এবারও ঈদে বাস, লঞ্চ ও ট্রেনসহ সব ধরনের গণপরিবহন খোলা থাকছে। গত ঈদের মতো এবারও ঈদযাত্রায় ঢল নামবে মানুষের। আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে এসব পরিবহনে ঠিক কতটুকু স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব হবে, সে নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। ফলে এসব মানুষের মাধ্যমে করোনা সংক্রমণ প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও সরকার ঈদযাত্রায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচলের ব্যাপারে জনসাধারণকে সতর্ক করছেন। কিন্তু ঘরমুখী মানুষের চাপ সামলে স্বাস্থ্যবিধির ঠিক কতটুকু রক্ষা করা যাবে, সে নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন বাস ও লঞ্চমালিকরাও। তারা বলছেন, এর আগে করোনা সংক্রমণের আরেকটি বড় ঝুঁকি পশুর হাটের ব্যাপারেও সরকার অনুমতি দিয়েছে। এসব হাটে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সামাজিক দূরত্বসহ কোনো ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মানাই সম্ভব নয় বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক আদেশে করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে কোরবানির ঈদের ছুটিতে সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে অবস্থানের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু গণপরিবহন খোলা থাকায় এ নির্দেশ কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
একইভাবে জাতীয় পরামর্শক কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে করোনার হটস্পট ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রাম জেলার মানুষ যাতে অন্য জেলায় যাতায়াত করতে না পারে সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। গত বুধবার জাতীয় কমিটির ফোকাল পয়েন্ট এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শামীমা নাসরীন সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের আদেশক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে অনুরোধ জানিয়ে এ চিঠি লিখেছেন। তবে গতকাল পর্যন্ত এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কোনো সিদ্ধান্তের কথা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও কমিটিকে জানানো হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরসহ যেসব শহরে এখন সংক্রমণের হার কিছুটা স্থিতিশীল দেখা যাচ্ছে এবং সারা দেশের যেসব সংক্রমিত এলাকায় এখন এক-চতুর্থাংশ পরীক্ষার টেস্ট পজিটিভ হচ্ছে; কোরবানির ঈদে যাতায়াতের মাধ্যমে সেসব শহরে সংক্রমণ বাড়ার এবং এসব জায়গা থেকে সংক্রমণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মহামারীর মধ্যে রোজার ঈদের সময় বিধিনিষেধ অনেক শিথিল করায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। রোজার ঈদের পর শুধু জুন মাসেই রোগীর সংখ্যা এক লাখ বেড়ে যায়। দেশে এখন শনাক্ত কভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা দুই লাখের কাছে পৌঁছেছে। এর মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার জনের মৃত্যু হয়েছে। পরীক্ষা অনুপাতে শনাক্তের হার ২৫ শতাংশে পৌঁছে গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারের এসব সিদ্ধান্তে খুবই ক্ষুব্ধ কভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটি। কারণ করোনার চার হটস্পট ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম থেকে অন্যান্য স্থানে যাতায়াত বন্ধ রাখা ও এসব স্থানে পশুর হাট না বসানোর ব্যাপারে অনেক আগেই সুপারিশ করেছিল কমিটি। কিন্তু এসব সুপারিশ মানা হয়নি।
ঈদে গণপরিবহন চালু রাখার ব্যাপারে গত দুদিন বেশকিছু নির্দেশনা দিলেও হটস্পট চার জেলার ব্যাপারে আলাদা কোনো নির্দেশনা আসেনি। একইভাবে এসব জেলায় পশুর হাটের ব্যাপারেও কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি সরকার। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ১০টি অস্থায়ী হাট বসানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া অন্য তিন জেলায়ও কোরবানির পশুর হাট বসছে।
এ ব্যাপারে জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্র্য ও ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেগুলা পরামর্শক কমিটির সিদ্ধান্তের সঙ্গে মিলছে না। সরকার যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেগুলোতে কোনো সমস্যা হতো না যদি একেকটা এরিয়াতে টেস্ট করে যারা পজিটিভ তাদের আইসোলেট করে ফেলত। কিন্তু সেটাও করছে না, আবার সংক্রমণসহায়ক ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। করোনা প্রতিরোধের ব্যাপারে সরকার ঢিলেঢালা ভাব দেখাচ্ছে।
এদিকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবার ঈদে নৌযান চলাচলকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষ। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) যুগ্ম পরিচালক আলমগীর কবির দেশ রূপান্তর বলেন, অন্যান্য বছরের মতোই যদি এবারের ঈদে যাত্রী চাপ থাকে তবে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করতে হিমশিম হতে পারে। তবে আমাদের যথেষ্ট প্রস্তুতি রয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মানতে প্রতিটি প্রবেশমুখে থার্মাল স্ক্যানারের সাহায্যে তাপমাত্রা নির্ণয়ের পাশাপাশি জীবাণুনাশক টানেল দিয়ে সবাইকে প্রবেশ করতে হবে। এছাড়া নদীর মাঝপথে নৌকাযোগে যাত্রী ওঠালে সংশ্লিষ্ট লঞ্চমালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কোস্টগার্ড, নৌপুলিশের সঙ্গে সহযোগিতায় থাকছে বন্দর কর্র্তৃপক্ষ।
