কৃষক রাজনীতি থেকে মহানায়ক

আমাদের ইতিহাসচর্চার দিকে তাকালে একটা সংকট, সমস্যা বা সীমাবদ্ধতা লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের সংগ্রাম কবে থেকে শুরু হয়েছে, তার ধারাবাহিক ইতিহাস নিয়ে সংকট রয়েছে। যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করে, তারা মনে করে ১৯৪৭ এর দেশভাগের পর থেকে এখানকার বাঙালিরা পাকিস্তানের প্রতি তাদের মনোভাব পাল্টে ফেলে এবং আন্দোলন শুরু করে। তাই তাদের কাছে ভাষা আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ। আমি ইতিহাসের মানুষ হিসেবে মনে করি, ঘটনা ঘটার জন্য সময় প্রয়োজন। সেই বিবেচনায় এখানে স্বাধীনতার মতো ঘটনা ঘটতে সময় লেগেছে মাত্র ২০/২৫ বছর। তবে একটা জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্র গঠনের আকাক্সক্ষা মাত্র ২০ বছরে তৈরি হওয়া নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এর তেমন একটা প্রমাণ পাওয়া যায় না কেননা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি তৈরি হওয়ার পর প্রথম হরতাল হয়েছে ১৯৪৮ সালের এপ্রিল মাসে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, দ্বন্দ্বটি জন্মলগ্ন থেকেই ছিল।

জন্মলগ্ন থেকে দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ার উৎস কী? আমি মনে করি আলাদা করে রাষ্ট্র গঠনের ভাবনা শুরু হয়েছে ১৯৪০ এর দশকের শুরু থেকেই। অর্থাৎ লাহোর প্রস্তাব থেকেই এ ভাবনা শুরু হয় এবং এর ওপর ভিত্তি করে মুসলিম লীগ বাংলায় রাজনীতি শুরু করেছিল। এখন যারা মুসলিম লীগ করেছেন, তারা কী ধরনের মানুষ ছিলেন? তারা মূলত কৃষকনির্ভর ছিলেন। ১৯০৯ সালের পর যে কোনো নির্বাচনে জয়লাভ করতে গেলে কৃষকদের সমর্থন সবচেয়ে বেশি জরুরি ছিল। কারণ, তারাই ছিল তখনকার সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠী। তাদের ভোটই নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করত। সে কারণে চাইলেও কেউ কৃষকবিরোধী ধারণা পোষণ করতে পারত না। আমরা মুসলিম লীগ বলতে জিন্নাহকে বুঝি। কিন্তু তিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগের নেতা। বঙ্গীয় মুসলিম লীগের নেতৃত্ব বলতে যাদের বোঝানো হয়, তাদের মধ্যে একজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে এসেছেন, সেই পরিস্থিতি অনুধাবন করলে তার মুসলিম লীগ করার যৌক্তিকতা বোঝা যায়। কংগ্রেস ছিল মূলত জমিদার এবং উঁচুতলার মানুষদের দল। তারা হয়তো ভালো লোক হতে পারেন, কিন্তু তারা ঐতিহাসিক কারণেই কৃষকের স্বার্থবিরোধী অবস্থানে ছিলেন। কিছুতেই এই দুটো রাজনৈতিক ধারার মিল হওয়া সম্ভব ছিল না। তারপরেও মিল হওয়ার প্রচেষ্টা হয়েছে। কিন্তু প্রতিটা প্রচেষ্টা ভেঙে দিয়েছে দিল্লিকেন্দ্রিক কংগ্রেস। তারা পূর্ববঙ্গের মানুষদের নিয়ে একসঙ্গে রাজনীতি করার পক্ষপাতি ছিলেন না।

