পাটশিল্প বাঁচাতে প্রণোদনা-ঋণ জরুরি

করোনা মহামারীর দুর্যোগে একের পর এক আঘাতে জর্জরিত হয়ে পড়ছে বিপর্যস্তপ্রায় পাটশিল্প। কদিন আগে চরম দুর্দিনের মধ্যেই রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর প্রায় ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিককে ‘স্বেচ্ছা অবসর’ দিল বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন- বিজেএমসি।  করোনা-সংকটে আধমরা পাটশিল্প শ্রমিকদের ওপর এটা ছিল খাঁড়ার ঘা। শ্রমিকদের ‘স্বেচ্ছা অবসরে’ পাঠিয়ে রাষ্ট্রীয় পাটকলগুলোকে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপির মাধ্যমে পরিচালনায় বিজেএমসির এই সিদ্ধান্ত সংগত কারণেই তুমুল সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রীয় নীতিতে মুমূর্ষু এই শিল্প এতটাই অবহেলিত যে, করোনার অভিঘাত থেকে অর্থনীতি বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ থেকেও বঞ্চিত হতে যাচ্ছে পাটশিল্প। অথচ, সর্বশেষ পাঁচ বছরেও পাট রপ্তানি থেকে ৫ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে দেশ। একদা দেশের প্রধান রপ্তানিদ্রব্য পাটের বাজার ধরে রাখা এবং পাটজাত দ্রব্যের উন্নয়নে যখন সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসার কথা তখন উল্টো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো রপ্তানিমুখী এ খাতে ঋণ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে।

বুধবার দেশ রূপান্তরে ‘প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ পাচ্ছে না পাটশিল্প’ শিরোনামের প্রতিবেদনে পাটশিল্প রক্ষার বদলে পাট নিয়ে টালবাহানার খবর প্রকাশিত হয়।  প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পাটশিল্পকে প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা প্যাকেজে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান অর্থ সচিবকে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে তিনি বলেছেন, পাট রপ্তানিকারক ও বেসরকারি জুটমিলগুলো কৃষকের কাছ থেকে পাট কিনলে পণ্যটির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয়। এছাড়া সরকারি পাটকলও এবার পাট কিনছে না। এই অবস্থায় পাটশিল্পকে প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় আনতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নতুন করে চিঠি দিতে হবে অর্থ মন্ত্রণালয়কে।  এ বিষয়ে অর্থ বিভাগকে ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি। আর অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে, প্রতিমন্ত্রীর চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিষয়টি বিবেচনার জন্য চিঠি দিয়েছে অর্থ বিভাগ। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজে নির্দিষ্ট কোনো শিল্প খাতের কথা উল্লেখ করা হয়নি।  ওই সার্কুলারে দেশের সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বৃহৎশিল্প, কৃষি, সেবা, ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প ও রপ্তানিমুখী শিল্প রয়েছে। তিনি বলেন, পাট একদিকে কৃষি, অন্যদিকে রপ্তানিমুখী শিল্প। ব্যাংকগুলো এ খাতে কেন ঋণ দিতে চাইছে না, তা খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রীর এই চিঠির আগে করোনাকালীন আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ তালিকায় কাঁচা পাট রপ্তানি খাতকে অন্তর্ভুক্ত করতে কাঁচা পাট রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে অর্থ বিভাগকে চিঠি দেওয়া হলেও তাতে কোনো কাজ হয়নি। তবে অর্থ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দেওয়া হয়েছে।  বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পাদনের মাধ্যমে মূল্য সংযোজন করে কাঁচা পাট রপ্তানি হয়।  রপ্তানির আগে কাঁচা পাট যাচাই বা গ্রেডিং করা হয়। বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী গ্রেডিংকৃত কাঁচা পাট মেশিনের মাধ্যমে ১৮২ দশমিক ২৫ কেজি পাকা বেলে রূপান্তর করে তা রপ্তানি হয়ে থাকে। তাই কাঁচা পাট রপ্তানি অবশ্যই বাণিজ্যের মধ্যে পড়ে। উল্লেখ্য, কাঁচা পাট যাচাই এবং প্যাকিং করার কাজে দৌলতপুর, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, উত্তরবঙ্গসহ সারা দেশে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার শ্রমিক নিয়োজিত।  কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, চলতি মৌসুমে ৮২ লাখ বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। গত বছর দেশে ৬৮ লাখ বেল পাট উৎপাদন হয়।  কৃষি তথ্যসেবা সূত্রে জানা গেছে, দেশে পাটচাষি ৪০ লাখ। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চার কোটি মানুষের জীবিকার সঙ্গে পাটশিল্প জড়িয়ে আছে।

একুশ শতকে এসে সারা বিশ্বে সিনথেটিক ফাইবারের বদলে পাট এবং পাটের মতো অর্গানিক ফাইবারের কদর এবং চাহিদা দুটোই উত্তরোত্তর বাড়ছে। অথচ এই যুগে এসেই একদা সোনালি আঁশের দেশ খ্যাত বাংলাদেশে সব সম্ভাবনা ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পাটশিল্পের ধারাবাহিক ক্রমাবনতি কোনো যুক্তিতেই ধোপে টেকে না। প্রতিবেশী দেশ ভারতে এবং দেশের বেসরকারি পাটকলগুলোও লাভজনক। আর প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত পাট খাত লোকসান গুনছে। দুর্নীতি রোধ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে অবশ্যই পাটকলগুলোর লোকসান কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে সবার আগে, করোনার এই দুর্যোগের কালে দেশের লাখ লাখ পাটচাষি ও পাটশ্রমিকদের জীবিকা বাঁচাতে পাটশিল্পে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণের আওতায় আনা জরুরি। যে দেশের বিজ্ঞানীরা পাটের জীবনরহস্য আবিষ্কার করতে পারেন সে দেশের সরকার আন্তরিক হলে পাটচাষি, পাটকল মালিক, শ্রমিক সবাইকে সঙ্গে নিয়েই পাটশিল্পের পুনরুজ্জীবন সম্ভব।