তবে বিআইডব্লিউটিএর শর্ত মেনে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করতে গিয়ে লোকসান গুনতে নারাজ লঞ্চমালিকরা। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল যাত্রী পরিবহন সংস্থার সচিব ছিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, লঞ্চ পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের দেওয়া স্বাস্থ্যবিধি নির্দেশনা মেনেই লঞ্চ পরিচালনা করে আসছি। লঞ্চে নিম্ন আয়ের যাত্রীসংখ্যা বেশি। যারা কেবিনের যাত্রী তারা এখন ভয়ে লঞ্চে যাচ্ছে না। ফলে সরকারে নির্দেশনা মানতে গিয়ে প্রতিদিন আমাদের বড় ধরনের লোকসান দিতে হচ্ছে। ঈদে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে হলে দেড়গুণ ভাড়া বাড়াতে হবে। এ বিষয়ে আমরা নৌ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা দিয়েছি। ২১ জুলাই নৌমন্ত্রীর সঙ্গে মিটিং আছে। সেখানেই বাকি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
একইভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদে বাস পরিচালনাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বাসমালিকরাও। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব ও ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরিবহন চালুর শুরু থেকেই সরকারের স্বাস্থ্যবিধি নির্দেশনা মেনেই আমরা পরিবহন পরিচালনা করছি। ঈদেও সরকার যেসব বিধিনিষেধ দিয়েছে, তা মেনেই পরিবহন পরিচালনা করা হবে। বর্তমানে আমাদের ৫০ শতাংশ গাড়ি চলছে। ঈদে যাত্রী বাড়লে পরিবহনের সংখ্যাও বাড়ানো হবে। পরিবহনের চালক এবং হেলপাররা যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে, এখন যেভাবে পরিচালনা হচ্ছে সেভাবেই হয়, সেটা আমরা দেখব। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়া হবে। স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে পালন করার চেষ্টা করব।
বাসে স্বাস্থ্যবিধি মানলেও ফেরিতে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরামর্শক এবং সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, সমস্যা হলো ফেরিতে। ফেরিতে খোলা জায়গায় বাতাসে সংক্রমণ কম ছড়ায়। কিন্তু সেটা সম্ভব হয় না। লোকজন গায়ে গায়ে লেগে থাকে। তাই ফেরিতে যেন একসঙ্গে বেশি লোক ভিড় না করে, বিকল্প পথে লোক পারাপারের ব্যবস্থা করতে হবে। গুনে গুনে বাস তুলতে হবে। কয়টা বাস উঠবে, মানুষ কতজন উঠবে, কোথায় দাঁড়াবে, সব ঠিকমতো নির্দিষ্ট করতে হবে। চক দিয়ে এঁকে দিতে হবে।
ঈদে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানা না হলে ঈদের পর করোনা পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন এই রোগতত্ত্ববিদ। তিনি বলেন, এখন সংক্রমণ ধীরে ধীরে হলেও বাড়ছে। গত ঈদের পর সংক্রমণের যে ধাক্কা, সেটা এখনো সামাল দেওয়া যায়নি। গত ঈদের পর থেকে যত লোক টেস্ট করা হচ্ছে, তাদের সংক্রমণের হার ১৩ থেকে ১৫ ও ১৫ থেকে ২০ শতাংশে উঠেছে। এখন হচ্ছে ২৪-২৫ শতাংশ। আর কোরবানির সময় যদি এসব স্বাস্থ্যবিধির লাগাম না টানতে পারি তাহলে সংক্রমণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, গত ঈদের পর থেকে শহরে চেয়ে শহরের বাইরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রংপুর, কুমিল্লা, সিলেট ও নোয়াখালীতে সংক্রমণ অনেক বেড়েছে। ইদানীং ঝড়-বৃষ্টি-বন্যার কারণে জনসমাগম কম থাকায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর শহরে এখন সংক্রমণের হার স্থিতিশীল দেখা যাচ্ছে। কিন্তু গোটা বাংলাদেশে সংক্রমিত এলাকায় এক-চতুর্থাংশ পরীক্ষার টেস্ট পজিটিভ হচ্ছে। কোরবানি ঈদের সময় যদি আবার মানুষ চলাচল করে ও কোরবানি উপলক্ষে জনসমাগম হয়, তাহলে এটা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ যেসব শহরে সংক্রমণ স্থিতিশীল আছে, সেখানে সংক্রমণ বাড়বে এবং এসব জায়গা থেকে সংক্রমণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। বাইরে থেকে শহরে আসবে, শহর থেকে বাইরে যাবে।
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ৩১ জুলাই বা ১ আগস্ট কোরবানির ঈদ হবে। ৩১ জুলাই এবং ১ ও ২ আগস্ট ঈদের ছুটি নির্ধারণ করা আছে। দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর গত ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে ও আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করা আছে। গত ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত টানা সাধারণ ছুটির পর ৩১ মে থেকে সীমিত পরিসরে অফিস চলছে। ৩ আগস্ট পর্যন্ত এভাবেই অফিস চলবে বলে সরকারি সিদ্ধান্ত রয়েছে। সর্বশেষ গত বুধবার ঈদুল আজহা উপলক্ষে লঞ্চ, ফেরি, স্টিমার চলাচল ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ কর্মপন্থা নির্ধারণ নিয়ে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ঈদে সারা দেশে গণপরিবহন চলবে এবং প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদের আগে তিন দিন ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। পরে গতকাল সে ব্যাপারটি আরও স্পষ্ট করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।