পাটকলের সঙ্গে কি শ্রমিকবান্ধব মডেলও নিশ্চিহ্ন হবে

যা কিছু করে দেখানো হয়ে ওঠেনি, তা সহজভাবে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো সব সময়ই কঠিন কাজ ছিল। ইংরেজিতে এমন পরিস্থিতিকে বলা হয় কাউন্টারফ্যাকচুয়াল সেনারিও ((counterfactual scenario)। কী হলে কী হতে পারত বৈজ্ঞানিক উপায়ে এর প্রমাণ দিতে হলে সাধারণত গবেষকরা অতীতে অন্য ক্ষেত্রে ঘটেছে, এমন উদাহরণ দেখিয়ে বিশ্লেষণ-সাপেক্ষে অনুমান করতে পারেন প্রায় একই পরিস্থিতিতে নতুন ক্ষেত্রে কী ঘটতে পারে। সে হিসেবে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা না থাকলে কী কী করা যেত, তা নিয়ে সবারই এক ধরনের বোঝাপড়া আছে। তাই যুগে যুগে দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ করে অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসনের পক্ষে কথা বলে এসেছেন মানুষ। কিন্তু যারা দুর্নীতি হয় বলে দুর্নীতি দমনের উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো বিকল্প খোঁজেন, তারা এক অর্থে দুর্নীতিকে মেনে নিয়েই বিকল্প খোঁজেন। আর এই প্রবণতা আরও প্রকট হয়েছে বিশ্বব্যাপী বাজারমুখী অর্থনৈতিক নীতির আধিপত্যচর্চার মধ্য দিয়ে।

বাজার অর্থনীতিতে শ্রমিকের সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে নয়, বরং চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে মজুরি নির্ধারণ করা হয়। যেখানে সস্তা শ্রম, পুঁজিপতিরা সেখানেই ছোটেন সুবিধা নিতে। ন্যায্য মজুরি দিলে লোকসান হবে এ ছুতোয় কম মজুরি দিয়ে মুনাফা করতে থাকেন অবাধে। কাজেই কোনো ব্যবসা যদি বেশি মজুরি দেওয়ার পরও লাভজনক হয়ে ওঠে, তা অন্য মালিকদের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়।

পহেলা জুলাই থেকে বাংলাদেশের ২৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্বাধীনতার পর ৭৮টি পাটকল রাষ্ট্রীয়করণের মাধ্যমে বিজেএমসি গঠিত হয়েছিল। এর মধ্যে আশির দশক থেকে শুরু করে লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে অনেকগুলো কল বন্ধ ও বেসরকারীকরণের পর অবশিষ্ট ছিল ২৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল। এতে প্রায় ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিক, চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োজিত আরও প্রায় ২৬ হাজার শ্রমিক এবং এই খাতের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য মানুষের জীবিকা হুমকির সম্মুখীন হবে। কর্মহীন হয়ে যাওয়া এই বিপুলসংখ্যক শ্রমিককে আশ্বস্ত করতে গিয়ে পাটমন্ত্রী জানিয়েছেন, গোল্ডেন হ্যান্ডশেক দেওয়ার পর সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে পাটকলগুলোকে আধুনিকায়ন করে উৎপাদনমুখী করা হবে। তখন এসব শ্রমিক সেখানে চাকরি করার সুযোগ পাবেন। এই প্রতিশ্রুতির প্রতি শ্রমিকদের আস্থা নেই, কারণ এর আগে বহুবার পাটকল ব্যক্তি-মালিকানায় দেওয়ার নাম করে সস্তায় জমি ও যন্ত্রপাতি লুটপাট, জমি দেখিয়ে ব্যাংকঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করতে না পেরে মিল বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে।

এবার অবশিষ্ট কলগুলো বন্ধ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হলো রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের শ্রমিক-কল্যাণমুখী মডেল। অথচ এই মিলগুলো বিভিন্ন সময় লাভ করেছিল শ্রমিক-কল্যাণমুখী মডেলের বৈশিষ্ট্যসহই। যেখানে শ্রমিক ঐক্য কর্মচারী পরিষদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী ১২০০ কোটি টাকা খরচ করে নবায়ন করা যেত, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দূর করে লাভজনক করা যেত, সেখানে ৫০০০ কোটি টাকা খরচ করে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে কলগুলো বন্ধের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সরকার দুর্নীতি বন্ধের অক্ষমতা প্রকাশ করল এবং এর প্রবক্তারাও দুর্নীতির গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করল।

