ডেনিস লিলি ছিলেন ব্যাটসম্যানদের আতঙ্ক

ডেনিস কিথ লিলি। ভিভ রিচার্ডসের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়া অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলার আজ ৭১তম জন্মদিন।

পেস বোলারদের দুনিয়ার ‘রোলস রয়েস’খ্যাত মাইকেল হোল্ডিং বলেছিলেন, ‘লিলির মধ্যে সব ছিল ছন্দ, আগ্রাসন, নিয়ন্ত্রণ। শুরুর দিকে দারুণ গতিতে বল করত। কিন্তু পরে পিঠের ব্যথার জন্য বোলিং অ্যাকশন সম্পূর্ণ বদলে নেয়। ছন্দ কিছুটা হারালেও ব্যাটসম্যানদের আউট করার নানা উপায় বের করেছিল। কেউ যখন এভাবে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে, তাকে তো সেরাদের তালিকায় রাখতেই হবে। অনেকেই এই রকম পরিস্থিতিতে নিজের সেরাটা দিতে পারে না।’

ডেনিস লিলি কোনোদিন নো বল করেননি। ছিলেন সবচেয়ে ‘ডিসিপ্লিনড’ ফাস্ট বোলার। যদিও অনেক কম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। ৭০ টেস্ট আর ৬৩ ওয়ানডেতেই সীমাবদ্ধ তার ক্যারিয়ার। ৩৫৫ টেস্ট উইকেটের সঙ্গে নিয়েছেন ১০৩ ওয়ানডে উইকেট। ’৭১-এ অ্যাডিলেডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেকের পর খেলেছেন টানা ১৩ বছর। অভিষেকেই নিয়েছিলেন ৮৪ রানে ৫ উইকেট। সিডনিতে শেষ টেস্টে ৮ উইকেট। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের শেষ বলে উইকেট পেয়েছিলেন।

ক্যারিবীয় পেস ব্যাটারির বিরুদ্ধে সফলতম ভারতীয় ব্যাটসম্যান সুনীল গাভাস্কার লিলির বিরুদ্ধে রান করতে পারেননি। রিচার্ডস থাকতেন আশঙ্কায়। আশির দশকে লিলি-ভিভের দ্বৈরথ ছিল ক্রিকেটের সেরা আকর্ষণ। ১৯৭৫-এ তাদের প্রথম দেখা। সেই অস্ট্রেলিয়া সফরে ৫-১-এ হেরেছিল উইন্ডিজ। লিলি নিয়েছিলেন ২৭ উইকেট। ২৩ বছরের তরুণ ভিভকে ৫ বার আউট করেছিলেন। অনেকে বলেন, ১৯৭৭ সালের ক্যারি প্যাকার সিরিজের জনপ্রিয়তার মূলে ছিল লিলি-ভিভের লড়াই। সেই সিরিজে ৮ বার ভিভকে আউট করেন লিলি। তবে বারবার কিন্তু ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি হারেননি। ১৯৭৯-৮০ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২-১-এ সিরিজ জিতেছিল উইন্ডিজ। সেই সিরিজে ৯৬.৫০ গড়ে ৩৮৬ রান করেছিলেন রিচার্ডস। মাত্র ২ বার লিলি তাকে আউট করতে পেরেছিলেন। তবে লিলি সেই পরাজয়ের শোধ তোলেন একাশির বক্সিং ডে টেস্টে। মেলবোর্নে তিনি প্রথম ইনিংসে ২ রানে রিচাডর্সকে বোল্ড করেন। ৮৩ রানে ৭ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ম্যাচে ফিরিয়েছিলেন লিলি। তার অসামান্য বোলিং নৈপুণ্যে ৫৮ রানে সেই টেস্ট জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া। টেস্টে মোট ৯ বার রিচার্ডসকে আউট করেন লিলি। আর কোনো বোলারের কিং রিচার্ডসের বিরুদ্ধে এমন সাফল্য নেই। হয়তো সে কারণেই ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি বলেছেন, ‘একমাত্র লিলিই আমার রাতের ঘুম কাড়তে পেরেছিল।’

অবশ্য আশির দশকের উইন্ডিজ দলের অনেকেরই রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিলেন লিলি-টমসন জুটি। কলিন ক্রফট বলেছিলেন, ‘১৯৭৫-৭৬-এ অস্ট্রেলিয়া সফরের সময় ক্লাইভ লয়েড, ডেরেক মারে, আলভিন কালিচরণ, বার্নাড জুলিয়ান এবং রয় ফ্রেডরিকিসের মুখে লিলি-টমসনকে মোকাবিলা করার ভয়ংকর গল্প শুনতাম। তাদের মুখ দেখে মনে হতো এই মাত্র হরর মুভি দেখে উঠল।’

ক্রফট ১৯৭২ সালে প্রথমবার লিলিকে বোলিং করতে দেখেন ইংলিশ কাউন্টিতে ওয়ারউইকশায়ারে। প্রথম দেখায় মনে হয়েছিল তিনি বক্সিং রিংয়ে মোহাম্মদ আলিকে দেখছেন। ইতিহাসখ্যাত ক্যারিবীয় পেস কোয়াট্রেটের অন্যতম ক্রফট বলেন, ‘স্থায়িত্ব, ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা এবং ভীতিজাগানিয়া অনুভূতি ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যন্য ছিলেন মার্শাল, কপিল, ওয়াসিম, ওয়াকার, অ্যামব্রোস, হল, স্টেইন, রবার্টস, হোল্ডিং, ম্যাকগ্রা, ডোনাল্ড এবং গার্নাররা। তবে সহজাত হিংস্রতার কারণে এদের সবার চেয়ে সেরা লিলি। কী অসামান্য ক্রিকেটার। আমার কাছে সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী। যাকে আমি ঘৃণা করতাম, ভালোবাসতাম। আর জীবনভর সবচেয়ে বেশি যার প্রশংসা করেছি।’

লিলি খেলা ছাড়ার পর এমআরএফ পেস ফাউন্ডেশন গড়ে ভারতে ফাস্ট বোলিংয়ে বিপ্লব এনেছেন। তার আত্মজীবনী ‘আর্ট অব ফাস্ট বোলিং’ সারা দুনিয়ার উঠতি পেসারদের জন্য বাইবেল। সেখানে নিজের যুগান্তকারী চিন্তার কথা বলেছেন, ‘আমার সময়ে সবাইকে সাইড-অন অ্যাকশনে বল করতে শেখানো হতো। কিন্তু পরে নানা ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশিরভাগ বোলারের ‘সেমি সাইড-অন’ বা ‘সেমি ফ্রন্ট-অন’ অ্যাকশন রয়েছে। এটা নতুন একটা তথ্য, কারণ এর আগে ধারণা ছিল যে, ফ্রন্ট-অন (অর্থাৎ বুক চিতিয়ে) অ্যাকশন কারও কারও ক্ষেত্রে কাজে দিতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ বোলারের সমস্যা হবে। বলা হতো ম্যালকম মার্শালের মতো ‘সেমি সাইড-অন’ অ্যাকশনের বোলারদের কোমরে চোট পাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, তারা একই রকম কার্যকরী, চোটও হচ্ছে না। আমার মনে হয়, বোলিং অ্যাকশন নিয়ে নতুন এই থিওরি অনেক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। এখন আর ‘সাইড-অন’ অ্যাকশন খুব একটা দেখাই যায় না।’

এতে ভালোই হয়েছে। ক্রিকেটে দ্বিতীয় ডেনিস লিলি আসার সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে।