সততাই জীবনের সৌন্দর্য

সততা মানবচরিত্রের শ্রেষ্ঠ গুণ। জীবনে সততার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। মহান আল্লাহ মানবসমাজকে যে সীমারেখায় চলতে নির্দেশ দিয়েছেন, তাতে সততা অপরিহার্য। সততা ও স্বচ্ছতা নবী, আউলিয়া, ফেরেশতা ও সৎ ব্যক্তিদের গুণ। শুধু মুসলমান নয়, বরং মুমিন হোক বা কাফের প্রত্যেক মানুষের এ গুন থাকতে হবে। অফিসার হোক বা কর্মী, শিক্ষক হোক বা ছাত্র, পীর হোক বা মুরিদ, ধনী হোক বা গরিব, পিতা-মাতা হোক বা সন্তান-সন্তুতি সব স্তরের সবার জীবনে সততা একান্ত জরুরি।

মানবসমাজের নিরাপত্তা, প্রশান্তি, সুখ-শান্তি, বিনির্মাণ, উন্নতির ভিত্তি হল সততা। সততা মানুষকে উন্নত আদর্শ ও নিদারুণ নৈতিকতায় ভূষিত করে। এর মাধ্যমেই ইসলামি জিন্দেগির পূর্ণতা অর্জিত হয়। তাই সততাকে আপন করে নিতে গুরুত্ব দিয়েছে ইসলাম। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এর বহু ফজিলত ও প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছে। সততা ও স্বচ্ছতা অবলম্বনকারী নারী-পুরুষের মর্যাদা, আখেরাতে তাদের পুরস্কার, সৃষ্টির মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা এবং মহান আল্লাহর কাছে তাদের নৈকট্যের কথা আলোচনা করা হয়েছে।

কোরআন-হাদিস অধ্যয়নে এ কথা বোঝা যায়, সততা বিষয়টি অনেক ব্যাপক। সততা শুধু সত্য কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সত্য কথা বলার সঙ্গে কাজ-কর্ম, আকিদা-বিশ্বাস সবগুলোতে সততার অন্তর্ভুক্ত।

সততার পুরস্কার

সততা মুমিনের অনেক বড় গুণ। সততার পুরস্কার দেবেন মহান আল্লাহ। সত্যবাদীদের প্রশংসা ও গুণাবলি উল্লেখ করে মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনরা যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখল, ওরা বলে উঠল, এটা তো তাই, আল্লাহ ও তার রাসুল যার প্রতিশ্রুতি আমাদের দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তার রাসুল সত্যই বলেছিলেন। আর এতে তাদের ইমান ও আনুগত্যই বৃদ্ধি পেল। মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সঙ্গে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে, তাদের কেউ কেউ শাহাদাত বরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কোনো পরিবর্তন করেনি। কারণ আল্লাহ সত্যবাদীদের পুরস্কৃত করেন, তাদের সত্যবাদিতার জন্য এবং তার ইচ্ছা হলে মুনাফিকদের শাস্তি দেন অথবা তাদের ক্ষমা করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সুরা আহজাব, আয়াত : ২২-২৪)

এ সুরারই ৩৫ নম্বর আয়াতে সততা এবং স্বচ্ছতাসহ অন্য গুণাবলিতে গুণান্বিত নারী-পুরুষের প্রতিদান ও পুরস্কারের আলোচনা করে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাদের জন্য রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান।

কিয়ামতের দিন সততার কারণে জান্নাত মিলবে সত্যবাদীদের। আল্লাহতায়ালা বলবেন, ‘এই সেই দিন যেদিন সত্যবাদীরা তাদের সততার জন্য উপকৃত হবে, তাদের জন্য আছে জান্নাত যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে; আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তার প্রতি সন্তুষ্ট; এটা মহাসফলতা।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ১১৯)

