ইউএনও এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে মামলা

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে মাটি কাটার যন্ত্র দিয়ে পুকুর খননের ফলে পাশের জমির ক্ষতিগ্রস্ত মালিকদের আইনি সহায়তা দিতে গিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পুকুর খননকারী আবদুল হাকিম ইউএনও ও এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে আদালতে ওই মামলা করেছেন। তিনি বলেছেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নামে ইউএনও ও এসিল্যান্ড তার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তবে ইউএনওর দাবি, আবদুল হাকিম স্থানীয় কিছু সাংবাদিকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাদেরকে হয়রানির চেষ্টা করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বীরগঞ্জের সুজালপুর ইউনিয়নের চাকাই গ্রামের আবদুল হাকিম মাটি কাটার যন্ত্র (স্থানীয়ভাবে ভেপু মেশিন নামে পরিচিত) দিয়ে পুকুর খনন করেন। এর ফলে পুকুরের উপরিভাগের কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও কবরস্থান ভেঙে পড়ে। এ ঘটনায় কৃষিজমির মালিক মো. খাইরুল ইসলাম এবং বসতবাড়ির মালিক সহিদুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর অভিযোগ করেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়ামিন হোসেন এসিল্যান্ড ডালিম সরকারকে বিষয়টি দেখতে বলেন। ডালিম সরকার গত ১১ জুন ঘটনাস্থলে গিয়ে পুকুর খনন করার ফলে পার্শ্ববর্তী কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও কবরস্থানের ক্ষতি পর্যালোচনা করে স্থানীয় ইউপি সদস্যের উপস্থিতিতে পুকুর মালিক আবদুল হাকিমকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। এরপরও আবদুল হাকিম পুকুরের ভাঙা অংশ মেরামত না করায় বৃষ্টির পানিতে তা আরও ভেঙে যেতে থাকে। অভিযোগকারীরা পুনরায়  ডালিম সরকারের কাছে অভিযোগ করেন। এর প্রেক্ষিতে গত ১৮ জুলাই এসিল্যান্ড আবারও সেখানে যান। পুনরায় আইন অমান্য করার দায়ে ইউএনও, এসিল্যান্ড, চেয়ারম্যান ও এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে পুকুর মালিক আবদুল হাকিমকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সেই সঙ্গে আবদুল হাকিম অঙ্গীকারনামা দিয়ে জানান, পুকুর পাড়ে আরসিসি পিলার দিয়ে তিন দিনের মধ্যে গাইড ওয়াল নির্মাণ করে দেবেন যাতে বসতবাড়ি ও কবরস্থান ধসে না পড়ে। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ২১ জুলাই ইউএনও ও এসিল্যান্ডসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অবৈধ ভ্রাম্যমাণ আদালত ও অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগে দিনাজপুর জজকোর্টে একটি মামলা করেন আবদুল হাকিম। বিষয়টি নিয়ে গত ২২ জুলাই আবদুল হাকিম কথিত সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যের একটি হাতে লেখা কপি বীরগঞ্জের স্থানীয় দুজন সাংবাদিককে দেন। ওই দুই সাংবাদিক বিষয়টি নিয়ে ফেইসবুকে লেখালেখি করেন।

সেই কথিত সংবাদ সম্মেলনের হাতে লেখা কপিতে পুকুরের মালিক আবদুল হাকিম অভিযোগ করেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার গত ১১ জুন তার ছেলেকে অফিসে নিয়ে গিয়ে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে ৫ হাজার টাকার রসিদ প্রদান করেন। একইভাবে গত ১৮ তারিখে ৫ লাখ টাকা নিয়ে ৫০ হাজার টাকার রসিদ দেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবদুল হাকিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বাড়িতেই এসিল্যান্ড ৫ লাখ টাকা নিয়েছেন। আমি আমার ভাইয়ের কাছ থেকে ২ লাখ ৩০ হাজার এবং আরেক ভাইয়ের কাছ থেকে ১ লাখ এবং আমার জমানো টাকা দিয়ে ৫ লাখ টাকা দিয়েছি।’

তবে হাকিমের বড় ভাই কাইয়ুম টাকার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে প্রথমে জানান। আবদুল হাকিমের স্ত্রীও প্রথম দিকে টাকার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে সাংবাদিকদের জানান।

সুজালপুর ইউপি চেয়ারম্যান মহেশ চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবদুল হাকিম একজন জমির দালাল। যেদিন উপজেলায় ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় সেদিন আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম। এর আগেও তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল, এজন্য পরে আমি নিজেই দরখাস্ত দিয়ে ৫ হাজার টাকা জরিমানার ব্যবস্থা করেছি। এখন হাকিম যেগুলো বলছে, সেগুলো সবই মিথ্যা কথা। তাকে দিয়ে এগুলো কেউ করাচ্ছে।’

বীরগঞ্জের এসিল্যান্ড ডালিম সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এই উপজেলায় মাত্র কয়েক দিন হলো এসেছি। আমার বিরুদ্ধে যে ৫ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ আবদুল হাকিম করেছেন সেটা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। কারণ যেদিন তাকে ৫০ হাজার টাকা ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা করা হয়েছিল সেদিন স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। আর আমরা হাকিম সাহেবের বাড়ির ভেতর কেউ প্রবেশ করিনি। আমরা সবাই বাড়ির বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। হাকিম সাহেব কেন এসব অভিযোগ করছেন বিষয়টা বলা মুশকিল।’

জানতে চাইলে বীরগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়ামিন হোসেন বলেন, ‘আবদুল হাকিমের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। তিনি বর্তমানে দুজন ভুঁইফোঁড় সাংবাদিকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এসব করে বেড়াচ্ছেন। আমরা প্রশাসনিকভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুতি গ্রহণ করছি।’