দেশে প্রায় সাড়ে চার মাস করোনা সংকট চলছে। এরই মধ্যে চলমান বন্যা সংকটকে বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু দুর্যোগ পরিস্থিতিতেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্রের তেমন হেরফের হয়নি। বিচারবহির্ভূত হত্যা, ধর্ষণ, নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা, গণমাধ্যমকর্মীকে নিপীড়ন, সীমান্ত হত্যার মতো ঘটনা বেড়েই চলেছে। আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, পরিস্থিতির লাগাম টানতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এবং করোনা-বন্যার মতো দুর্যোগ দীর্ঘায়িত হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যে, বিগত ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬০১ নারী। ধর্ষণের পর ৩৭ নারীকে হত্যা এবং অপমানে আত্মহত্যা করেছেন ৭ জন। এই সময়ে ২৫৩ নারী পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৬৩ জনকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার ৪০ নারী আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে করোনাকাল এপ্রিল, মে ও জুনে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৫৯ নারী এবং ৪০ নারীকে হত্যা করা হয়েছে।
করোনাভাইরাস সংক্রমণের কিছুদিন পর শিশু নির্যাতন ও হত্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মানবাধিকারকর্মীরা। আসকের হিসাবে, গত ছয় মাসে ৬৮০ শিশু সহিংসতার শিকার এবং ২৯৭ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ৪০৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের তথ্যে, শুধু জুনেই ২ হাজার ৮৯৬ শিশু নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। মে মাসে যে সংখ্যা ছিল ২ হাজার ১৭১ জন। ফাউন্ডেশনের হিসাবে, জুনে ৫৩টি জেলায় মোট ১২ হাজার ৭৪০ নারী-শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনায় মানুষ ঘরবন্দি। কর্মহীন, আর্থিক সংকট ও অনিশ্চয়তার কারণে ধর্ষণ, নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বেড়ে গেছে। করোনা মহামারীর মধ্যেই বন্যার আঘাত বিপর্যয় ডেকে এনেছে। কাজ নেই, সহযোগিতাও পাচ্ছে না। এরই মধ্যে দুর্নীতির মহোৎসব চলছে। সবকিছুতে মানুষ হতাশ। অস্থিরতার কারণে সহিংসতাও বাড়ছে। সামনে হয়তো পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’ আসকের হিসাবে, বিগত ছয় মাসে সারা দেশে গ্রেপ্তারের আগে-পরে ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার, বন্দুকযুদ্ধ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতনে ১৫৮ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। করোনাকালেমার্চে ৩৬, এপিলে ১৬, মে মাসে ২৯ ও জুনে ২৮ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হন। প্রত্যেক দিনই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। গত ছয় মাসে ১৫৬ সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন, হয়রানি, হুমকি ও পেশাগত কাজে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই এই সময়ে সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর বিরুদ্ধে ৬২টি মামলা ও ১৪০ জনকে আসামি করা হয়েছে। আর গত ছয় মাসে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ২১ ও নির্যাতনে চারজনসহ মোট ২৫ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আসকের চেয়ারপারসন জেড আই (জহিরুল ইসলাম) খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা মানে বিচারকে হত্যা করা। ন্যায়বিচারের বিরুদ্ধে আরেকটি অন্যায় এবং প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও কলুষিত হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব বন্ধে এখন আর কোনো লড়াই চালিয়ে নিতে উৎসাহ পাচ্ছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সার্বিক পরিস্থিতি মানবাধিকারের জন্য হুমকি মনে হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।’
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, ‘করোনা-উত্তর মানবিক আচরণ ও দুর্নীতিমুক্ত পৃথিবী প্রত্যাশা করেছিলাম। কিন্তু বাস্তবে দুর্নীতি, নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা ও বাল্যবিয়ের ঘটনা বেড়েছে। করোনা থেকে আমরা কোনো শিক্ষাই নিচ্ছি না।’