দুই পরিবারে মাতম

কেনাকাটা শেষ করেও প্রিয়জনদের কাছে ফেরা হলো না ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছেলে মেহেদী হাসান রনির (২৫)। গত মঙ্গলবার লেবাননের রাজধানী বৈরুতে জোড়া বিস্ফোরণে শতাধিক নিহতের মধ্যে তিনি একজন।

গতকাল বুধবার ভোরে সদর উপজেলার মাছিহাতা ইউনিয়নের ভাদেশ্বরা গ্রামে তার মৃত্যুর খবর আসার পর থেকে পরিবারে মাতম চলছে। ছেলের ছবি হাতে নির্বাক বাবা তাজুল ইসলাম। মা ইনারা বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। কারও সান্ত্বনা কাজে আসছে না।

নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানান, চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় রনি। গ্রামের একটি স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। বাহরাইন প্রবাসী বাবা পরিবারের কথা ভেবে তাকে বিদেশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর চড়া সুদে ৫ লাখ টাকা ঋণ করে ২০১৪ সালের ৯ মার্চ লেবানন যান রনি। গত মার্চে দেশে ফিরতে চেয়েছিলেন। স্বজনদের জন্য কেনাকাটাও করেন। কিন্তু করোনা মহামারীতে আটকে যায় ফেরা। এরপর থেকে প্রতীক্ষায় ছিলেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই মায়ের কোলে ফিরবেন। কিন্তু হঠাৎ তার মৃত্যুর খবরে ভেঙে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

গতকাল দুপুরে সরেজমিন ভাদেশ্বরা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, রনির ছবি হাতে নির্বাক বসে আছেন বাবা। উঠোনে মা শোকে প্রলাপ করছেন, বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। প্রতিবেশীরা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ছোট বোন জেসমিন আক্তার হ্যাপি ভাইয়ের নানা স্মৃতি আওড়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে অন্ধকার দেখছেন সবাই।

বাবা তাজুল ইসলাম বলেন, ‘রনি লেবানন যাওয়ার পর আমি দেশে ফিরে আসি। আমার রোজগার তেমন না থাকায় পরিবারের পুরো চাপ পড়ে ওর ওপর। বৈরুতে একটি বিপণিবিতানের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে সে মাসে ২০ হাজার টাকা পাঠাত। সংসারের খরচের পর খুব একটা ঋণ পরিশোধ করা হয়নি। এখনো ২ লাখ টাকা বাকি আছে। চোখে সবকিছু অন্ধকার দেখছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সর্বশেষ গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রনির সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়। রাতে রনির এক সহকর্মী ফোন করে তার হাসপাতালে ভর্তির কথা জানায়। এরপর আজ (গতকাল) ভোরে আবারও ফোন করে সে মৃত্যুর খবর দেয়। আমি সরকারের কাছে ছেলের মরদেহ দেশে আনার দাবি জানাচ্ছি।’ রনির ছোট বোন হ্যাপি বলেন, ‘প্রতিদিন কাজে যাওয়ার আগে ভিডিও কলে ভাই আমার দুই মেয়ের সঙ্গে কথা বলতেন। দেশে আসবে বলে ওদের জন্য চকলেট ও খেলনা কিনে রেখেছিল। কিন্তু সবকিছু শেষ হয়ে গেল।’

মাছিহাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আল আমিনুল হক পাভেল বলেন, ‘মরদেহ দেশে আনার কিছু নিয়ম আছে। আমরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে মরদেহ আনতে সব ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

মাদারীপুরে মিজানের বাড়িতে মাতম : লেবাননের বৈরুতে জোড়া বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার শিকারমঙ্গল ইউনিয়নের কাজীকান্দি গ্রামের মিজানুর রহমান খান (২৫)। গতকাল বুধবার সকালে তার মৃত্যুর খবর বাড়িতে আসার পর শোকের মাতম চলছে।

নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানান, তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় মিজান। ধারদেনা করে ৬ লাখ টাকায় ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি লেবাননের বেরু শহরে যান। সেখানে একটি হোটেলে কাজ করতেন। মিজানের স্ত্রী ও তিন বছর বয়সী এক কন্যাসন্তান রয়েছে।

মিজানের বাবা জাহাঙ্গীর খান বলেন, ‘গত মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে আমার সঙ্গে মিজানের সর্বশেষ কথা হয়। এরপর বিভিন্ন মাধ্যমে তার মৃত্যুর খবর জেনেছি। তার মরদেহ দ্রুত দেশে ফেরত আনার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।’