পূর্ববঙ্গে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হতে থাকল কবে থেকে? মূলত ১৮৫৭ থেকে ১৯০৫Ñ এই সময়কালের মধ্যে এ অঞ্চলে রাজনৈতিক সচেতনতা ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, পূর্ববঙ্গের মানুষদের মধ্যে এ সচেতনতা তৈরি হয়। আর পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে তাদের বৈশিষ্ট্য আলাদা ছিল। পশ্চিমবঙ্গ ছিল কলকাতার বাবুসমাজের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু এই বাংলা বাবুবলয়ের বাইরে ছিল। ঠিক একইভাবে অতীতেও আমরা আর্য বলয়ের মধ্যে ছিলাম না। বাংলার কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে সবচেয়ে বেশি কৃষক বিদ্রোহ হয়েছে এ বাংলাতে। যদিও ১৭৭০ সালে দুর্ভিক্ষে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। কিন্তু বিদ্রোহটাকে টেনে নিয়ে গেছে পূর্ববাংলার মানুষ। ১৭৬০ সালে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর থেকে তা কিন্তু আর থামেনি। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়েছে এবং তারই সর্বশেষ পর্ব হলো বাংলাদেশের উত্থান। এই সময়ে এখানকার মানুষ অনেক বেশি সংঘবদ্ধ হয়েছে, তাদের মধ্যে জঙ্গিত্ব তৈরি হয়েছে এবং তারা সশস্ত্রভাবে প্রতিহত করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। এই রাজনৈতিক সমীকরণ আমাদের ইতিহাসে থাকে না। আমরা শুরু করতে চাই ১৯৪৭ সাল থেকে। এই সময় থেকে যেহেতু পাকিস্তান বিরোধিতা শুরু হয়েছে, তাই আমরা এ সময়কালকে বেছে নিতে চাই। কিন্তু প্রকৃতঅর্থে সাধারণ মানুষ সবসময়ে তার বিরোধিতা করেছে, যে তার স্বার্থবিরোধী অবস্থানে গিয়েছে। এ কারণে বঙ্গবন্ধুকে ভালোভাবে পাঠ করা উচিত। তার আত্মজীবনী পড়ে দেখলে বোঝা যায়, যারা সাধারণ জনগণকে নিপীড়ন করছে, তাদের দাবিয়ে রাখতে চাচ্ছে, তিনি তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছেন।

বঙ্গবন্ধু যখন দেখলেন কংগ্রেস হিন্দু জমিদারদের পক্ষ নিচ্ছে, তখন তিনি এর বিরোধী অবস্থান নিলেন। এখানে কিন্তু ধর্ম মুখ্য বিষয় নয়। বরং মুখ্য বিষয়টি হলো নিপীড়ন। ১৯৪৯ সালে যখন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সভা করতে গেলেন, সেই সভা না করতে দেওয়ার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু অবস্থান নিয়ে বললেন যে সভা হবে। যে কারণে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তার সম্পর্কটা হলো। এ ঘটনাগুলো বাদ দিয়ে আপনি যদি রাজনৈতিক ইতিহাসকে বিচার করতে চান, তাহলে বিভ্রান্তি তৈরি হবে। ১৯৫২ সালেই কি আমরা স্বাধীনতার কথা ভাবলাম? ১৯৪৭ সালে জীবন দিয়ে, রক্ত দিয়ে পাকিস্তান তৈরি করলাম, আর মাত্র পাঁচ বছরেই আমরা স্বাধীনতার কথা ভাবলাম? এ ধারণাগুলোর উৎস পাকিস্তানবিরোধিতা থেকে। আমরা মনে করেছি, বাঙালি জাতীয়তাবাদ মানেই পাকিস্তানবিরোধিতা। বস্তুতপক্ষে, শেখ সাহেবের রাজনীতি আর সাধারণ মানুষের রাজনীতির ঐকতান হচ্ছে, অত্যাচারীর বিরোধিতা করা। অত্যাচারীর চেহারায় যারা এসেছে, তিনি এবং জনগণ তার বিরুদ্ধেই লড়াই করেছে। পাঠক যদি সংহত রাজনৈতিক অবস্থান অন্বেষণ করতে যান, তাহলে দেখতে পাবেন সশস্ত্র সামাজিক প্রতিরোধই এর উৎস। ১৭৬০ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে কৃষক সমাজ। তারাই বঙ্গভঙ্গ তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে।

১৮৫৭ সালে কলকাতা নিশ্চুপ থাকলেও কৃষকরা কিন্তু প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এখন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে সিপাহি বিদ্রোহে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সর্বভারতীয় কৃষক সমাজ। অর্থাৎ কৃষকরা ঔপনিবেশিক আমলে সবচেয়ে বড় বিদ্রোহী চরিত্র ধারণ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় সামাজিক আন্দোলনের পর্যায় তৈরি হয়েছে, ধীরে ধীরে তা সামাজিক প্রতিরোধে পরিণত হয়ে রাজনৈতিক প্রতিরোধের পর্যায়ে পৌঁছায় এবং সর্বশেষ তা একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যুদয় ঘটায়। এরই ধারাবাহিকতা ধরে এগোলে দেখা যাবে যে ১৯৩৭ সালে মানুষ মুসলিম লীগ এবং কৃষক প্রজা পার্টিকে বেশি ভোট দিয়েছে। আবার ১৯৪০-৪৭ এর মধ্যে বাংলার প্রায় সমস্ত ভোট পাওয়া দলটিই মাত্র একটি কেন্দ্রে জয়লাভ করা দলে পরিণত হয়েছিল। এর মূল কারণ, কৃষকরা যখন দেখেছে এই দলটি কৃষকের স্বার্থের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তখন তারা ভোট দিয়েছে। আবার কৃষকের স্বার্থের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার রাজনীতি ভোটের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এই সমীকরণ বাদ দিয়ে আমরা শুধু ১৯৪৭ পরবর্তী ইতিহাসকে তুলে ধরতে চাই। এটা একটা বড় ধরনের ত্রুটিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। এটা পরিত্যাগ করে আমাদের রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতাকেই বিবেচনা করা উচিত।

