শ্রমিকের বেতন-বোনাসে অনিশ্চয়তা

পোশাক কারখানাসহ অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পের শ্রমিকরা করোনা মহামারীর শুরু থেকেই ব্যাপক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। পুরো দেশ যখন সাধারণ ছুটি ও লকডাউন পরিস্থিতিতে অবরুদ্ধ সে সময়ই অর্থনীতির চাকা সচল রাখার স্বার্থে শিল্প শ্রমিকদের রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ডেকে আনা হয়। কোনোরকম পরিবহনের ব্যবস্থা না করেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে একপ্রকার পায়ে হেঁটে শ্রমিকদের শিল্পাঞ্চলগুলোতে আসতে বাধ্য করায় কারখানামালিকরা সমালোচিতও হন। তদুপরি রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে শ্রমিকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থতার অভিযোগও ওঠে বিপুলসংখ্যক কারখানার বিরুদ্ধে।  অন্যদিকে শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন পরিশোধের শর্তে সরকার সবার আগে পোশাক কারখানার জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। কিন্তু তারপরও ঈদুল ফিতরের আগে বেতন-বোনাস পরিশোধের দাবিতে রাজপথে নামতে বাধ্য হয় পোশাক শ্রমিকরা। পরিতাপের বিষয় হলো সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ঋণের টাকায় বেতন দেওয়া হলেও আসন্ন ঈদুল আজহার আগেও শ্রমিকদের পাওনা বেতন-বোনাস পরিশোধ করা নিয়ে আবারও অনিশ্চয়তার কথা বলছেন কারখানামালিকরা।

বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে ‘ঝুঁকিতে ৯০০ কারখানার বেতন-বোনাস’ শিরোনামের প্রতিবেদনে ঈদের আগে পোশাক কারখানাসহ অন্যান্য শিল্প কারখানার এমন অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, কোরবানির ঈদে পাঁচ শতাধিক কারখানার শ্রমিকদের বোনাস বা উৎসব ভাতা ও জুলাইয়ের অর্ধেক বেতন অনিশ্চিত। আর ৯০৮টি কারখানার বেতন-বোনাস ঝুঁকিতে রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন খাতের অন্তত ১০০ কারখানা ঈদের বোনাস ও জুলাইয়ের আগাম বেতন নিয়ে বিপাকে পড়বে। এগুলোর বেশিরভাগই হয়তো বেতন-বোনাস দিতেই পারবে না। আরও উদ্বেগজনক খবর হলো, দেশের বিভিন্ন খাতের ৭ হাজার ৬০২টি শিল্পকারখানার মধ্যে ১ হাজার ৬০৫টি এখনো জুনের বেতন পরিশোধ করেনি।  অথচ এপ্রিল মাসে কারখানাগুলো বন্ধ থাকলেও মে থেকে বেশিরভাগ কারখানাই উৎপাদনে রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক কারখানা রপ্তানিও করেছে। ফলে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, এপ্রিল থেকে চার মাস ধরে সরকারি ঋণের টাকায় বেতন দেওয়ার সুযোগ নেওয়ার পরও শিল্পমালিকদের বোনাস দেওয়ারও সক্ষমতা নেই কেন? আর বহু কারখানায় জুন-জুলাইয়ের বেতনই বা বকেয়া থাকবে কেন?

শিল্প শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিয়ে উদ্ভূত সংকট নিরসনে গত ২০ জুলাই সরকার-মালিক-শ্রমিক ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (টিসিসি) একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়।  সভায় সিদ্ধান্ত হয় আগামী ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে বোনাস ও ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে চলতি মাসের অর্ধেক মজুরি পরিশোধের। কিন্তু শিল্পপুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত ৪২৭টি ও বিকেএমইএ’র ১০২টি, টেক্সটাইল মিলারদের সংগঠন বিটিএমএ’র ৪৪টি, বেপজার ৩৬টি ও অন্যান্য খাতের ২৯৯টি কারখানার ঈদের বেতন-ভাতা ও ঈদ বোনাস ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে শিল্পপুলিশের এ তালিকায় ঢাকা মহানগরীর কোনো কারখানা অন্তর্ভুক্ত নেই। এসব কারখানার মধ্যে অন্তত ৫০০ কারখানার ঈদ বোনাস ও বেতনের বিষয়ে কারখানামালিকরা এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। তাদের মধ্যে বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত ১৭৭টি ও বিকেএমইএ’র ৭০টি কারখানা রয়েছে। বাকি কারখানাগুলো বিটিএমএ, বেপজা ও অন্যান্য খাতের। তবে শিল্পপুলিশের তথ্যের সঙ্গে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেছে কারখানামালিকদের সংগঠনগুলো।  তারা বলছে, সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ কারখানা ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতি বছরই কিছু কিছু কারখানা এমন ঝুঁকিতে থাকে। করোনার কারণে এবার সংখ্যাটি একটু বেশি হয়েছে।

এদিকে কারখানাগুলো বেতন-বোনাস সময়মতো পরিশোধ করতে না পারলে করোনাকালে আবারও শ্রমিক অসন্তোষ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।  অবশ্য তৈরি পোশাক কারখানামালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র ভাষ্য, তাদের সদস্যভুক্ত ১ হাজার ৯২৬টি কারখানার মধ্যে ১ হাজার ৮৫৪টি কারখানাই জুনের বেতন পরিশোধ করেছে। বাকি ৭২টি কারখানার বেতন পরিশোধের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। শুধু বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ, বেপজার অন্তর্ভুক্ত কারখানাই নয়, সব ধরনের শিল্পকারখানার মালিকদেরই শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন-বোনাস পরিশোধের বিষয়ে আন্তরিক হওয়া উচিত। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, বিগত বছরগুলো তো বটেই এই করোনা মহামারীর কালেও বিপুলসংখ্যক কারখানায় শ্রমিকের বেতন-বোনাস পরিশোধ নিয়ে অনিশ্চয়তাই বলে দিচ্ছে যে এ বিষয়ে বাস্তবতা প্রত্যাশার চেয়ে বহুদূরে। এমনিতেই দেশে একটা বড় অংশের শিল্পকারখানার বিরুদ্ধেই কর্মপরিবেশে শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে। তার ওপর মহামারীতে রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে যে শ্রমিকরা অর্থনীতির চাকা সচল রাখার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের প্রাপ্য পরিশোধের বিষয়ে এমন উদাসীনতা কখনই কাম্য নয়। অবশ্যই ঈদের আগেই শ্রমিকদের পাওনা বেতন-বোনাস পরিশোধের উদ্যোগ নিতে হবে মালিকদের। আর সেটা নিশ্চিত করতে সরকারকেও মালিকপক্ষকে চাপ দিতে হবে।