সারা দেশের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় প্রধান প্রধান নদনদীর পানি আরও কমবে। পানি নামতে থাকায় বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করেছে বানভাসিরা। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে তারা দুর্ভোগে পড়েছে। গত ১১ জুলাই থেকে দ্বিতীয় দফার এ বন্যায় দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২২ লাখ ৪৬ হাজার ৪৭২ জন। আর মারা গেছে ৮ জন।
সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয় থেকে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত বন্যায় ১৮ জেলার ৯২ উপজেলার ৫৩৫টি ইউনিয়ন দুর্গত হয়েছে। এর মধ্যে জামালপুরে চারজন এবং লালমনিরহাট, সুনামগগঞ্জ, সিলেট ও টাঙ্গাইলে একজন করে মোট ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ১২ জেলায় ১ হাজার ৫৪৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আগে ধান কাটা শেষ হওয়ায় বন্যায় এবার ধানের ক্ষতি হয়নি। তবে আমন ধানের বীজতলা, পাট, ডাল ও শাকসবজির কিছু ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতি সামলাতে কৃষি মন্ত্রণালয় উঁচু জায়গায় আমনের বীজতলা করে তা বিনামূল্যে কৃষকদের দেবে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘এবারের বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে আমরা আশা করছি। কারণ নদনদীর পানি কমতে শুরু করেছে। যেসব নদীর পানি বাড়ছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাও কমবে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোর পানি কমতে থাকায় সিলেট, সুনামগঞ্জ ও কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, নাটোর ও নওগাঁ জেলার বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে। আর সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী ও ঢাকা জেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।’
ফরিদপুরে তিন শিশুসহ ৬ জনের মৃত্যু : পদ্মা নদীর পানি ফরিদপুরের গোয়ালন্দ পয়েন্টে গতকাল ২৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৮৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে জেলার চার উপজেলার ২০টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম তলিয়ে গেছে। পানিতে বেশ কয়েকটি গ্রাম থেকে শহরে আসার সড়ক বন্ধ হয়ে গেছে। এদিকে গত বুধবার চরভদ্রাসন ও বোয়ালমারীতে সাপে কেটে তিন ব্যক্তি ও বন্যার পানিতে ডুবে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
জামালপুরে পানিবন্দি ৬ লাখ মানুষ : যমুনাসহ শাখা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জামালপুরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বর্তমানে জেলার প্রায় ৬ লাখ মানুষ পানিবন্দি। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা নায়েব আলী জানান, জেলার সাতটি উপজেলায় দুর্গতদের মধ্যে নগদ ৭ লাখ টাকা ও ৩ হাজার ৪০৮ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এদিকে গতকাল সকালে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় বন্যার পানিতে ডুবে সাবেক সেনাসদস্য মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম হিরুর (৭২) মৃত্যু হয়েছে।
দহগ্রামে থইথই পানি : ভয়াল তিস্তার পানিতে ডুবে গেছে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম। যেদিকে চোখ যায় থইথই পানি। পানির তোড়ে গ্রামের সহস্রাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান জানান, তিস্তার বাম তীরে বাঁধ না দিলে দহগ্রাম রক্ষা করা যাবে না। ক্ষতিগ্রস্ত ৮২৫টি পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহীতে পদ্মায় পানি বাড়ছে : উজানের ঢলে রাজশাহীতে প্রতিদিনই পদ্মার পানি বাড়ছে। ইতিমধ্যে অনেক স্থানে নদীর পাড় ভাঙছে। গতকাল দুপুরে পদ্মার পানি বেড়ে ১৬ দশমিক ২৫ মিটার হয়, যা বিপদসীমার মাত্র সোয়া ২ মিটার নিচে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আলিপুর ও নাপিতপাড়া এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে অর্ধশতাধিক বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বাঘা, চারঘাট ও মোহনপুরের নিম্নাঞ্চলে ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
গাইবান্ধায় ক্ষতিগ্রস্ত সোয়া লাখ মানুষ : করতোয়া নদীর পানি বাড়লেও স্থির রয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদ ও ঘাঘট নদীর পানি। তবে তিস্তা নদীর পানি কমছে। বন্যায় গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ২৬টি ইউনিয়নের ৩০ হাজার ৮৭৬ পরিবারের ১ লাখ ২২ হাজার ৩২০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সিরাজগঞ্জে পানির নিচে ২০ হাজার হেক্টর ফসলি জমি : সিরাজগঞ্জে যমুনাসহ সব নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ইতিমধ্যে জেলার ৫১টি ইউনিয়নের ২৫০টি গ্রামে পানি প্রবেশ করেছে। পানিবন্দি হয়ে ভোগান্তিতে প্রায় পৌনে ২ লাখ মানুষ। প্রায় ২০ হাজার ৭৩৭ হেক্টর জমির পাট, আখ, তিল, কাউন ও সবজি তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাবিবুল হক।
এদিকে গতকাল চৌহালি উপজেলার খাসকাউলিয়া ইউনিয়নের পূর্ব খাসকাউলিয়া গ্রামে বন্যার পানিতে ডুবে সাবিয়া খাতুন (২) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
পানির নিচে কুড়িগ্রামের দুই উপজেলা : কুড়িগ্রামের চর রাজীবপুর উপজেলার পর বুধবার রাতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের সেচ বাঁধ ভেঙে সোনাভরি নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি রৌমারী উপজেলা শহরে প্রবেশ করেছে। বর্তমানে শহরের প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। সব মিলে জেলার আড়াই লাখ বন্যার্ত মানুষের মাঝে সুপেয় পানি ও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।