ইসলামি বিধানে অপব্যয়

আয়-ব্যয় মানবজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অতীব প্রয়োজনীয় বিষয়। জীবনকে সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আয় অনুযায়ী ব্যয় করা যেমন প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন অপচয় ও অপব্যবহার না করা। অথচ মানব সমাজে অপচয় ও অপব্যয় অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। এর প্রভাবে ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসলাম একদিকে যেমন হালাল উপায়ে অর্থ উপার্জনের নির্দেশ দিয়েছে। অপরদিকে হালাল উপায়ে উপার্জিত অর্থসম্পদ হালাল পথে ও পদ্ধতিতে ব্যয় করারও নির্দেশ দিয়েছে। মানব সমাজে অর্থ ও সম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপচয় ও অপব্যয় বর্তমানে একটি বৈশ্বিক সমস্যায় রূপান্তরিত হয়েছে। ইসলাম এটাকে স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করেছে।

আরবি ‘ইসরাফ’ শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো সীমালঙ্ঘন, অপচয়, অপব্যয়, অমিত ব্যয়, বাড়াবাড়ি, মাত্রাতিরিক্ত, অপরিমিতি। ভাষাবিদরা ইসরাফের সংজ্ঞায় বলেছেন, কোনো নিকৃষ্ট বা তুচ্ছ উদ্দেশ্যে প্রচুর অর্থসম্পদ ব্যয় করা এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করা। অনেকে ইসরাফের সংজ্ঞায় মানুষের কথা এবং কাজের সীমালঙ্ঘন করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ইসরাফ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এগুলোর ফল খাও, যখন ফলন্ত হয় এবং দান করো কর্তনের সময় এবং অপব্যয় কোরো না। নিশ্চয়ই তিনি অপব্যয়ীদের পছন্দ করেন না।’ ইসরাফ ধনী-দরিদ্র উভয়ের পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে। আবার তা পরিমাণগত দিক দিয়ে ও পদ্ধতিগত দিক দিয়েও হয়ে থাকে। মুহাদ্দিস সুফিয়ান সাওরি (রহ.) বলেন, আল্লাহতায়ালার আনুগত্যের বাইরে যা খরচ করো তা ইসরাফ বা অপব্যয়, যদি তা পরিমাণে কমও হয়।

মানুষ শিশুকালে তার মা-বাবার আচরণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে মা-বাবা যদি অপচয়কারী হয়, তাহলে সন্তানও অপচয়ের শিক্ষা পায়। এ জন্য স্বামী-স্ত্রীকে ইসলামের হুকুম তথা মধ্যপন্থা মেনে চলা আবশ্যক। কারণ, বেশিরভাগ মানুষ অর্থসম্পদ হাতে এলে হিসাব ছাড়া খরচ করে। সে একবারও ভেবে দেখে না, দুনিয়ার জীবন সর্বাবস্থায় সমান থাকে না। আজ হাতে অর্থ আছে, কাল নাও থাকতে পারে। তাই প্রত্যেকের উচিত, আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি নিয়ামত যথাযথভাবে খরচ করা। আজকের অত্যাবশ্যকীয় ব্যয় নির্বাহ করে বাকি অর্থসম্পদ ভবিষ্যতের জন্য জমা করে রাখা। যা তার বিপদের সময় কাজে আসবে।

অধিকাংশ মানুষ যারা অসচ্ছল ও দরিদ্র অবস্থায় দিনাতিপাত করে অথবা দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে জীবনযাপন করে তারা ওই সময় ধৈর্যধারণ করে। কিন্তু তারা যখন হঠাৎ ধনী হয়ে যায় কিংবা সুখের জীবন পায় তখন তারা জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ব্যয়ের ক্ষেত্রে তারা বেহিসাবি হয়ে পড়ে, অপচয়ের এটিও একটি কারণ। অপচয়ের অন্যতম কারণ আরেকটি কারণ হলো, অপচয়কারীর সঙ্গ ও সাহচর্য। যেহেতু অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষ তার সঙ্গীর চরিত্র গ্রহণ করে, তাই সঙ্গী অপচয়কারী হলে তার অন্য সঙ্গীও অপচয়কারী হবে। হজরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ব্যক্তি তার সঙ্গীর চরিত্র গ্রহণ করে। সুতরাং তোমার সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করবে।’

অভিজ্ঞতার আলোকে দেখে গেছে, অপচয়ের মাধ্যমে মানুষ হঠাৎ করে যেকোনো কাজ করে বসে, পরিণতির কথা চিন্তা করে না। যখন মানুষ তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারে না, তখন এর পরিণতি হয় অত্যন্ত ভয়াবহ, যা মানুষকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। খরচের ক্ষেত্রে অপরিণামদর্শী চিন্তা এমন। মানবতার ধর্ম ইসলামের মূল সৌন্দর্যই হলো মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা। ইসলাম যেভাবে অপচয়কে নিষেধ করেছে তেমনি কৃপণতাকেও নিষেধ করে। মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে, নিয়মতান্ত্রিকতা মেনে সম্পদ ব্যয় করা, সচ্ছলতার সময় অসচ্ছল সময়ের জন্য সম্পদ জমা করে রাখা ইসলামেরই নির্দেশ। আর অর্থনীতির ক্ষেত্রেও তা কল্যাণকর। বর্তমান বিশ্বে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অপচয়-অপব্যয় বন্ধ করতে হবে। তবেই একটি সুষম সমাজ গড়ে উঠবে। যে সমাজে খাদ্যাভাব থাকবে না।

লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক