বন্যায় বর্ষণের ঘা

বন্যায় পানির নিচে দেশের ২৫ জেলা। বেশ কয়েকটি জেলা নতুন করে আক্রান্তের ঝুঁকিতে। বিপদসীমার উপরে প্রবাহিত হচ্ছে ১৭টি নদ-নদীর পানি। এর মধ্যেই গত দুদিন ধরে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে, ফলে বন্যা আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠার আভাস দিচ্ছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ৭২ ঘণ্টায় দেশের বেশিরভাগ অঞ্চল ও সীমান্তঘেঁষা ভারতের প্রদেশগুলোতে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বন্যার পানি আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর পানির স্রোত বেড়ে যাওয়ায় নদী ভাঙনও তীব্র হতে পারে।

দেশ রূপান্তরের জেলা প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন নদীতে অতিরিক্ত পানি প্রবাহের কারণে ভাঙনের মুখে পড়েছে। বন্যায় বাড়ি-ঘর ডুবে ও ভাঙনের মুখে পড়ে বাঁধের ওপরে ও উঁচু স্থানে খোলা আকাশের নিচে বাস করছে হাজারো মানুষ। দেখা দিয়েছে খাদ্য ও ত্রাণ সংকট। পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বানভাসিরা।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় দুর্যোগ সাড়া দান সমন্বয় কেন্দ্র (এনডিআরসিসি) জানিয়েছে, দেশের ১০২টি উপজেলার ৬৪০টি বন্যা উপদ্রুত ইউনিয়নে ৬ লাখ ৭৯ হাজার ১৭৮টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে, আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৯ লাখ ২৩ হাজার ৮৩১ জন। লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী, রংপুর, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, বগুড়া, জামালপুর, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, মাদারীপুর, ফরিদপুর, নেত্রকোনা, ফেনী, শরীয়তপুর, ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে জামালপুরে ৯ জন, কুড়িগ্রামে সাতজন, সুনামগঞ্জে তিনজন, টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জে দুজন করে এবং লালমনিরহাট ও সিলেটে একজন করে মারা গেছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ৫ হাজার ৮৬০ টন চাল এবং ২ কোটি ১৪ লাখ ২ হাজার ২০০ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া শিশু খাদ্য কিনতে সাড়ে ২৫ লাখ টাকা এবং গো-খাদ্য কিনতে আরও সাড়ে ২৫ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এর বাইরে ৫০ হাজার ৭৪৭ প্যাকেট শুকনা খাবার বন্যাদুর্গত অঞ্চলের জনগণের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। বন্যাকবলিত ২১ জেলায় ১ হাজার ৫২১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে ৬৭ হাজার ৪১৪ জন এবং ৬২ হাজার ৯২৩টি গবাদিপশু আশ্রয় নিয়েছে। ৬১৯টি মেডিকেল টিম গঠন করা হলেও ৩১০টি চালু রয়েছে।

বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৬ জেলা ইতিমধ্যে বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। ১৬টি নদ-নদী ও ২৮টি স্টেশনে বিপদসীমার উপর পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ১০১টি পর্যবেক্ষণাধীন পানি সমতল স্টেশনের মধ্যে ৭২টির বৃদ্ধি পেয়েছে এবং হ্রাস পেয়েছে ২৫টির। ৪টির পানি অপরিবর্তিত রয়েছে। টাঙ্গাইলের এলাসিনে আত্রাই নদের পানি বিপদসীমার ১০৮ সে. মি. ও গোয়ালন্দে পদ্মার পানি ১০৫ সে. মি.-এর উপর প্রবাহিত হচ্ছে।

এই অবস্থায় টানা বৃষ্টি বন্যার ভয়াবহতা আরও বাড়াতে পারে। এ বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বৃষ্টি পড়লে বন্যার পানি বাড়ে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, আগামী ৭২ ঘণ্টা রাজধানী ও এর আশপাশসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী বৃষ্টিপাত হবে। বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা ভারতের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলেও ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই আশঙ্কা করা হচ্ছে, বৃষ্টির কারণে বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে।’

গত সোমবার সকাল ৯টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ছাতকে ১৮০ মি.মি., লরেরগড়ে ১৪০ মি.মি., লালাখালে ১১৬ মি.মি., দেওয়ানগঞ্জে ১৫০ মি.মি., জাফলংয়ে ১৩৬ মি.মি., পঞ্চগড়ে ১১৪ মি.মি., মহেশখোলায় ১৪১ মি.মি., সুনামগঞ্জে ১২০ মি.মি., দুর্গাপুরে ১১২ মি.মি., কক্সবাজারে ১০১ মি.মি., নোয়াখালীতে ৭৪ মি.মি., পরশুরামে ৭৪ মি.মি., ঢাকায় ৮৭ মি.মি. এবং বরিশালে ৬২ মি.মি. বৃষ্টিপাত হয়েছে।

পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সুরমা ব্যাতীয় দেশের সকল প্রধান নদীসমূহের পানি স্থিতিশীল আছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের গাণিতিক আবহাওয়া মডেল অনুযায়ী, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন ভারতের হিমালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা প্রদেশে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে এ সময়ে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, উত্তরাঞ্চলের ধরলা ও তিস্তা, পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদ-নদীসমূহ এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি অববাহিকার নদ-নদীর পানি সমতল দ্রুতি বৃদ্ধি পেতে পারে।

আগামী ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি সমতল বৃদ্ধি পেতে পারে। যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মার পানি সমতল স্থিতিশীল থাকতে পারে। এই সময়ে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, নাটোর, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী, শরিয়তপুর ও ঢাকা জেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে। সিলেট এবং সুনামগঞ্জ জেলার বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হতে পারে।

বিপদসীমার ১০৭ সেমি. উপরে পদ্মার পানি : আমাদের ফরিদপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলায় পদ্মার পানি বেড়ে বিপদসীমার ১০৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে মধুমতী নদীর আলফাডাঙ্গা ও মধুখালী উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী জেলার ৩০টি ইউনিয়নের প্রায় ২০০ গ্রামে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। গবাদিপশুসহ বেড়িবাঁধসহ উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন অনেক পরিবার। ইতিমধ্যে ২ হাজার পরিবারকে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে। বিভিন্ন উপজেলায় বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোতে ২০০ টন চাল ও নগদ তিন লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

তিস্তার পানি বিপদসীমার উপরে : আমাদের নীলফামারী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গতকাল জেলার ডালিয়া ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপদসীমার ২০ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তবে বিকেল নাগাদ তা কমে বিপদসীমার ৮ সে.মি. নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। গত সোমবার ওই একই পয়েন্টে বিপদসীমার ২৮ সে.মি. নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। কয়েক দফা পানি কমা বাড়ার পরে গত ১৪ জুলাই থেকে পানি কমতে শুরু করেছিল।

মির্জাপুরে পানিবন্দি ১৬ হাজার মানুষ : আমাদের টাঙ্গাইলের মির্জাপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, উপজেলায় প্রায় ১৬ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বংশাই, লৌহজং ও ঝিনাই নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েকশ পরিবার। গ্রামীণ আঞ্চলিক সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে উপজেলা সদরের সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণ এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দেওহাটা গরুর হাটসহ বিভিন্ন হাটবাজার পানিতে তলিয়ে বিপাকে পড়েছে স্থানীয় ক্রেতা বিক্রেতারা।

বন্যার পানি বৃদ্ধির ফলে ২ হাজার হেক্টর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। ৭০টি বিদ্যালয়ে পানি প্রবেশ করেছে। ১০-১২টি কমিউনিটি ক্লিনিকে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। পানিবন্দি এবং নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় উপজেলা প্রশাসন ইতিমধ্যে ত্রাণকাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল মালেক।

এখনো বিপদসীমায় যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি : আমাদের জামালপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ধীর গতিতে পানি নামায় যমুনার পানি বিপদসীমার ৭৯ সে.মি. ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ১ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে জেলায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। ২০ দিন ধরে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে জেলার ১০ লাখ মানুষ। খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে হাজার হাজার মানুষ। বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ দেখা দিয়েছে। দুর্গতদের মধ্যে ১০০ টন চাল ৫ লাখ টাকা ও ২ হাজার প্যাকেট শুকনা প্যাকেট বরাদ্দ দিয়েছে জেলাপ্রশাসন।

গাইবান্ধায় পর্যাপ্ত ত্রাণের সংকট : আমাদের গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলার ব্রহ্মপুত্র নদসহ তিস্তা, করতোয়া ও ঘাঘট নদীর পানি কমে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে এখনো বিপদসীমার উপরে রয়েছে ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘটের পানি। রয়েছে পর্যাপ্ত ত্রাণের সংকট। বিভিন্ন পানিবাহিত রোগবালাই দেখা দিয়েছে।

নদীভাঙনের শিকার হয়ে বাস্তুভিটা হারাচ্ছে শত শত পরিবার। বন্যাকবলিতদের মধ্যে ত্রাণ হিসেবে চাল, শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য ও গোখাদ্য বিতরণ অব্যাহত আছে বলে জানান জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এ কে এম ইদ্রিশ আলী।