কোটিপতির সংখ্যা কমেছে

মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে দেশে কোটিপতি হিসাবধারীর সংখ্যা কমে গেছে। কমেছে তাদের আমানতের পরিমাণও। চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকে ১ কোটি বা তার চেয়ে বেশি আমানতকারীর সংখ্যা ১ হাজার ২১৪টি কমে ৮২ হাজার ৬২৫টিতে নেমে দাঁড়িয়েছে। তবে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা কমলেও এখনো ব্যাংক আমানতের উল্লেখযোগ্য অংশই তাদের দখলে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোটিপতিদের ব্যাংকে রাখা আমানতের পরিমাণ কমেছে দুই শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকে কোটিপতিদের আমানতের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকা, যা মার্চ শেষে ৫ লাখ ১৫ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকায় নেমে আসে। এ সময়ে কোটিপতিদের আমানতের পরিমাণ কমেছে ১১ হাজার ১১৯ কোটি টাকা।

বর্তমানে দেশে ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ৫ লাখ, যার মধ্যে কোটিপতিদের ব্যাংক হিসাবের পরিমাণ হচ্ছে শূন্য দশমিক শূন্য ৭৫ শতাংশ। মোট ব্যাংক হিসাবের একটি ক্ষুদ্র অংশ কোটিপতিদের হলেও ব্যাংক আমানতের প্রায় অর্ধেকেই তাদের দখলে রয়েছে। অবশ্য গত বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় চলতি মার্চে মোট আমানতে কোটিপতিদের হিস্যা কিছুটা কমেছে। চলতি মার্চ শেষে মোট আমানত ছিল ১২ লাখ ১০ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা, যার ৪২ দশমিক ৪২ শতাংশ ছিল কোটিপতিদের। আর গত ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলোতে আমানত ছিল ১০ লাখ ৬৫ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা, যার ৪৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ কোটিপতিদের ছিল।

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কোটিপতিদের ব্যাংক হিসাব ও আমানতের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়তে দেখা যায়। ২০১৯ সালে কোটিপতিদের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল ৮৩ হাজার ৮৩৯টি, যা ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৭৫ হাজার ৫৬৩টি। ব্যাংক হিসাবের ক্ষুদ্র অংশ হয়েও আমানতের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তাদের দখলে থাকায় এই ইঙ্গিত দেয় যে, ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে আর গরিবরা আরও গরিব। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ও সামাজিক ক্ষোভ তৈরি হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এ জাতীয় বৈষম্য দেশের প্রাথমিক উন্নতির সময়ে বাড়তে থাকে, যা পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে কমে আসে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত ১১ বছরে দেশে কোটিপতি ব্যাংক হিসাবধারীর সংখ্যা ৬২ হাজার ৯৮৯ জন বা চারগুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০০৯ সালের মার্চে দেশে কোটিপতি হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ১৯ হাজার ৬৩৬ জন। ২০০৯ সালের পর ব্যাংকে রাখা কোটিপতি আমানতকারীদের টাকার পরিমাণ ৭৯ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা থেকে প্রায় ছয়গুণ বেড়ে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ১১ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ৫ জন, যা ১৯৭৫ সালে ৪৭ জনে উন্নীত হয়। দেশে কোটিপতিদের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ১৯৮০ সালে ৯৮, ১৯৯০ সালে ৯৪৩, ১৯৯৬ সালে ২ হাজার ৫৯৪, ২০০১ সালে ৫ হাজার ১৬২, ২০০৬ সালে ৮ হাজার ৮৮৭ এবং ২০০৮ সালে ১৯ হাজার ১৬৩ জন ছিল।

যখন ব্যাংকে রাখা নগদ অর্থের প্রায় অর্ধেক যখন একটি ক্ষুদ্র অংশের দখলে রয়েছে তখন করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে সমাজের অন্য অংশ টিকে থাকার জন্য কঠিন লড়াই চালাচ্ছে। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের জরিপে দেখা গেছে, দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে শহুরে বস্তিবাসী ও গ্রামীণ দরিদ্রদের গড় আয় ৮০ শতাংশেরও বেশি কমেছে। করোনার প্রভাবে দিনমজুর, ভাঙাড়ি শ্রমিক, রেস্তোরাঁ শ্রমিক, গৃহকর্মী, পরিবহন, কৃষি, নির্মাণ ও কারখানা শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রিকশা শ্রমিকদের ৬৩ শতাংশ অর্থনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। এ পরিস্থিতিতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৪০ শতাংশ খাদ্যগ্রহণ হ্রাস পেয়েছে। গিনি সূচকে বর্তমানে বাংলাদেশের স্কোর হচ্ছে ৪৯৫, যা দেশের ধনীদের আরও ধনী ও দরিদ্রদের আরও দরিদ্র হওয়ার বিষয়টি প্রতিফলিত হয়। গিনি স্কোরে শূন্য স্কোর নিখুঁত সাম্যের প্রতিনিধিত্ব করে আর ১ নিখুঁত বৈষম্যকে প্রতিনিধিত্ব করে।