১১ আগস্ট : জিওফ্রে বয়কটের শততম সেঞ্চুরির দিন

দক্ষিণ আফ্রিকায় বাড়ি আছে জিওফ্রে বয়কটের। শীত পড়লে বিলেত থেকে পালিয়ে যান গরমের দেশে। কিছুদিন থাকেন। শীত কমলে ফেরেন ইংল্যান্ডে। তো কোনো এক গ্রীষ্মে দক্ষিণ আফ্রিকার বাড়িতে বয়কটের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন মাইকেল ভন। বাড়িতে ঢুকে দেখেন এক বিশেষ টি-শার্ট পরে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বয়কট। টি-শার্টের সামনে লেখাÑ ‘হয়্যার ইউ দেয়ার?’ পেছনের লেখাটি আরও অর্থবহ ‘লিজেন্ড। হেডিংলি, ১১ আগস্ট ১৯৭৭।’

টি-শার্টের সরল বাক্যটি পড়ার পর দিনটার মাহাত্ম্য মনে পড়তে বাধ্য। এই দিনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শততম সেঞ্চুরিটি করেছিলেন বয়কট। তাও আবার হোমগ্রাউন্ড হেডিংলিতে। উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছিল ইয়র্কশায়ার জুড়ে। গোটা ইংল্যান্ডও ছিল উৎসবমুখর। ব্রিটিশ পত্রপত্রিকার শিরোনাম দখল নিয়েছিলেন বয়কট।

গ্রেগ চ্যাপেল ১৯৭৭-এ যাদের নিয়ে অ্যাশেজ খেলতে ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন তারা কেউ আহামরি ছিলেন না। ৩-৪টা নাম বাদ দিলে ইতিহাস সেই দলের কাউকে মনে রাখেনি। বয়কটেরও সময়টা ভালো যাচ্ছিল না। মাসখানেক আগেও ইংল্যান্ড দলে ছিলেন না তিনি। ’৭৪-এ জটিল মৌসুম কাটানোর পর ক্রিকেট থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন বয়কট। স্বেচ্ছা অবসর ভেঙে ক্রিকেট মাঠে ফেরার ঘোষণা দেন ’৭৭-এর জুলাইয়ে। ইংল্যান্ড সেই ঘোষণায় খুব খুশি হয়নি। অ্যান্টি-বয়কট লবি ’৭৪-৭৫-এ অস্ট্রেলিয়া এবং ’৭৬-এ উইন্ডিজের বিপক্ষে না খেলায় বয়কটের ওপর খুব ক্ষেপে ছিল।

বয়কটের প্রত্যাবর্তনকে তাই অম্লমধুর বলা যায়। ট্রেন্টব্রিজে সেঞ্চুরি করেন। তবে স্থানীয় তারকা ডেরেক ল্যান্ডেলকে রানআউট করায় দর্শকরা তার ওপর খুশি হতে পারেননি। ইংল্যান্ড সেই টেস্ট জিতে পাঁচ ম্যাচের অ্যাশেজে ২-০তে এগিয়ে যায়। এরপর চতুর্থ টেস্ট শুরু হয় হেডিংলিতে।

বয়কট ৯৯তম ফার্স্ট ক্লাস সেঞ্চুরি করেছিলেন কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে। তাই টেস্টে তার সম্ভাব্য শততম সেঞ্চুরি নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল ইংল্যান্ড। খেলা ঘরের মাঠে ছিল বলে চাপেও ছিলেন বয়কট, ‘আমি যতটা সম্ভব লোকের আগ্রহকে পাশে সরিয়ে রাখতে চাইছিলাম। কিন্তু চাপটা ক্রমে বাড়তে লাগল। রাতে ঘুম হচ্ছিল না। সিøপিং পিল খেয়েও যখন কাজ হলো না তখন মাইক ব্রিয়ারলিকে ব্যাপারটা বললাম।’ অধিনায়ক তাকে জার্মান দার্শনিকের বই থেকে উদ্ধৃতি পড়ে শান্ত করেন।

হেডিংলিতে চতুর্থ টেস্ট খেলতে নামার আগে বয়কট মনেপ্রাণে চাচ্ছিলেন ইংল্যান্ড যেন টসে হেরে ফিল্ডিং করে। কিন্তু ব্রিয়ারলি জিতলেন টস, আর ইংল্যান্ড গেল ব্যাটিংয়ে। ক্লান্ত পায়ে ওপেনিংয়ে নামেন বয়কট। প্রথম ওভারেই শূন্য রানে আউট ব্রিয়ারলি। লাঞ্চের আগে ৩৬ রানে অপরাজিত বয়কট। চা-বিরতির সময় ৭৯ রানে। দিনান্তে গ্রেগ চ্যাপেলের বলে অনড্রাইভ করে সেঞ্চুরিতে পৌঁছান বয়কট। হেডিংলির উৎসাহী দর্শক মাঠে নেমে পড়েন। স্ট্রাইকিংয়ে দাঁড়ানো গ্রাহাম রোপ তাদের ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন। পরে ব্যর্থ হয়ে রণে ভঙ্গ দেন। শেষ পর্যন্ত ১৯১ করে লেন প্যাসকোর বলে আউট হয়েছিলেন বয়কট। ইংল্যান্ড ম্যাচ জিতেছিল ইনিংস ও ৮৫ রানে। অ্যাশেজও জিতে নেয় তারা।

বয়কট ক্রিকেট শিখেছিলেন ইংল্যান্ডের সবচেয়ে রক্ষণশীল কাউন্টি ক্লাব ইয়র্কশায়ারে। একটা গল্প আছে ইয়র্কশায়ারের রক্ষণশীলতা নিয়ে। ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে সেলুনে গিয়েছেন বাবা। পাশে বসা এক বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন, ছেলে কি ক্রিকেট খেলে? বাবা বললেনÑ হ্যাঁ। অল্প স্বল্প খেলে, মাত্রই শুরু করেছে। বৃদ্ধ জানতে চাইলেন ছেলেটির জন্ম ইয়র্কশায়ারে কি-না। ইতিবাচক উত্তর পেয়ে বৃদ্ধ হেসে বলেন, ‘আমার বাবা বলতেন, ইয়র্কশায়ারের হয়ে খেলতে গেলে শুধু ইয়র্কাশায়ারে জন্মালেই হবে না, স্ট্রেট ব্যাট হাতে জন্মাতে হবে।’ ইয়র্কশায়ারের সেই ঐতিহ্যে আপাদমস্তক লালিত বয়কট জন্মেছিলেন স্ট্রেট ব্যাট হাতেই। নিখুঁত ওপেনার হিসেবে তার খ্যাতি ছিল। উইকেট বিলিয়ে দিতেন না। কপিবুক ক্রিকেট খেলতেন বলে স্বার্থপরতার অপবাদও জুটেছিল।

শোনা যায়, ১৯৭৮ সালে এক টেস্ট ম্যাচে ইয়ান বোথাম নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে বয়কটকে রান আউট করেছিলেন। বয়কট স্বভাবসুলভ মন্থর ব্যাটিং করছিলেন। বোথামের মনে হয়েছিল স্বার্থকেন্দ্রিক খেলা খেলছেন বয়কট। তাই ক্রিজে গিয়েই তাকে রান আউট করে দেন। কথিত আছে ব্যাট করতে নামার সময় ড্রেসিংরুমে পুরো দল নাকি বোথামকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছিল, ‘যেটা করতে যাচ্ছ সেটা যেন করে আসতে পারো।’

সেদিন ৮০ বলে ২৬ রান করেছিলেন বয়কট।