এই রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো স্বাধীনতার আগে ব্যক্তি-মালিকানাধীন ছিল। আধুনিক ব্যক্তি-মালিকানাধীন পাটকলগুলোর সঙ্গে এই বন্ধ হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর একটা গুণগত পার্থক্য রয়েছে। বিশাল জমি ছাড়াও এগুলোকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল বিদ্যালয়, হাসপাতাল, খেলার মাঠ, বাজার ও মসজিদ। ঐতিহাসিকভাবে এ ধরনের কলকারখানার মডেলের উদ্ভব হয়েছিল শুধু শ্রমিকদের দূর-দূরন্ত থেকে শহরের দিকে আকৃষ্ট করতেই না, বরং তখন সামাজিক দায় পূরণের অংশ হিসেবেও ব্যক্তি-মালিকানাধীন পাটকলগুলো নিজেদের স্বার্থেই এই শ্রমিক কল্যাণমুখী কারখানার মডেল তৈরি করেছিল। এই বৈশিষ্ট্য দেখে এসেছি চিনিকল, রেলওয়ে, টেলিফোন, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদি সেবাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানেও। চিনিকল বা পাটকলের মতো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যা বিপুল পরিমাণ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে সমর্থ, তাই এর সুফল শুধু মালিকরাই পান না, একটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র চাইলে এই সুবিধা নাগরিকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখতে পারে। সে হিসেবে এই মডেলকে পুরনো মডেল বলা যাবে না, বরং বলা উচিত শ্রমিকবান্ধব বা শ্রমিক কল্যাণমুখী মডেল। অর্থাৎ শ্রমিকরা শুধু বেতন নয়, অপর্যাপ্ত হলেও কিছু নাগরিক সুবিধাও পেয়ে এসেছেন, যা নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি পাটকলগুলো ঘিরে গড়ে তুলেছিল একটা পুরো কমিউনিটি। এই কমিউনিটির মতপ্রকাশের সুযোগ থাকে, সংগঠিত হয়ে দাবি আদায়ের সুযোগ থাকে।

অন্যদিকে আধুনিক ব্যক্তি-মালিকানাধীন পাটকলগুলোতে শ্রমিকরা অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পায়। কোনো নাগরিক সুবিধা পায় না। দাবি-দাওয়া নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে সংগঠন গড়ে ওঠারও কোনো সুযোগ নেই। এগুলো মূলত অস্থায়ী নিয়োগ অব্যাহত রেখে, কম মজুরি দেয় ও শোষণ জারি রেখে মুনাফা অর্জন নিশ্চিত করে। বিশ্বব্যাংকের নব্য-উদারবাদী পাট খাত সংস্কারের ফলাফল হিসেবেই দাঁড়িয়েছে এই পাটকল মডেল যেসবের মূলমন্ত্র যেকোনো মূল্যে খরচ কমিয়ে মুনাফা নিশ্চিত করা। আধুনিক মডেলে সামাজিক দায়ভার বরাদ্দ (corporate social responsibility fund)) থাকে কিন্তু এর ব্যবহার শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নব্য-উদারবাদী করপোরেট মডেলে শ্রমিকের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, কোনো কিছুই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বীকৃত অধিকার নয়, বরং পণ্য হিসেবে ধরা হয়। কারণ নব্য-উদারবাদ একই সঙ্গে এসব সেবাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাণিজ্যিকীকরণেও উৎসাহিত করে। অর্থাৎ এই মডেল অনুযায়ী শ্রমিকরা শুধু কম মজুরিই পান না, বাজারমুখী অর্থনীতিতে তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবহনসেবা বাজার থেকে উচ্চমূল্যে কিনতেও বাধ্য করা হয়।

আধুনিক ব্যক্তি-মালিকানাধীন করপোরেট মডেলে ব্যবসা শুধু মুনাফা করে এবং মুনাফার একটি অংশ চাইলে সেই সামাজিক দায় মেটাতে স্বেচ্ছায় কাজে লাগাতে পারে। সামাজিক দায় তারা কীভাবে মেটায়, সে নিয়ে বিস্তর গবেষণায় দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই সামাজিক দায়ের জন্য বরাদ্দ অর্থ শেষ পর্যন্ত ব্যবসার বিজ্ঞাপনে অথবা ব্যবসা যাদের কাছ থেকে সুবিধা লাভ করে, তাদের নিজস্ব বলয়ের মধ্যে দান করে গুডউইল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ব্যয় করা হয়। সামাজিক দায়ভার খাতের বরাদ্দকে ব্যবহার করে এভাবেই গড়ে উঠেছে সামাজিক ব্যবসার ধারণাটি। সামাজিক ব্যবসার নামে এ ধরনের উদাহরণ তৈরি করেছে ড্যানোনের দই। এই দই অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য তৈরি করা এবং তাদের কাছে বিক্রির কথা বলা হলেও দেখা গেছে শ্রমিকরা যে মজুরি পান, তা দিয়ে এই দই কেনার সামর্থ্য তাদের থাকে না। এসব ব্যবসা সামাজিক ব্যবসা হিসেবে পরিচিত হলেও এগুলোর আসল উদ্দেশ্য পণ্য বা সেবা বাজারজাতকরণ ও বিক্রয়। অর্থাৎ আধুনিক ব্যক্তি-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল মডেলের মতো শ্রমিকদের প্রতি সামাজিক দায় পূরণ করে না এবং তাতে বাধ্য করার কোনো কৌশলও রাখা হয়নি।