স্বচ্ছতা ও অস্বচ্ছতা

মুমিনের হৃদয় স্বচ্ছ, মুনাফিকের অন্তর অন্ধকারাচ্ছন্ন; তাই মুমিন সত্যবাদী ও মুনাফিক মিথ্যাবাদী হয়ে থাকে। মুমিনরাই যে সত্যবাদী আল্লাহতায়ালা তা অন্য আয়াতে এভাবে বলেছেন, ‘মুমিন তো তারাই যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রতি ইমান এনেছে, অতঃপর তাতে কোনো সন্দেহে পতিত হয়নি এবং তাদের ধন-প্রাণ দিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করেছে। তারাই তো সত্যবাদী।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১৫)

সততাকে হাদিসে অন্তরের প্রশান্তি, মুক্তি লাভ, জান্নাত অর্জন ও আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং ধনসম্পদে বরকতের মাধ্যম বলা হয়েছে। মুমিন এজন্যই সত্যবাদী যে, সে যা বলে তার অন্তরেও তা থাকে। কাজে-কর্মে হুবহু সেটাই বাস্তবায়ন করে দেখায়। কোনো লুকোচুরি বা অস্বচ্ছতার আশ্রয় নেয় না। নবীজি (সা.) বলেন, ‘সত্যবাদী ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’

সততায় বরকত

ব্যবসা-বাণিজ্যসহ যাবতীয় লেনদেনে সততার পরিচয় দিলে তাতে বরকত হয়। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যদি ক্রেতা-বিক্রেতা সত্য বলে এবং ভালো-মন্দ প্রকাশ করে দেয়, তাহলে তাদের লেনদেন বরকতময় হবে। আর যদি উভয়ে মিথ্যা বলে এবং দোষত্রুটি গোপন করে, তাহলে এ লেনদেন থেকে বরকত উঠিয়ে নেওয়া হবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৫৩২)

সততা অবলম্বকারীদের জন্য মহানবী (সা.) সুপারিশ করবেন। সততা ও স্বচ্ছতার প্রশংসা করে মহানবী (সা.) বলেন, আমার সুপারিশ তার জন্য যে সাক্ষ্য দেবে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। এমন নিষ্ঠার সঙ্গে যে তার অন্তর তার মুখকে সত্যায়ন করবে এবং মুখ অন্তরকে সত্যায়ন করবে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৮০৭০)

মিথ্যার পরিণতি

আজকাল বিভিন্ন মিথ্যা বলা সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অথচ নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলে, তবে তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস।’ (সুনানে আবু দাউদ)

আবার মিথ্যা বলাটা অনেকের জন্য ফ্যাশন স্বরূপ। যে ব্যক্তি যত পরিমাণ মিথ্যা বলতে পারে, তাকে তত পরিমাণ চতুর ও বুদ্ধিমান মনে করা হয়। মিথ্যা ও ফাঁকিবাজি এসব গুনাহের কাজ, এ বিশ^াসটি মানুষের হৃদয় থেকে উঠে যাচ্ছে। অথচ এগুলো এমন কাজ যার দ্বারা গোটা সমাজ অশান্তি, রিজিকের সঙ্কীর্ণতার মধ্যে নিপতিত হয়।

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘ধিকৃত সে, যে কোনো মুমিনের ক্ষতি করে অথবা তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১৯৪০)

চিন্তা করে দেখতে হবে জীবনের বাঁকে বাঁকে ও প্রতিটি পদক্ষেপে আমরা কত মিথ্যার কী পরিমাণ আশ্রয় নিচ্ছি। সততা থেকে আমরা কত পিছিয়ে। এ কথা বুঝতে বাকি থাকার কথা নয় যে, মিথ্যাকে একটি ফ্যাশনে পরিণত করা নিরেট বোকামি ও কদর্যতা। এতে নবী-রাসুলদের গুণাবলি থেকেও দূরে থাকা হয়। তাই সব সময় কথা ও কাজে সততা, সত্যতা ও স্বচ্ছতার পরিচয় দেওয়া এবং মিথ্যার অভিশাপ ও গ্লানি থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। এতে দুনিয়া ও আখেরাতে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে উপযুক্ত বিনিময় মিলবে।