বন্ড জালিয়াতিতে নানা কৌশল

বন্ড সুবিধায় আনা রপ্তানিমুখী শিল্পে ব্যবহৃত পণ্য খোলা বাজারে বিক্রিতে বিভিন্ন কৌশল নিচ্ছে চোরাকারবারিরা। অনেক ক্ষেত্রেই বন্ড সুবিধায় আনা মালামাল পরিবহনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভুয়া কিংবা পুরনো কাগজ ব্যবহার করছে তারা। চোরাই পণ্য ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানে পাঠাতে একাধিকবার পরিবহন বদল করে রাজস্ব কর্মকর্তাদের নজর এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। বন্ড জালিয়াতি রোধে সম্প্রতি এনবিআর কঠোর অবস্থানে যাওয়ার পর কৌশল পাল্টিয়ে বন্ডেড সুবিধায় আনা মালামাল স্থানান্তর করেছে চোরাকারবারিরা। সর্বশেষ গত বুধবার এ প্রক্রিয়ায় পণ্য স্থানান্তরের সময় কুমিল্লায় মহাসড়কে একটি বিদেশি কাপড়ভর্তি গাড়ি আটক করতে সমর্থ হন কর্মকর্তারা। ভুয়া নিলামের কাগজ দেখিয়ে বন্ডের কাপড় খোলা বাজারে বিক্রির চেষ্টাকালে ওই গাড়ি আটক করা হয়।

জানা গেছে, গত প্রায় এক বছর ধরে বন্ড চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানে নামে এনবিআরের ঢাকা বন্ড কমিশনারেট অফিস। এর বাইরে ভ্যাট গোয়েন্দা, শুল্ক গোয়েন্দাসহ মাঠপর্যায়ের অফিসগুলোও এ বিষয়ে গুরুত্ব দেয়। পুরান ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় বন্ড সুবিধায় আনা কাপড় চোরাইপথে বিক্রির গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে হানা দিয়ে কাপড় আটকের পাশাপাশি মামলাও হয় বন্ড চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত গডফাদারদের বিরুদ্ধে। এদের বেশ কয়েকজন আবার গ্রেপ্তারও হয়। যুগপৎ অভিযানে দুর্বল হতে থাকে সুতা, কাপড় আমদানির সঙ্গে জড়িত বন্ড চোরাকারবারিরা। তবে সূত্র জানিয়েছে, কিছুদিন ধরে ফের শক্তি সঞ্চয় করছে তারা। এরই অংশ হিসেবে কৌশল পাল্টে আবার সক্রিয় হচ্ছে।

কুমিল্লা ভ্যাট কমিশনারেট অফিস সূত্র জানিয়েছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কুমিল্লার বিশ^রোডে একটি কাভার্ড ভ্যান আটকের পর সেখানে বন্ডের চোরাই কাপড় পাওয়া যায়। সূত্র জানায়, সংবাদ পাওয়ার পর একাধিক পয়েন্টে টিম প্রস্তুত রাখে ভ্যাট কমিশনার অফিস। গাড়ি আটকের পর জানা যায়, ইপিজেড থেকে গাড়িতে মালামাল তুলে চট্টগ্রামের দেওয়ান হাটে ওইসব মালামাল অন্য গাড়িতে তোলা হয়। এসব বিক্রির জন্য ২০১৮ সালের নিলামের কাগজ ব্যবহার করা হয়। গাড়ির চালক ওই কাগজ দেখায়। তবে পরীক্ষায় আটককৃত কাপড়ের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। শুল্ককরসহ আটককৃত এসব কাপড়ের মূল্য প্রায় ৫৩ লাখ টাকা।

কুমিল্লা ভ্যাট কমিশনারেট অফিসের কমিশনার বেলাল হোসাইন চৌধুরী বলেন, বহুদিন থেকে প্রকৃত কাপড় আমদানিকারকরা শুল্কমুক্তভাবে গার্মেন্টসের নামে আমদানিকৃত কাপড় খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ করে আসছিলেন। এরই প্রেক্ষিতে এ কাজে নগদ অর্থে গোপন সংবাদদাতা নিয়োজিত করে কুমিল্লা কাস্টমস ও ভ্যাট টিম। বন্ড জালিয়াতির এ চক্রটি অত্যন্ত চতুর ও শক্তিশালী। আমরা এ ধরনের জালিয়াতির আরও খবর পাচ্ছি। শিগগিরই ব্যাপকভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করা হবে। এছাড়া আটককৃত কাপড়ের মালিকসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।

রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কাঁচামালসহ পণ্য তৈরির সঙ্গে জড়িত এক্সেসরিজ শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করার সুযোগ পায়। তবে শর্ত হলো এসব কাঁচামাল এনবিআরের অনুমোদিত গুদামে রেখে তা দিয়ে তৈরি পণ্য শতভাগ রপ্তানি করতে হবে। এটি বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা বা বন্ড সুবিধা নামে পরিচিত। স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে হলে তা প্রযোজ্য শুল্ককর পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু একশ্রেণি রপ্তানিকারক দীর্ঘদিন ধরে এসব শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা কাপড় স্থানীয় বাজারে চোরাইপথে বিক্রি করছে। এর ফলে শুল্ক পরিশোধ করে বাণিজ্যিকভাবে একই পণ্য আমদানিকারকরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। এতে স্থানীয় উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে সরকারও বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়।