২০১৫ সালে মজুরি কমিশন বিজেএমসির অন্তর্ভুক্ত পাটকলগুলোর মূল বেতন ৮ হাজার ৭০০ টাকা ও এর সঙ্গে অন্যান্য ভাতা যুক্ত হয়ে মোট বেতন হয় ১৪,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে মাসিক মূল মজুরি মাত্র ২ হাজার ৭০০ টাকা। খোঁজ নিয়ে সরাসরি শ্রমিকদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি মণ্ডল ও সাগর নামের দুটি বেসরকারি পাটকলে অস্থায়ী শ্রমিকরা সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করলে ১ হাজার ৩০০ টাকা, আবার পাঁচ দিন কাজ করলে ১ হাজার টাকা পান। সে হিসেবে পুরো মাসের বেতন হয় ৫ হাজার ২০০ টাকা। আবার অস্থায়ী ভিত্তিতে এক দিনের মজুরি মাত্র ১৬৫ টাকা। অন্য মিলে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়। অর্থাৎ এখানে কোনো সুনির্দিষ্ট স্কেল নেই।

একটি বড় ব্যক্তি-মালিকানাধীন পাটকল, যা কি না বিশ্বের পাটসুতার চাহিদার ২৫ শতাংশ মিটিয়ে থাকে ও বাংলাদেশের পাটসুতার বাজারের এক-তৃতীয়াংশ দখল করে আছে, সেই জুটমিলও অস্থায়ীভাবে শ্রমিক নিয়োগ করে। ওই জুটমিলের শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিনের মজুরি হিসেবে তারা কেউ ১৫৫ টাকা, কেউ ১৮০, কেউ ২০০, কেউবা ২৮০ টাকা পর্যন্ত পেয়ে থাকে। শুধু কিছু অপারেটর ও সিনিয়র অপারেটর ৭৫০০ থেকে ৮০০০ টাকা পর্যন্ত পায়। এই জুটমিলটি ভবিষ্যতে ৫০ হাজার শ্রমিক নিয়োগ করে পাট খাত সম্প্রসারণে অবদান রাখতে চায় কিন্তু শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোর ব্যাপারে তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা চোখে পড়েনি। অস্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত মিলের শ্রমিকরা জানিয়েছেন, ওই শিল্প গ্রুপ সামাজিক অবদানের অংশ হিসেবে যেই স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছে, সেখানে তারা তাদের সন্তানদের বেতন দিয়ে পড়ানোর সামর্থ্য রাখে না।

বর্তমান সময়ে এসে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি দমন করে যদি এমন কোনো পাটকলের উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করা যায়, যেখানে শ্রমিকদের তিন গুণ মজুরি দিয়েও লাভ করা যায়, তাহলে বিরাষ্ট্রীয়করণ করে শ্রমিকদের তিন ভাগের এক ভাগ মজুরি প্রদানের লাভজনক মডেল প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ না করে নবায়ন করে তারপর ওই একই মজুরি দিয়ে যদি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যেত এবং তারপর বিরাষ্ট্রীয়করণ করে মালিকানা হস্তান্তর করা হতো, তাহলে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ত এই আধুনিক বেসরকারি পাটকলগুলো। কারণ তাতে তাদের ওপরও মজুরি বাড়ানোর চাপ তৈরি হতো, সামাজিক দায়বদ্ধতার ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হতো। সে পথে যেন যেতে না হয়ে তাই এই গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের ব্যবস্থা। আর এর মধ্য দিয়ে অদৃশ্য করার পরিকল্পনা করা হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের সামাজিক দায়বদ্ধতার দৃষ্টান্ত।

কী করলে কী হতে পারত (counterfactual scenario) তার ফলাফল যত বেশি শ্রমিকদের তথা নাগরিকদের কাছে অদৃশ্য করে দেওয়া যায়, তত বেশি মুনাফাভিত্তিক বিকল্পের পথ প্রসারিত হয়। একটি শ্রমিকবান্ধব পাটকল মডেল বন্ধ করে যদি আরেকটি শ্রমিকবান্ধব পাটকল প্রতিষ্ঠা হতো, এমনকি তা যদি ব্যক্তি-মালিকানায়ও হতো, তাহলেও ধরে নেওয়া যেত রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল মডেল বন্ধের কারণ নবায়ন, আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের প্রকৃত ইচ্ছা। কিন্তু এমন কোনো ব্যক্তি-মালিকানাধীন পাটকলের দৃষ্টান্ত আমাদের কাছে নেই, যেখানে ন্যায্য মজুরি দেওয়া হয় ও শ্রমিকদের প্রতি সামাজিক দায় পূরণ করা হয়। লোকসানের জন্য প্রকৃত দায়ীদের অপসারণ করে, পাটকল রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে ন্যায্য দাবি। সরকারের উচিত পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিল করে পাটকলগুলো নবায়ন করে এগুলোকে লাভজনক করার পদক্ষেপ নেওয়া।