চামড়ার দর নেই কেন

করোনা-পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক চামড়াবাজার নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে।  সুযোগের সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশও। চীনের বাজার এই খারাপ সময়েও চালু ছিল। দুনিয়ার ট্যানারি শিল্প যখন উৎপাদন প্রায় বন্ধ রেখেছে, তখন ইউরোপে এই খাতের কোম্পানিগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছে চীন। ইতালি-ভারতসহ নানা দেশের চামড়াশিল্প সংকটে।  বিশ্ববাজারে আমাদের চামড়া পণ্যের বিরাট সুযোগ উপস্থিত করোনা এবং আনুষঙ্গিক আরও কিছু কারণে। অথচ সুযোগের সেই ফল হাতে তুলে নেওয়ার আয়োজন তো দেখা যাচ্ছেই না, বরং কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে উল্টো গতি। গত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও পবিত্র ঈদুল আজহার সময় কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নিয়ে তেলেসমাতি কাণ্ড সেই অধোগতিকেই নির্দেশ করে। 

গত ঈদের সময় কোরবানির পশুর চামড়ার দামের দরপতন নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল। ন্যায্যমূল্য না পেয়ে অনেক ব্যবসায়ী চামড়া মাটিতে পুঁতে দিয়েছিল কিংবা ফেলে দিয়েছিল। প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি গরু কোরবানি হলেও এবার করোনা মহামারীর কারণে প্রায় ৩০ শতাংশ কম কোরবানি হয়েছে। অথচ কোরবানির পশুর চামড়ার দাম গতবারের থেকে এবার ২০ থেকে ২৯ শতাংশ কমিয়ে ধরা হয়েছে। ঈদের আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চামড়াশিল্পের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে।  ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৩৫ থেকে ৪০ টাকা ধরা হয়েছে। আর ঢাকার বাইরে ধরা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ২৮ থেকে ৩২ টাকা। এ ছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়া গত বছরের প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা থেকে কমিয়ে ১৩ থেকে ১৫ টাকা করা হয়।  আবার দরপতন ঠেকাতে ২৯ জুলাই কাঁচা ও ওয়েট-ব্লু চামড়া রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে মন্ত্রণালয়। হিসাব অনুযায়ী, বড় আকারের গরুর চামড়া গড়ে ৩৫-৪০ বর্গফুট, মাঝারি আকারের গরুর চামড়া গড়ে ২৫-৩০ এবং ছোট আকারের গরুর চামড়া গড়ে ১৬-২০ বর্গফুটের হয়। তাতে সরকারের নির্ধারিত দাম হিসাব করলে বড় চামড়া কমপক্ষে দেড় হাজার টাকা, মাঝারি চামড়া হাজার টাকা ও ছোট চামড়ার দাম হয় কমপক্ষে ৬০০ টাকা। অথচ জানা গেছে, এ হিসাব থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ, শ্রমিকের মজুরি ও আড়তদারের মুনাফা বাদ দিলেও যা দাঁড়ায় তার কাছাকাছি দামেও এবার চামড়া বিক্রি হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণের নেপথ্যে ট্যানারি মালিকদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করে। বাজারে কর্র্তৃত্ব বজায় রাখতে তারা অনেক সময় শক্তিও প্রদর্শন করে থাকে বলেও অভিযোগ। বিগত দিনে কীভাবে তারা চামড়া না কিনে সমাজের সাধারণ ও ধর্মপ্রাণ মানুষদের বিপদে ফেলেছিল, সে দৃষ্টান্তও খুব একটা বিস্মৃতির অতলে চলে যায়নি। এছাড়া আড়তদাররা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে তাদের বহু বকেয়া রয়েছে। 

গৌরবের সঙ্গে বলা হয়ে থাকে, চামড়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। কিন্তু বাস্তবে এক দশক ধরেই এই খাত পতনশীল; শুধু সিদ্ধান্তহীনতায় আর দুর্নীতির শিকার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো বা ইপিবির তথ্যানুযায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রায় ১৬ শতাংশ বাজার পতন হয়েছে। ২০১৩-১৪ সাল থেকে এ খাতের আয় ১ দশমিক শূন্য ৮ থেকে ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করেছে। বাংলাদেশে ২০১৬-১৭ সালকে চামড়াবর্ষ হিসেবে সরকারিভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চামড়াশিল্পের পতন সেই সময় থেকেই শুরু। সেখান থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে শিল্পমন্ত্রীর নেতৃত্বে টাস্কফোর্স গঠন করা হলেও তাদের সিদ্ধান্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। 

দেশের চামড়াশিল্পের রপ্তানি কমার প্রধান কারণটি ইতিমধ্যে চিহ্নিত হয়েছে এবং তা নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। সেটা হলো চামড়াশিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়নি বলে বিশ্ববাজারে আমাদের চামড়াজাত পণ্যের ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আমরা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ নামের এক বৈশ্বিক সংস্থার মানসনদ অর্জন করতে পারিনি। কোনো দেশের এই সনদ না থাকলে চামড়াজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সেই দেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে উৎসাহ দেখায় না। আমাদের চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রধান কারণ এটাই। হাজারীবাগ থেকে সাভারে শিল্প স্থানান্তর সিদ্ধান্ত যুগান্তকারী ছিল। কিন্তু অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো, ইটিপি স্থাপনা নিয়ে যে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা, তা পিছিয়ে দিয়েছে বাজারকে।

বিশেষজ্ঞরা চামড়াশিল্পের উন্নয়নের জন্য দুটি উদ্যোগকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। এগুলো হলো- ১. কাঁচা চামড়ার চোরাচালান বন্ধ করা, ২. চামড়ায় মূল্য সংযোজন ও বাজারজাত করার নীতি নেওয়া। তাদের দাবি, এ দুটি কাজ করা গেলে আগামী চার থেকে পাঁচ বছর চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমপক্ষে ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে পারবে বাংলাদেশ। এছাড়া আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তিনির্ভর খাত হিসেবে চামড়াশিল্পকে গড়ে তোলা, ট্যানারি শিল্পের মালিকদের সমন্বয়ে রপ্তানি গিল্ডের ‘প্রাইস সেন্টার’ গঠন, ক্রমান্বয়ে সব রপ্তানিমুখী ট্যানারির জন্য এলডব্লিউজি কমপ্লায়েন্স বাধ্যতামূলক করা, ট্যানারি শিল্পের শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্য ন্যূনতম মজুরি, নিরাপত্তা ও মানবিক ব্যবস্থা সৃষ্টি করা, ব্যাংকঋণের মধ্যে স্বচ্ছতা আনার মতো পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করার মাধ্যমে চামড়াশিল্পে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। আর কোরবানির ঈদের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চামড়াশিল্পকে কথিত কারসাজি থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।