দেড় কোটি মানুষ গরিব হয়েছে করোনায়

করোনার কারণে দেশের অন্তত দেড় কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এ হিসাব করেছে সরকারের থিংক ট্যাংক হিসেবে পরিচিত পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনৈতিক বিভাগ (জিইডি)। সংস্থাটি বলছে, আসন্ন অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় করোনার প্রভাবকে অন্তর্ভুক্ত করতে একটি প্রাথমিক হিসাব করা হয়েছে। হিসাব অনুসারে, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২৯ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আর বেকার হয়েছে কয়েক কোটি মানুষ। তবে এ বেকারত্ব সাময়িক। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাস্তবে দারিদ্র্যের হার আরও বেশি। এটা খোলা চোখে দেখলেই বোঝা যায়। এ জন্য জিইডির উচিত একটি বাস্তবসম্মত পরিসংখ্যানিক হিসাব অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় যুক্ত করা। এতে পরিকল্পনা সুফল পেতে সুবিধা হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের শেষে দেশে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়ে হয়েছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। এর মধ্যে চরম দারিদ্র্যের হারও ১১ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ১০ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ছিল ২১ দশমিক ৮ শতাংশ।

জিইডির প্রাথমিক হিসাব অনুসারে, ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত দেশে দারিদ্র্য বেড়েছে ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ, যা গত অর্থবছরে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল। এই হিসাবে করোনার কারণে তিন মাসে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে ৯ শতাংশের বেশি। শিগগিরই এ হিসাবটি অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের জিইডির সদস্য ও সিনিয়র সচিব ড. শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জুন অবধি দেশের দারিদ্র্য কভিড-১৯ মহামারীর কারণে বেড়েছে। এর হার দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ। এই সময় প্রচুর মানুষ বেকার হয়েছে। তবে সেটা সাময়িক। আস্তে আস্তে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এই বেকারত্ব কমে যাবে। দেশের ৯৫ শতাংশ অর্থনৈতিক কার্যক্রম ইতিমধ্যে আবারও চালু হয়েছে। যে লোকেরা তাদের কর্মসংস্থানে নিযুক্ত হওয়ায় কথা ছিল তা হচ্ছে, ফলে বেকারত্ব হ্রাস পেতে শুরু করেছে। এই সংখ্যা নেহাত কম নয়। দেশের অন্যান্য কিছু সংস্থার হিসাবে এই সংখ্যা আরও বেশি। আমরা সার্বিক বিষয় বিবেচনায় এনে এই প্রাথমিক হিসাব করেছি। আমরা দারিদ্র্যের হারকে কমিয়ে আনতে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করছি। যেখানে কভিড-১৯ মহামারীর বিষয়টি আগে বিবেচনায় ছিল না।’

বিবিএসের হিসাব অনুসারে, দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৬৫ লাখ। গত বছর দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশ হিসাবে মোট গরিব ছিল ৩ কোটি ৪১ লাখ ৩ হাজার ২৫০ জন, আর করোনার তিন মাসে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ, ফলে গরিব মানুষের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৮৯ লাখ ৫ হাজার ১০০। এই হিসাবে মোট দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ১ কোটি ৪৮ লাখ ১ হাজার ৮৫০। তবে করোনার প্রভাবে দেশে দারিদ্র্যের হার নিয়ে বেশ কয়েকটি সংস্থা তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর মধ্যে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) বলেছে, এ সংখ্যা ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) হিসাবে প্রায় ৩৯ শতাংশ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) হিসাবে তা ৩০ শতাংশের ওপরে। ব্র্যাক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের হিসাবেও দারিদ্র্যের হার জিইডির চেয়ে ঢের বেশি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশ^ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে দারিদ্র্য করোনার কারণে ৪০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। করোনার প্রভাব কত মারাত্মক ছিল, তা খোলা চোখে দেখলেই বোঝা যায়। বহু মানুষ ঢাকা ছেড়েছে, বহু মধ্যবিত্ত গরিব হয়ে গেছে। এ জন্য বাজারে মোটা চালের চাহিদা বেড়ে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘৯-১০ শতাংশ মানুষকে বিবেচনার বাইরে রেখে কোনো পরিকল্পনা প্রণয়ন হলে তার সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম। কারণ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সফলতা প্রাপ্তির মূল ভিত্তি হলো বেইজ লাইন।’ জিইডিকে আরও বাস্তবসম্মত তথ্য পরিকল্পনায় যুক্ত করারও পরামর্শ দেন তিনি।

একই মন্তব্য করেছেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যে হিসাব করেছি তার একটি স্বচ্ছ ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু জিইডি কীভাবে করেছে, সেটি আমরা জানি না। সরকারি হিসাবে দারিদ্র্যের হার ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ বলা হলেও এটি সংখ্যার অনুপাতে কম নয়, এটা ঠিক। তবে বাস্তবে দেশের গরিব মানুষের সংখ্যা আরও বেড়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বেসরকারি অনেক সংস্থা মানুষের ওপর করোনার প্রভাব নিয়ে কাজ করলেও বিবিএস হাত গুটিয়ে বসে ছিল। তাদের উচিত ছিল ছোট আকারে হলেও এটি জরিপ করা। এতে দেশের ভবিষ্যৎ যেকোনো পরিকল্পনা প্রণয়নে সুবিধা হতো, বাস্তবসম্মত হতো। জিইডির অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নের আগে বিবিএসের মাধ্যমে এ বিষয়ে একটি জরিপ করানো উচিত ছিল। নইলে ভাসা-ভাসা তথ্য দিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন করলে তা বাস্তবসম্মত হবে না।’