সন্তানের অধিকারের কথা বলবে কে

মানুষ হিসেবে আমাদের স্রোতের অনুকূলে যাওয়ার এক ধরনের প্রবণতা আছে। এটি এমনকি পিতা-মাতা হওয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, বিশেষত আমাদের মতো দেশে যেখানে সমাজে সত্য বলে প্রচলিত স্টেরিওটিপিক্যাল ধারণার দ্বারা আমাদের চিন্তা প্রভাবিত হয়। এখনো সমাজের একটা বড় অংশেই সন্তান নেওয়া হয় সমাজের অদৃশ্য চাপের কারণে। আমাদের মধ্যে খুব কম নারী-পুরুষই আছেন যারা পিতৃত্বের-মাতৃত্বের স্বাদ নেওয়ার সিদ্ধান্তের আগে প্যারেন্টিং সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন আর সে অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুত করেনযেন সন্তানের জন্মের পরে তারা নিজেদের সর্বোচ্চটা সন্তানের মঙ্গলের জন্য নিংড়ে দিতে পারেন। ফলস্বরূপ, শিশুদের প্রতি দায়বদ্ধতা ও দায়িত্ব কী কী সেটা উপলব্ধি না করেই অনেকে বাবা-মা হয়ে যান। সমাজে প্যারেন্টিং-সম্পর্কিত সঠিক উপলব্ধির অভাব প্রায়ই আমাদের এমন একটি অবস্থার দিকে নিয়ে যায়, যেখানে আমরা সন্তানের প্রাপ্য অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হই, এমনকি সেসব অধিকার রক্ষা করা তো দূরের কথা, সেসব নিয়ে আমরা কথা বলতেও প্রস্তুত নই।

সন্তানের প্রথম যে অধিকারটি আমরা প্রায়ই নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হই তা হলো শিশুদের জন্য ঝগড়া-কলহমুক্ত পারিবারিক পরিবেশ, যেখানে একটি শিশু সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে পারবে। পারিবারিক কলহকে আমরা খুব স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করি। স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ অবশ্যই হতে পারে, তবে সেটা সন্তানের সামনে নয়। সম্পর্কের মধ্যে টানাপড়েন ও মতবিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু সেটা কোনোভাবেই বাচ্চার মানসিক সুস্থতায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারেএমন পর্যায়ে করা যাবে না। পিতা-মাতারা প্রায়ই তাদের ক্ষোভ প্রকাশের জন্য ধ্বংসাত্মক উপায় অবলম্বন করেন, যা তাদের সন্তানকে হতাশ করে। খ্যাতিমান মনোবিজ্ঞানী কামিংস এবং প্যাট্রিক ডেভিস রচিত ‘মেরিটাল কনফ্লিক্ট অ্যান্ড চিলড্রেন : এ ইমোশনাল সিকিউরিটি পার্সপেক্টিভ’ বইটিতে দাবি করা হয়েছে, যে বাবা-মা একে অপরের সঙ্গে মৌখিক আগ্রাসন, অপমান, হুমকির মতো কথা ব্যবহার করেন এবং মাঝেমধ্যে এই তিক্ততা শারীরিক নির্যাতন পর্যায়ে চলে যায়। সে ক্ষেত্রে এমন ব্যবহার ও আচরণ একটি শিশুর মানসিক বিকাশের ওপর চরম প্রভাব ফেলতে পারে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ বাবা-মা এই বিষয়টি আমলে নেন না। তারা শিশুর সামনেই ঝগড়া করেন এবং একজন সন্তানের বড় হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর পরিবেশ পাওয়ার অধিকার লঙ্ঘন করে।

দ্বিতীয়ত, জীবনে এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অগ্রাধিকারও পরিবর্তিত হয়। অনেকেই ক্যারিয়ারে এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি যে, আমরা সন্তানের সঙ্গে সময় কাটাতে ভুলে যাই। বাবাদের জন্য এটি বিশেষভাবে সত্য, কারণ তারা বেশিরভাগ পরিবারে অর্থ উপার্জনকারীর ভূমিকা পালন করে থাকেন। ক্যারিয়ার নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখা দোষের কিছু নয়, তবে তা যেন আমাদের পরিবার এবং সন্তানের অগ্রাধিকারের জায়গাটা না নিয়ে নেয়। আমাদের সমাজে অনেক পিতারই এই ধারণা আছে যে, অর্থের জোগান দেওয়াই তার একমাত্র কাজ এবং তার বাচ্চার মৌলিক অধিকার পূরণ করা পর্যন্তই তার দায়িত্ব সীমাবদ্ধ। এমন বাবারা সন্তানের প্রতি তাদের যে মানসিক ও আবেগসংক্রান্ত দায়বদ্ধতা আছে সেটা বুঝতে চান না এবং অনেকে অগ্রাহ্যও করেন বটে। এ ধরনের ব্যবহার ও মানসিকতা একটি শিশুর মানসিক অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন, কারণ সে বাবার পাশাপাশি তার সময়েরও দাবিদার।

তৃতীয়ত, পিতামাতারা তাদের সন্তানের স্বাতন্ত্র্যবোধকে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। শিক্ষা এবং ক্যারিয়ার সম্পর্কিত কিছু ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে সত্য। পিতামাতারা তাদের সন্তানকে তাদের সম্প্রসারিত রূপ হিসেবে বিবেচনা করার কারণে অনেক সময় নিজেদের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো বাচ্চাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা কাজ করে। ফলস্বরূপ, তারা চায় তাদের সন্তানরা সেই স্বপ্নগুলো পূরণ করবে, যা তারা নিজেরাই তাদের জীবদ্দশায় কখনো অর্জন করতে পারেননি। আর তাই বেশিরভাগ পিতা-মাতা চান তাদের বাচ্চারা একজন ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার বা সরকারি চাকরিজীবী হবে, কারণ তাদের বাবা-মাও তাদের কাছ থেকে একই ধরনের প্রত্যাশা রেখেছিলেন। এ জাতীয় কর্র্তৃত্ববাদী প্যারেন্টিং কেবল সন্তানের আত্মমর্যাদাকেই ক্ষতি করে না; বরং সন্তান ও পিতামাতার মধ্যে একটি মানসিক ব্যবধান তৈরি করে।

চতুর্থত, অনেক পিতা-মাতাই সন্তানের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা, বিশেষ করে মৌলিক অধিকার পূরণের দায়িত্ব পালনেও নিরাসক্ত। অনেকেই শিশুদের খাদ্য, আশ্রয় এবং শিক্ষা পাওয়ার প্রাথমিক অধিকারকে অস্বীকার করে। রাস্তার ভাসমান বাচ্চাদের দিকে তাকালে এই বিষয়টি সহজেই অনুধাবন করা যায়। পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন এনজিওর অনুমান অনুসারে, আমাদের দেশে প্রায় ১১ লাখ পথশিশু রয়েছে এবং তাদের বেশিরভাগই কোনোও পরিবারের সমর্থন ছাড়াই জীবনযাপন করছে। এবার একটু চিন্তা করুন এসব বাচ্চার বাবা-মা কোথায়? দায়িত্ব পালন না করার জন্য কি তারা কোনো সামাজিক চাপ বা শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছে? না, হচ্ছে না। এক্ষেত্রে সেই বাবা-মায়েরা যে আর্থ-সামাজিক সংকটের কারণে এই বাস্তবতায় নিপতিত হয়েছেন তার দায় যেমন রাষ্ট্রের ওপর বর্তায় তেমনি এই শিশুদের রক্ষা ও বিকাশেও রাষ্ট্রের ভূমিকা পালন করার কথা। কিন্তু সন্তানের মা-বাবা এবং রাষ্ট্র উভয় পক্ষই এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ।

প্রশ্ন হলো এই সমস্ত অধিকার পূরণ না হলে কী হবে? আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মনোবিজ্ঞানী জিন পিয়াগেট বিকাশের চারটি ধাপের রূপরেখা দিয়েছেনসেন্সরিমোটর পর্যায়, প্রি-অপারেশনাল পর্যায়, কংক্রিট অপারেশনাল পর্যায় এবং ফরমাল অপারেশন পর্যায়। এই সমস্ত পর্যায়ে একটি শিশুর মধ্যে স্কিমা (এমন জ্ঞান যা একটি শিশুকে যেকোনো ধরনের ব্যাখ্যা বুঝতে সাহায্য করে) তৈরি হয়। যখন কোনো সন্তানের অধিকার অস্বীকার করা হয় এবং সে সহিংসতার মুখোমুখি হয়, তখন সেই শিশুর মধ্যে এই ধরনের স্কিমা তৈরি হয় এবং সম্পর্ক ও পারিবারিক জীবন নিয়ে তার মধ্যে বিরূপ ধারণা বিকশিত হয়। যার ফলে সেই শিশুটি যখন বড় হয় তখন সেও একজন বাজে বাবা বা মায়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

তাহলে এখান থেকে উত্তরণের উপায় কী? প্যারেন্টিং সম্পর্কিত যে বাজে ধারণাগুলো আমরা এত বছর ধরে অনুশীলন ও অনুসরণ করে আসছি তা অবশ্যই আমাদের পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং সেই সঙ্গে পিতা-মাতার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন করা শিখতে হবে। আসুন আমরা কাউকে যেমন খুশি তেমন করার অধিকার না দিয়ে দেই; বরং সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য হলেও এই বিষয় নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করি, তবেই আমরা সন্তানের অধিকার রক্ষা করতে সক্ষম হব।

লেখক : সাংবাদিক