চলুন কথা বলতে শুরু করি

রবীন্দ্রনাথের ভাষায় সেই সংখ্যাগণনার অতীত প্রত্যুষে সামন্তদের শাসনামলে বুদ্ধিমান মানুষ বুঝতে পেরেছিল ধনসম্পদের পেছনে আছে একটা চৌর্যবৃত্তি এবং লুণ্ঠন। সামন্তরা নিজেদের সম্পদ রক্ষা করতে এবং অন্য লুটেরাদের রুখতে একটা লেঠেল বাহিনী এবং কারাগারের প্রয়োজন বোধ করেছিল। সামন্তরা যখন আরও বড় হয়েছে, তখন যুক্ত হয়েছে সেনাবাহিনী, আইন-আদালত। ভারতবর্ষে মোগলরা বিচারব্যবস্থাকে আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে থানা, সেরেস্তা, কাজী, উকিল এসব কিছুর প্রতিষ্ঠা করে। মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর ইংরেজরা নতুন করে আইনপ্রণয়ন করে সাম্রাজ্য রক্ষা এবং চোর-বাটপারদের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থার উদ্যোগ নেয়। আইনের আঁটসাঁট ব্যবস্থার মধ্যে থাকে আইনের ফাঁক। এই ফাঁকফোকরের মধ্য দিয়ে নিজেরাও বেঁচে যায় এবং বড় বড় লুটেরাও মুক্তি পেয়ে যায়।

ইংরেজের সেই আইনের বড় ধরনের কোনো সংস্কার এখনো হয়নি। কিন্তু গড়ে উঠেছে বিশাল আইনপ্রণেতা, আইন ব্যবসায়ী যাদের কখনো বলা হয় ব্যবহারজীবী। সামন্তযুগের অবসানে বুর্জোয়ারা আইনকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার স্বার্থে নানা ধরনের তৎপরতা শুরু করে। একপর্যায়ে একটা বড় স্লোগানের মতো বাক্য ঘুরতে-ফিরতে থাকে, তা হলো ‘কেউ আইনের বাইরে নয়’, ‘যত শক্তিশালীই হোক আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়’ ইত্যাদি ইত্যাদি। আইন-আদালতকে কেন্দ্র করে একটা বড় অর্থনীতিও গড়ে ওঠে, তাতে কিছু অসহায় অল্প টাকার মানুষ শাস্তি পায় বটে, তাদের নিয়ে ভরে যায় কারাগার। কিন্তু অনেক রুই-কাতলাই থাকে এসব শাস্তির বাইরে। বহু দিন ধরেই দেখে আসছি, আইনে বজ্র আঁটুনি আছে কিন্তু গেরোটা ফসকা। দেশের অর্থ পাচার করার ক্ষেত্রে এত সব কঠিন কঠিন আইন করা আছে যে, লঙ্ঘনকারীরা মনে হয় কেউ রেহাই পাবে না। কিন্তু যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, তাতে সম্ভবত বাংলাদেশের মোট সম্পদের চেয়ে কম নয়।

এসবই সম্ভব হয়েছে এক ধরনের রাজনৈতিক প্রণোদনায়। আইনপ্রণেতারাই এসব পাচারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়েছেন। ব্যবসায়ী-রাজনীতিক আঁতাতের ফলাফলে মুদ্রা পাচার আইন ভেস্তে গেছে। আবার এসব উদ্যোগে পরিবারও যুক্ত হয়ে থাকে। সম্প্রতি আইনপ্রণেতা পাপুলের ঘটনাপ্রবাহ আমরা সবাই জানি। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন তার আইনপ্রণেতা স্ত্রী। স্বামীর সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীও সংরক্ষিত আসনে কী করে সাংসদ হলেন, তাও ভাববার বিষয়। রাজনীতিক হিসেবে পাপুলকেই কেউ চিনত না, তার স্ত্রী বহু পরের বিষয়। একাধিকবার মালয়েশিয়ায় গিয়ে দেখেছি বাংলাদেশের আইনপ্রণেতা ও ব্যবসায়ীদের সেকেন্ড হোমে কী পরিমাণ অর্থ পাচারের ছড়াছড়ি। মালয়েশিয়ায় আইনের কড়াকড়ি থাকা সত্ত্বেও সেখানে সেকেন্ড হোমের বাসিন্দারা ভালোভাবেই আছেন। যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডাতেও বিপুল অর্থ পাচার হয়েছে।

অর্থ যেভাবেই আসুক তাকেই স্বাগত জানানো হয়। খোদ ইংরেজরাই আফ্রিকা ও ভারতবর্ষ থেকে বিপুল সম্পদ লুণ্ঠন করে ইংল্যান্ডের সম্পদ শনৈঃশনৈঃ বাড়িয়েছে। সেখানে নিশ্চয়ই আইনের ব্যত্যয় ঘটাতে হয়েছে। সেটা অবলীলায় করতেও কোনো অসুবিধা হয়নি। রাষ্ট্রের মালিকানা ছিল তাদেরই। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে স্বাভাবিক বিষয় হচ্ছে সম্পদ অর্জন করে দেশে নিয়ে আসা, কেউ কেউ তা করছেনও। বহু আগে থেকে ভারতে NRI (Non Residents Indian) তাদের দেশে পুঁজির জোগান দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশে বেশি দিন হয়নি, NRB-এর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কিন্তু যে পরিমাণের NRB পুঁজি আসছে, তা এই পাচারের তুলনায় অত্যন্ত কম। ভারতে বৈদেশিক মুদ্রার আইন-কানুন এত কঠিন যে, বাড়িতেও কেউ ডলার পাউন্ড রাখে না। কিন্তু আমাদের দেশে বৈদেশিক মুদ্রার অবারিত যাতায়াত। এসব কার্যক্রমের কর্ণধার হচ্ছেন ‘আইনপ্রণেতা ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট।’

