করোনা পরিস্থিতিতে ১৩২ দিন (চার মাসের বেশি) বন্ধের পর আজ বুধবার থেকে সারা দেশের অধস্তন আদালতে স্বাভাবিক বিচার কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। দীর্ঘদিন পর নিয়মিত বিচারিক কার্যক্রম নিয়ে স্বস্তির সঙ্গে করোনা সংক্রমণের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। তারা বলছেন, করোনা ইতিমধ্যে বিচার বিভাগের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। পুরনোর সঙ্গে নতুন অনেক মামলা যুক্ত হয়েছে। এখন আদালতে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের পদচারণা বাড়বে। ফলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা কঠিন হবে। এমন অবস্থায় পরিকল্পনার পাশাপাশি সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হবে।
এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদালত খোলার পর শারীরিক দূরত্ব ও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা না মানলে বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। এমনিতেই মামলার জট। করোনায় মার্চ থেকে আদালত বন্ধ থাকায় জট বেড়েছে। এখন যেভাবে মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে, তাতে বিচারপ্রার্থীদের বিচার পাওয়া ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা দুরূহ হবে। এজন্য সঠিক পরিকল্পনা, বিচারিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মামলা পরিচালনা ও জট কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। দুর্ভোগ কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিলে ভালো হবে।’
করোনা পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন কার্যক্রম বন্ধের পর গত ১১ মে অধস্তন আদালতে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে হাজতি আসামিদের জামিন শুনানি এবং পরে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার নালিশি আবেদন ও আত্মসমর্পণের সুযোগ রাখা হয়। এরই মধ্যে গত ৩০ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন স্বাস্থ্যবিধি মেনে ৫ আগস্ট থেকে অধস্তন আদালতে নিয়মিত বিচার কার্যক্রম শুরুর নির্দেশনা দেয়।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে (২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত) উচ্চ এবং অধস্তন আদালতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩৬ লাখ ৮৪ হাজার ৭২৮টি। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন মামলা ৫ লাখ ১২ হাজার। অধস্তন আদালতে বিচারাধীন মামলা ৩১ লাখ ৭২ হাজার ৪৩টি। চলতি বছরে আরও নতুন মামলা যুক্ত হয়েছে। করোনাকালে (গত ১১ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত) ৫০ কার্যদিবসে অধস্তন আদালতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৩৯৯টি জামিনের আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। এতে ৬৭ হাজার ২২৯ জন (৭৫৫ শিশুসহ) জামিন পেয়েছেন।
আইনজীবীরা বলছেন, ভার্চুয়াল আদালতে যেসব আদেশ হয়েছে, নিয়মিত আদালতে প্রত্যেকটিই উপস্থাপন এবং সংক্ষিপ্ত হলেও শুনানি ও আদেশ হবে। পাশাপাশি বিচারাধীন মামলা বন্ধের আগে যে পর্যায়ে ছিল, সেখান থেকে শুরু করতে হবে। বিচারক বদলি কিংবা অবসরে গেলে তাদের স্থলাভিষিক্ত বিচারকরা এসে সংক্ষিপ্ত পরিসরে হলেও মামলাগুলোর পুনঃশুনানি করবেন।
তরুণ আইনজীবী এ এম জামিউল হক ফয়সাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাক্ষ্য গ্রহণসহ আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এখানে ভার্চুয়াল আদালতে জামিনের আদেশগুলো শুনানির জন্য আসবে। দীর্ঘদিন বন্ধের ফলে পুরনো ও নতুন মামলা মিলে বিচারের ক্ষেত্রে জট ও চাপ তৈরি হবে। সবার আনাগোনা বেড়ে যাবে। এজলাসে স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব হলেও আদালতের বাইরে এ নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।’
এ বিষয়ে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে কিছুটা শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। তবে আইনজীবীরা নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করে মামলা পরিচালনা করবেন। বিচারপ্রার্থীরাও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘ফৌজদারি মামলায় ধার্য তারিখে হাজিরা দিতে হয়। কোনো কোনো মামলায় ৭০ থেকে ৮০ জনও হাজিরা দেন। এখন হাজার হাজার আসামি হাজিরার জন্য এলে স্বাস্থ্যবিধি বিঘ্নিত হবে। এজন্য আসামিদের ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে হাজিরা কিংবা সময় আর্জির বিষয়ে বিচারকদের সঙ্গে আলোচনা করে একটা সমাধানের চেষ্টা করা হবে।’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘আদালত খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। অসংখ্য মামলা বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। আমরা মনে করি, সরকার নীতিনির্ধারণ করে দিক কোন মামলা কীভাবে চলবে। সপ্তাহের কর্মদিবস ভাগ করে পুরনো ও নতুন মামলার শুনানি- এ ধরনের একটি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চলতে পারে। না হলে বিচার পাওয়া নিয়ে মানুষের দুর্ভোগ কমবে না।’