টিকটক ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের আল্টিমেটাম

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান টিকটক পরিচালনার যাবতীয় স্বত্ব কিনতে না পারলে অ্যাপটি নিষিদ্ধ করে দেবেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ নিয়ে তারিখও বেঁধে দিয়েছেন তিনি। কীভাবে এই অ্যাপটি লাখ লাখ ব্যবহারকারীকে আকর্ষণ করল? কেনই বা যুক্তরাষ্ট্র একে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করছে? লিখেছেন ওমর শাহেদ

দাঁড়িয়ে আছে আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো লাল একটি খেলনা ভল্লুক। একটি মঞ্চের ওপরে। নির্ভুলভাবে গেয়ে চলেছে মেয়েকণ্ঠে। প্রথম কলির পরের কলিতে তার সঙ্গে অনেকগুলো কণ্ঠ সমবেত হয়। ক্যামেরাটি প্যান আউট ভঙ্গিতে দেখায় আরও অনেকগুলো খেলনা ভল্লুক গাইছে। ভল্লুকটি কোমল ও বুদ্ধিমান, দেখতে অসাধারণ সুন্দর। টিকটক নামের একটি ভিডিও অ্যাপে ১৫ সেকেন্ডের এই ভিডিও অ্যাপটি কেনার জন্য আলাদা করে বাজেট করেছেন বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অ্যাপটি ইন্টারনেটে আসে। তারপর দ্রুত লাখ লাখ মানুষ এতে যুক্ত হন। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এই অ্যাপের মতো হাজার হাজার অ্যাপ তৈরি করেছে। ইন্টারনেটে ছেড়েও দিয়েছে। অসাধারণ অ্যাপটি নিয়ে পুরো বিশ^ আগ্রহী হয়ে উঠেছে। গেল ১৮ মাসেই টিকটক রোমাঞ্চপ্রিয়, সৃজনশীল ও তরুণ লাখ লাখ দর্শককে আকর্ষণ করছে।

ঝাং ইমিং

ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম টিকটক বানিয়েছেন ঝাং ইমিং। একজন চীনা ইন্টারনেট উদ্যোক্তা। জন্মেছেন ১৯৮৩ সালের এপ্রিলে চীনের লংইয়েনের সুচিয়ান প্রদেশে। লেখাপড়া করেছেন ন্যানখাই ইউনিভার্সিটিতে। ২০০৫ সালে মাইক্রো ইলেকট্রনিকসে পড়াশোনা করেছেন। ক্যাম্পাসেই স্ত্রীর সঙ্গে দেখা। এরপর বিয়ে। ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘হাকসুন’ নামের চীনের একটি ভ্রমণ ওয়েবসাইটের পঞ্চম কর্মী ও প্রথম প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। এক বছর পর টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে দেন ‘মাইক্রোসফট’-এ কাজ করতে। তবে করপোরেট নিয়মকানুনের জন্য বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি কোম্পানিটিও ছেড়ে দেন।

এরপর তিনি স্টার্টআপ কোম্পানি ‘ফ্যানফু’ চালু করেন। সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আবার হাকসুনে যোগ দেন। ২০০৯ সালে ‘এক্সপেডিয়া’ এটি কিনে নেয়। তিনি ফ্যানফুর রিয়েল স্টেট বিভাগটি দেখাশোনার জন্য নতুন একটি প্রতিষ্ঠান ‘৯৯ ফ্যাঙ.কম’ নামে চালু করেন। এটিই তার প্রথম নিজের প্রতিষ্ঠান। ২০১১ সালে খেয়াল করলেন, কম্পিউটার থেকে স্মার্টফোনে চলে যাচ্ছেন তার ব্যবহারকারীরা। ফলে একজন পেশাদার ম্যানেজারকে বেতনে নিযুক্ত করলেন এবং নতুন পরিকল্পনা ‘বাইটড্যান্স’ চালু করার জন্য এর দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন। তার অভিজ্ঞতা হয়েছে চীনের স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে তথ্য খুঁজে বের করতে সমস্যায় পড়ছেন। ফলে তার স্বপ্ন ছিল, যেসব বিষয় খুঁজে বের করে দিতে বলেছেন ব্যবহারকারীরা সেগুলো

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বের দেওয়া হবে। মূলধন উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলাপ না করায় তিনি প্রয়োজনীয় ফান্ড জোগাড় করতে পারেননি। এরপর ‘সিসকুয়েহেনা ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ’ তাকে শুরুর মূলধন দিতে রাজি হলো। ২০১২ সালে ‘বাইটড্যান্স’ নামক বহুজাতিক ইন্টারনেট প্রযুক্তি কোম্পানি চালু করলেন ঝাং ইমিং।