ভাবতে অবাক লাগে বাংলাদেশের বয়স মাত্র উনপঞ্চাশ বছর আর এর মধ্যে পুঁজির পরিমাণ এত বিশাল হলো যে, উদ্বৃত্ত পুঁজিও বিদেশে পাচার করার মতো অবস্থা তৈরি হয়ে গেল। তাও আবার বিপুল পরিমাণে। এ দেশে যেসব অপরাধী ধরা পড়ে, তাদের সম্পদের পরিমাণও শত হাজার কোটি, এত টাকা কীভাবে আসে? ওই অপরাধীরা জেলখানাতেও রাজার হালে থাকে। সেখানেও তাদের সেবার অভাব নেই। পৃথিবীর সব দেশেই আইনবহির্ভূত অর্থের মালিক আছে। তারা মুদ্রা পাচারও করে, কিন্তু কোনো একটা পর্যায়ে তারা ধরা পড়ে যায়। আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়েও আসে। এর মধ্যে কত হত্যাকান্ডের ঘটনাও ঘটে। পুঁজিবাদের নিয়মে এভাবেই একে অন্যের পুঁজির মালিক হয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশে যা ঘটছে তা যেন নিয়তি নির্দিষ্ট। এটা হবেই, একটা বিষয় নিয়ে নানা কথা হবে, মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়বে, নানা তথ্য বেরিয়ে আসবে। কিছু লোক কারাগারে বা রিমান্ডে যাবে। আবার যখন বেরিয়ে যাবে, তাও আমরা জানতে পারব না।

বাংলাদেশে নিত্যনৈমিত্তিক বানভাসির মতো দুর্নীতিও তরতর করে এগিয়ে চলে। মাঝেমধ্যে কারও মাথায় বজ্রপাতের মতো দুদকের পরোয়ানা জারি হয়। আবার কেমন করে যেন মিলিয়ে যায়। করোনাকালেও ত্রাণকার্যক্রমে যা ঘটছে, তা নিয়ে সরকারের জোর তৎপরতা শুরু হলেও কোনো দৃশ্যমান কিছু ঘটছে না। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনার উপায় সবটুকু দায় ফেলে দিয়ে আমরা নিশ্চিন্তে নিদ্রা যেতে পারি, কিন্তু এ অবস্থার দ্রুত একটা পরিবর্তন না করতে পারলে আমরা তো যেনতেনভাবে জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছি কিন্তু কী হবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের? এখানে শুরুটা করতে হবে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে। শিক্ষা কি মানুষের বিবেক, অপরাধবোধ, সত্যবাদিতা ও মেরুদ- সৃষ্টি করতে পারছে? যদি না পারে তবে তার যে দুর্বল জায়গাটি, তা খুঁজে বের করতে হবে। যারা খুঁজে বের করবেন তারা যদি সরকারের প্রিয়পাত্র হন কিন্তু বিচারবুদ্ধি ও দক্ষতাশূন্য হন, তাহলে কোনো লাভ নেই।

আমাদের সময় বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকরা নামেমাত্র বেতন পেতেন। কিন্তু ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন বলেই হয়তো কাজটা ঠিকমতো করেছেন। তাই অজ পাড়াগাঁও থেকেও ছাত্ররা ম্যাট্রিকে স্ট্যান্ড করত। তারা সু এবং কু’র পার্থক্যটা নির্ণয় করতে পারতেন এবং ছাত্রদের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারতেন। আজকের শিক্ষকরা জীবিকা হিসেবে এই পেশাটি বেছে নিতে পারেন, কিন্তু অধিকাংশের ঝোঁক শিক্ষা ব্যবসার প্রতি। লেখাপড়া করে যে বিদ্যা সঞ্চয় করেছেন, তাকে পুঁজি হিসেবে নিয়ে কোচিং ব্যবসায় নেমে পড়েছেন। ছাত্রদের দুটি স্কুলে পড়তে হচ্ছে একটি স্কুল, অন্যটি কোচিং স্কুল। ছাত্রদের পরিবারের যে সাংস্কৃতিক পরিম-ল, তাও সুস্থ হওয়া জরুরি। অসাধু উপার্জনের অর্থে সন্তান মানুষ হবে না। এ ধরনের উপার্জন স্বচ্ছতাবিরোধী। সব সময়ই একটা কূটকৌশল তার মধ্যে কাজ করে। এসব পিতা-মাতাকে সন্তানরা শ্রদ্ধা করে না।

বর্তমানে জ্ঞানের বাজার কমে গিয়ে টাকার বাজার খুব রমরমা! ছাত্রদের এই জায়গা থেকে ফিরিয়ে আনাও কঠিন। খুব সহজ কোনো পথ আমাদের জানা নেই। সমাজে একদল মানুষকে অবশ্যই ব্রতী হতে হবে এ কাজে। মানুষ কথা বললে, কথা শুরু করলে কাজ হতে বাধ্য। ব্যাপক আন্দোলন ছাড়া ধ্বংসপ্রাপ্ত মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনা যাবে না। তবে কথা বলতে শুরু করলে, এসব সর্বত্র আলোচনার বিষয়বস্তু হলে, সু-কে শ্রদ্ধা আর কু’কে ঘৃণাও গুরুতর প্রয়োজন। গত বছরগুলোতে সমাজবিরোধীদের আমরা ঘৃণা করিনি, কোটি টাকার গাড়িওয়ালাদের সম্মান করেছি বলেই তারা অপকর্মের স্বীকৃতি পেয়ে গেছে। তাহলে চলুন কথা বলতে শুরু করি।