামের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। দ্বিতীয় দফার এ বন্যায় জেলার সাড়ে তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি। পানিতে একের পর এক গ্রাম, বাজার ও ঘাট ডুবছে। ইতিমধ্যে জেলার রাজীবপুর উপজেলা পরিষদ চত্বর ছাপিয়ে পানি ভবনে ঢুকেছে। চর রাজীবপুর বাজারে থৈ থৈ পানি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নবীরুল ইসলাম জানান, তার উপজেলায় ৩৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি। তাদের মধ্যে ১৬ মেট্রিক টন চাল ও ৪০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
চিলমারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত আলী বীর বিক্রম জানান, তার উপজেলার সবকটি ইউনিয়নে পানি ঢুকেছে। বন্যার্তদের মাঝে খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ধরলার পানি কমলেও এখনো বিপদসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ধরলায় তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে।
নীলফামারীতে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি : গতকাল বেলা ৩টা থেকে তিস্তা ব্যারেজের ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে। ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যার মো. মইনুল হক জানান, গতকাল তার ইউনিয়নে মানুষের বাড়িঘর থেকে পানি নেমে গেছে। এখন বানভাসীরা নিজ বাড়িতে ফেরত আসছেন।
গাইবান্ধায় হুমকিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ : গাইবান্ধার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা। ব্রহ্মপুত্র নদ ও ঘাঘট নদীর পানি বেড়ে হুমকির মুখে রয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। গতকাল সকালে ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের সৈয়দপুর-ভাষারপাড়া এলাকায় ভাঙন দেখা দেয়। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড স্থানীয়দের সহযোগিতায় বস্তা ফেলে ভাঙনরোধের চেষ্টা করে। বন্যায় জেলার চার উপজেলায় ১ লাখ ২২ হাজার ৩২০ জন পানিবন্দি।
সিরাজগঞ্জে পানিবন্দি দেড় লাখ মানুষ : বিগত ২৪ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জের যমুনাসহ সবকটি নদীর পানি বেড়ে নয়টি উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। গতকাল শহরের হার্ড পয়েন্টে যমুনা নদীর বিপদসীমার ৬৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে জেলার কাজিপুর, বেলকুচি, শাহজাদপুর, চৌহালি ও সদর উপজেলার চরাঞ্চলের দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। বানভাসী অনেকের ঘরে খাবার না থাকায় মানবেতর জীবনযাপন করছে।
জামালপুরে পানিতে ডুবে যুবকের মৃত্যু : যমুনার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জামালপুরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে সাত উপজেলার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ। রেললাইনে পানি ওঠায় বন্ধ হয়ে গেছে ইসলামপুর-দেওয়ানগঞ্জ রুটে ট্রেন চলাচল। জেলার মাদারগঞ্জে মহিষবাথান-মাহমুদপুর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৫০ মিটার ভেঙে ১০টি গ্রামে পানি ঢুকেছে। এর মধ্যে গতকাল সকালে ইসলামপুরের কাসারিডুবা গ্রামে বাড়ির পাশে বন্যার পানিতে ডুবে কটা ম-ল ( ৩৫) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়।