প্রায় দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির হার গড়পড়তা ৬ শতাংশের ওপরে বিরাজ করছিল। এরপর ২০১৬ সাল থেকে ৭ শতাংশের ওপরে এবং সর্বশেষ ২০১৯ সালে ৮.১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এখন বাংলাদেশের জিডিপির আকার ৩৪৭.৯৯১ বিলিয়ন ডলার, পিপিপি (Purchaging Power Parity) অনুযায়ী যার পরিমাণ আরও বেশি; ৮৬০.৯১৬ বিলিয়ন। জিডিপির আকার অনুযায়ী বিশ্বে আমাদের অবস্থান ৩৯তম আর পিপিপির ওজনে ৩০তম। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী এখন মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ ২০৬৪ ডলার। এই বৈশ্বিক করোনা বিপর্যয়ের মধ্যে অধিকাংশ উন্নত দেশে যেখানে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সেখানে সব পূর্বাভাস মিথ্যা প্রতিপন্ন করে ২০২০ সালে বাংলাদেশ ৫.২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। বাংলাদেশ বিশ্বের দ্রুততম উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি। স্বাধীনতার পর এ দেশ নিয়ে আমাদের উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে যারা একসময় হাসি-ঠাট্টা করতেন, তারাও এখন উন্নতি দেখে সমীহ করা শুরু করেছেন। যেকোনো মাপকাঠিতেই এই অর্জন ঈর্ষণীয়। এখন প্রশ্ন হলো এই উন্নতি গণমানুষের জীবনমানের কতটুকু পরিবর্তন ঘটাল এবং এই পরিবর্তন ইতিবাচক ও টেকসই কি না?
বিবিএসের (Bangladesh Bureau Statistics) উপাত্ত অনুযায়ী দেশে বছর শুরুতে দারিদ্র্যের হার ছিল ২০.৫ শতাংশ। অর্থাৎ দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল তখন ৩ কোটি ৪০ লাখ। বিআইডিএস (Bangladesh Institute of Development Studies) তাদের এক জরিপে দেখিয়েছে যে, কভিড-১৯ মহামারীর ফলে আরও ১ কোটি ৬৪ লাখ প্রান্তিক মানুষ নতুন করে গরিবদের খাতায় নাম লিখিয়েছে। আবার আরেকটি হিসাবে তারা বলেছেন, কভিড-পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্যের হার ২০.৫ থেকে ৩৫ শতাংশে বেড়ে গেছে। কোয়ার্টাইলভিত্তিক আয়-বণ্টনের ওপর হালনাগাদ তথ্য না পাওয়ায় ১৯৮৩ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত Indexmundi-এর ভাণ্ডার থেকে যে পুরনো তথ্য পেলাম, তাতে দেখা যাচ্ছে, ওই সময়ে উচ্চতম ১০ শতাংশ উপার্জনকারীর আয়ের অংশ ২১.৯০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৬.৮০ শতাংশে উঠেছে। একই সময়ে নিম্নতম ১০ শতাংশ উপার্জনকারীর আয়ের অংশ ৪.৫০ শতাংশ থেকে কমে নেমে গেছে ৩.৭০ শতাংশে। দেশে নাগরিকদের মধ্যে আয়বৈষম্য যাচাই করার একটি পরিমাপক হলো ‘গিনি সহগ’। শূন্য থেকে এক মূল্যমানের এই স্কেলে তাত্ত্বিকভাবে শূন্য পূর্ণ আয়-সমতা আর এক চরম আয়-বৈষম্য নির্দেশ করে। আমাদের দেশে ২০১০ সালে এর মান ছিল ০.৪৫৮, ২০১৬ সালে এটি বেড়ে দাঁড়ায় ০.৪৮২। সিপিডি (Centre for Policy Dialogue) এখন প্রাক্কলন করে বলছে, এই সহগের মান ২০২০ সালে ০.৫২ হয়ে যেতে পারে। কারণ, তারা দেখতে পেয়েছেন, ২০১০ সালে যেখানে উচ্চতম ৫ শতাংশ উপার্জনকারীর আয়ের অংশ ছিল নিম্নতম ৫ শতাংশ উপার্জনকারীর আয়ের ৩১.৫ গুণ, সেখানে ২০১৬ সালে সেটা বেড়ে হয়ে গিয়েছিল ১২১ গুণ। কভিডের কশাঘাতে এই আয়-বৈষম্যে যে আরও বড় ফারাক তৈরি হয়েছে, তা তো নিশ্চিত।