এ কথা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগ বলল, আলাদা রাষ্ট্রের স্থলে একটি রাষ্ট্র হবে। তার বিরুদ্ধে জনগণ ক্ষোভ প্রদর্শন করেছিল। এ বিষয়ে জিন্নাহ সাহেব খুব বাজে একটা যুক্তি দেখালেন যে টাইপিংয়ের ভুল হয়েছে। জিন্নাহ সাহেব এটা কী করে বলেন, যখন ১৯৪০-৪৬ পর্যন্ত কলকাতা, ঢাকায় মিছিল-মিটিংয়ে আলোচনা হয়েছে একটা স্বাধীন রাষ্ট্র কীভাবে চলবে। আবুল হাশিম সাহেব তো তখন ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান’ নামে একটা ইশতেহার পর্যন্ত ছাপিয়ে ফেলেছেন। ১৯৪৬ সালের এ ঘটনার প্রভাব শেখ সাহেবসহ অনেক তরুণের ওপর পড়েছিল। অথচ এই ইতিহাস আমরা অনেকেই পর্যালোচনা করতে না চেয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পরের সময়কেই বেছে নিতে চাই। প্রকৃতঅর্থে এটা যারা করেন, তারা পাকিস্তান রাষ্ট্রটিকে গ্রহণযোগ্য করতে চান এবং তারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাশীল। আমি তো মনেই করি না পাকিস্তান নামে কোনো রাষ্ট্র হয়েছিল। আমার মতে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল অনেক আগে। এর মধ্যে পাকিস্তান ছিল একটি চাপিয়ে দেওয়া বিষয়, যেটা বেশিদিন টিকতে পারেনি। আমি মনে করি, দুটো আলাদা রাষ্ট্রকে জোর করে পতাকা লাগিয়ে এক করা হয়েছিল। তার পরিণতিতেই ১৯৪৮ সাল থেকে বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। তাই শেখ সাহেবকে এই বিদ্রোহের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। শেখ সাহেব ছিলেন এই বিদ্রোহের একজন মুখপাত্র। তিনি ভদ্রলোকের রাজনীতি করেননি, করেছেন বিদ্রোহের রাজনীতি। তিনি ষড়যন্ত্রের রাজনীতি না করে মাঠের রাজনীতি করেছেন। এটাই তার ধারাবাহিকতা।

আমি নিজে গবেষণা করে দেখেছি যে কৃষক যখন ভোটাধিকার পেয়েছে, তখন তারা সবচেয়ে শক্তিশালী হয়েছে। তারা লড়াই করে যে ক্ষমতা দেখাতে পারেনি, ভোটাধিকার পাওয়ার পরে সে ক্ষমতা দেখাতে পেরেছিল। ইংরেজদের কৃষিনীতি দেখলে বোঝা যায় যে তারা কৃষককে পুঁজি করতে চেয়েছিল। তারা ১৯১১ এর পরে কলকাতার ওপর হাল ছেড়ে দিয়েছিল। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৬ সালে দুটি রাষ্ট্রের চিন্তা প্রাধান্য তৈরি করেছিল আর ১৯৪৬ সালে সেটা জিন্নাহ ধ্বংস করলেন। ১৯৪৭ সালে যৌথ বাংলার আওয়াজ উঠল আর এটাকে ধ্বংস করল নেহরুর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় কংগ্রেসের প্রভাবাধীন বঙ্গীয় কংগ্রেস। আসলে তারা চাপে পড়ে ভেবেছিল যে এই কৃষকদের অধীনে থাকা যাবে না। তাই যারা ভেবেছে যে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নের সূচনা হয়েছে, তারা মস্ত বড় ভুল করেছে। এটা অনেক আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। যখন যৌথ বাংলার স্বপ্ন মার খেয়ে গেল, তখন মুসলিম লীগের কিছু নেতৃত্ব এ স্বপ্নকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা নেয়। তাদের ‘ইনার গ্রুপ’ বলা হতো। আমি এদের প্রধান নেতা মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছি। সেখানে তিনি বলেছেন, তারা সেই সময় গোপন সভা করতেন এবং তাদের ধারণা ছিল এ রাষ্ট্রের প্রধান রাজনৈতিক নেতা হবেন গোপালগঞ্জের লম্বা লোকটা। এই ইতিহাসকে বাদ দিয়ে শুধু ভাষা আন্দোলনকেন্দ্রিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের দৃষ্টিভঙ্গি খুবই বিভ্রান্তিকর। এর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত মূল্যায়ন তো দূরে থাক, বরং তাকে ইতিহাসেই প্রান্তিক করে তোলা হয়।

লেখক : মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, শিক্ষক ও লেখক