এই যদি দেশের মানুষের আর্থিক অবস্থার চিত্র হয়, তাহলে একনাগাড়ে দেড় দশক ধরে যে আমরা উচ্চপ্রবৃদ্ধির জিডিপি অর্জন করলাম, তা গেল কোথায়? এটা কি আমাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটায়নি বা কল্যাণ বয়ে আনেনি? আসলে জিডিপি শুধু দেশের অর্থনীতির আকারটা পরিমাপ করে, মানুষের কল্যাণ বা জীবনমান না। অর্থনৈতিক উন্নয়নের নেতিবাচক দিক, যেমন পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈষম্য এগুলোকে এটা কখনো বিবেচনা করে না। একটা নির্দিষ্ট সময়ে দেশের সীমানার মধ্যে যেসব পণ্য ও সেবা উৎপন্ন হয়, সেসবের মূল্যের যোগফল হলো জিডিপি। এজন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হলে কোনো সমাজে মদ্য ও কোকেনের মতো ক্ষতিকারক পণ্যের উৎপাদনও জিডিপিকে বাড়িয়ে দেয়। একটা অসম (unjust)) সমাজ এবং একটা সমমাত্রিক (egalitarian) সমাজের মধ্যে এটা কোনো পার্থক্য টানতে পারে না, যদি উভয়ের অর্থনীতির আকার এক হয়। এজন্য ১৯৬৮ সালেRobert Kennedy তার বিখ্যাত নির্বাচনী ভাষণে বলেছিলেন, ‘It (GDP) measures everything in short, except that which makes our life worthwhile.’ একই কারণ ভুটান জিডিপির পরিবর্তে জাতীয় সুখ (GNH, Gross National Happiness) বিবেচনা করে। এখন ভারত Ease of Living Index(ELI) এবং নিউজিল্যান্ড Genuine Progress Indicator (GPI) এর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। আবার এই জিডিপিকে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে যখন মাথাপিছু আয় হিসাব করা হয়, তখন তা আরেক প্রহেলিকার জন্ম দেয়।
আয় ও সম্পদ-বৈষম্য শুধু আমাদের দেশের সমস্যা নয়; এটা একটা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। এ মুহূর্তে বিশ্বের ৬.৯ বিলিয়ন দরিদ্র মানুষের যে সম্পদ আছে, তার দ্বিগুণেরও বেশি আছে ধনাঢ্য মাত্র এক শতাংশ মানুষের হাতে। ২০১৮ সালে বিশ্বের দরিদ্রতম ৩.৮ বিলিয়ন লোক যে সম্পদ ধারণ করত, মাত্র ২৬ জন ধনকুবের তার সমপরিমাণ ধনের মালিক ছিল। এই বৈষম্য নানা আর্থসামাজিক সমস্যা তৈরি করে; জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, সুশাসন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন প্রভৃতি ক্ষেত্রে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ ও বাধা সৃষ্টি করে। এর শিকল ভাঙা না গেলে এটা অপ্রতিরোধ্য নিয়মে সমাজে একটি দুষ্টচক্র তৈরি করে; সেখানে বংশপরম্পরায় ধনী আরও ধনী এবং গরিব আরও গরিব হতে থাকে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সমস্যার গভীরে যেতে হবে; খুঁজে বের করতে হবে এর মূল কারণ এবং দরকার হবে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের।
আধুনিক মার্ক্স হিসেবেখ্যাত ফরাসি অর্থনীতিবিদ Thomas Picketty তার Capital in the Twenty-First Century গ্রন্থে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে বিগত শতাব্দীর আশির দশক থেকে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পরিবর্তিত রাষ্ট্রীয়নীতির বদৌলতে সম্পদের মালিকানা সীমিতসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীয় ভবন হয়ে একটি অভিজাত গোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে। তার মতে, সমাজে যত দিন সম্পদ কুক্ষিগত করার ব্যবস্থা বিরাজমান থাকবে, তত দিন বৈষম্য চলতেই থাকবে। সরকারি নীতি এবং হস্তক্ষেপই কেবল এই প্রবাহের গতিপথ ঘোরাতে পারে।
বর্তমান সমাজে বৈষম্যের প্রধান কারণগুলো হলো শিক্ষা, দক্ষতা ও নৈপুণ্য অর্জনে সুযোগের অভাব, প্রযুক্তির বিস্ময়কর প্রবৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার বাণিজ্যিকীকরণ, লৈঙ্গিক বৈষম্য, সর্বোপরি বিশ্বায়ন। এর বাইরে ব্যক্তিগত গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্যও এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। সাধারণ মানের অদক্ষ কর্মীর চেয়ে একজন চৌকস ও দক্ষ কর্মী যে বেশি উপার্জন করবে, তা তো স্বতঃসিদ্ধ। তবে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে মানুষকে যেমন দক্ষ করা যায়, তেমনি উন্নত পরিবেশ, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে তার বুদ্ধির বিকাশ ও কর্মক্ষমতাও বাড়ানো যায়।
আমরা অনেককেই বলতে শুনি, উন্নয়নের প্রাথমিক স্তরে বৈষম্য একটু বেড়েই থাকে; পরে এটা কমে যায়। নোবেল বিজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ Simon Kuznets এই দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৩২ সালে মার্কিন মন্দার ক্রান্তিকালে জিডিপির প্রাথমিক ধারণা তার মাথা থেকেই বের হয়, যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় Jhon Maynard Keynes সেটাকে পরিপূর্ণতা দেন। Kuznets এই প্রকৃতির চিত্রায়ণে টিলার মতো একটি বক্ররেখাও প্রবর্তন করেন, যেটি Kuznets Curve নামে পরিচিতি পায়। এই রেখাটি ভূমি থেকে ক্রমে উপড়ে ওঠে, তারপর এটা আবার নিচে নামা শুরু করে একসময়ে ভূমিতে মিশে যায়।
এর বিপরীতে আছেন আরেক নোবেল বিজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ Joseph Eugene Stiglitz। তিনি দৃষ্টান্ত দেখান যে, পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে যে বিস্ময়কর উন্নয়ন ((East Asia Miracle) ঘটে, সেখানে এই জাতীয় বৈষম্য দেখা যায়নি। কারণ, সেখানে উন্নয়নের সুবিধাদি প্রথম থেকেই পুনঃপুনঃ বিনিয়োগ এবং ভূমি সংস্কার করে গ্রামীণ উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তা ছাড়া, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও শ্রমিকদের মজুরি জীবনমানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করার জন্য সরকারি নীতি গ্রহণ করা হয়। মূল কথা হলো উচ্চপ্রবৃদ্ধি প্রথমে বৈষম্য নিরসনে রসদ জোগায়, যা পরে অধিকতর উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। এই প্রক্রিয়ায় উচ্চপ্রবৃদ্ধি এবং নিম্নবৈষম্য সহাবস্থান করতে থাকে।
এখন আমাদের সামনে প্রশ্ন আমরা উন্নয়নের কোন মডেল অনুসরণ করব? পুঁজিপতিদের বিনিয়োগ প্রবণতা বেশি আর স্বল্প আয়ের মানুষের ভোগপ্রবণতা বেশি। পুঁজিপতিদের অনুকূলনীতি গ্রহণ করা হলে তাত্ত্বিকভাবে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান হবে, দারিদ্র্য কিছুটা কমবে, তবে বৈষম্য বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু আমাদের দেশে বাস্তবে তা ঘটছে না; অনেক পুঁজি পাচার হয়ে যাচ্ছে। আবার বৈষম্য হ্রাসের নীতি নেওয়া হলে প্রথম পর্যায়ে বিনিয়োগে কিছুটা ভাটা পড়বে বটে, কিন্তু মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়বে, ভোগ বাড়বে, বাড়বে জনসন্তোষ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা। পরিণতিতে অর্থনীতি ফিরে পাবে গতিশীলতা। আসলে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে রচনা করতে হবে সেতুবন্ধ, রক্ষা করতে হবে ভারসাম্য। একজন আরেকজনের পরিপূরক। একপেশে কোনো ব্যবস্থাই টেকসই হতে পারে না।
লেখক
খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক
rulhanpasha@gmail.com