অবিশ্বাস্য উত্থান

২০১২ সালের আগস্টে ঝাং ইমিং বাইটড্যান্সের নতুন অ্যাপস খবর ও তথ্য প্ল্যাটফর্ম ‘হোওয়িও’ তৈরি করেন। অ্যাপসটি ২ বছরের মধ্যে ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি প্রতিদিনের ব্যবহারকারীর হয়েছে। এরপর প্রথম যারা তাকে বিনিয়োগ করতে অস্বীকার করেছিল, সেই ‘সিকোয়েরা ক্যাপিটাল’ আবার তার কাছে ফিরে এলো। ঝাং ইমিংকে তারা ১০০ মিলিয়ন বিনিয়োগ করল ২০১৪ সালে। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঝাং ইমিং বাইটড্যান্সের মাধ্যমে ভিডিও শেয়ারিং অ্যাপস ‘টিকটক’ তৈরি করলেন। চীনে এটি ‘তুইং’ নামক অ্যাপস হিসেবে পরিচিত। এতে সামান্য ট্রাম্পেট, বিউগল ইত্যাদির সুর আছে। শুরুতেই পণ্যটিতে লাখ লাখ মানুষ হিট করেন। বিশ্বজুড়ে টিকটক জনপ্রিয় হয়ে যায়। আসলে তিনটি অ্যাপের মাধ্যমে তৈরি টিকটক। ২০১৪ সালে চীনের সাংহাইতে শুরু হয়েছে মিউজিক্যাল. এলওয়াই। তবে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা করার খুব ভালো সূত্র লাভ করেছে এবং সেখানে ভালো বাজার ধরতে পেরেছে। ২০১৬ সালে চীনের বাজারে তাদের প্রযুক্তি মুঘল ‘বাইটড্যান্স’ একই ধরনের আরেকটি সেবা চালু করে। সেটির নাম দেয় ‘তুইং’। এক বছরের মধ্যে চীন ও থাইল্যান্ডে এটি ১০০ মিলিয়ন ব্যবহারকারীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই বাইটড্যান্স আলাদা একটি ব্যান্ড ‘টিকটক’র মাধ্যমে বিশেষ এই অ্যাপসকে ছড়িয়ে দেয়। ফলে তারা ২০১৮ সালে কিনে নেয় ‘মিউজিক্যাল.এলওয়াই’। তার মাধ্যমে টিকটককে বিশ্বে ছড়ানোর কাজ শুরু করেন। ঝাং ইমিং ‘মিউজিক্যাল.এলওয়াই’ সাইটটি ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দামে কিনে নেন এবং সেটিকে টিকটকের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলেন। তবে বাইটড্যান্সের প্রথম অ্যাপ ‘ন্যাইহান তুয়াজ্জি’ ২০১৮ সালে তার দেশের রেডিও ও টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দেয়। এরপর ঝাং ইমিং ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেন, ‘এই অ্যাপটি দেশের সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।’ ‘এর প্রয়োগ দুর্বল ছিল’ বলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিংপিং মনে করেছিলেন। নির্মাতা ঝাং ইমিং এরপর অঙ্গীকার করেন, এটি ভবিষ্যতে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আরও গভীর সম্পর্কের ভিত্তিতে কাজ করবে এবং তাদের রাজনীতিকে তুলে ধরবে।

বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা

বিশ্ব জুড়েই টিকটকের জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়ে চলেছে। ২০১৯ সালের হিসাবে মাসে টিকটকের এক বিলিয়নের বেশি ব্যবহারকারী ছিল। এখন তার বাইটড্যান্সের মূল্য ৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটিই তাকে আর্থিকভাবে প্রচণ্ড লাভবান করেছে। বিশে^র সবচেয়ে মূল্যবান স্টার্টআপ এটি। ঝাং ইমিংয়ের ব্যক্তিগত সম্পত্তির মূল্য আনুমানিক ২২ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই কাজ তাকে চীনের নবম ধনীতে পরিণত করেছে। পুরো কৃতিত্ব টিকটকের। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার তিন বছরের মাথায় বিশ্বের ৮০ কোটি মানুষ ব্যবহারকারী হয়েছেন। তারা সর্বক্ষণ বা প্রায়ই ব্যবহার করেন। নামকরাদের মধ্যে মার্কিন ইন্টারনেট ব্যক্তিত্ব, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সুরকার জ্যাক কিং, গায়িকা লরেন গ্রেসি, বেবি অ্যারিয়েল, লিসা ও লেনা, হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা উইল স্মিথ, ডোয়েইন জনসন, ইউটিউবার, সামাজিক গণমাধ্যম তারকা ও অভিনেতা ব্রেন্ট রিভেরা, টিকটকের কারণে হয়েছেন বিখ্যাত মার্কিন নৃত্যশিল্পী অ্যাডিসন রে, পুরুষ নৃত্যশিল্পী জেসন ডেরুলো, ব্যবহার করেন বিখ্যাত গায়িকা জেনিফার লোপেজ, মার্কিন-কিউবান গায়িকা ও গীতিকার কামিলা কাবাইয়ো এর জন্য বিখ্যাত হয়েছেন। কানাডিয়ান কৌতুক অভিনেত্রী ও টিক শোর উপস্থাপিকা লিলি সিং, মার্কিন গায়িকা সেলেনা গোমেজ, ব্রিটিশ অভিনেত্রী মিলি ববি ব্রাউন, মার্কিন-কানাডিয়ান অভিনেতা নোহা স্ন্যাপ, মার্কিন নৃত্যশিল্পী চালি ডি-মিলিয়োও তাই। তাদের বেশির ভাগই ব্যক্তিগত প্রচার ও শেয়ারিংয়ের জন্য প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করেন।

ফিচার ও ট্রেন্ড

বিশেষ ধরনের মোবাইল অ্যাপস ‘টিকটক’ ব্যবহারকারীদের একটি ছোট আকারের ভিডিও তৈরি করতে দেয়। সেটির সঙ্গে থাকে সুর। ভিডিওটি একটি ফিল্টারের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। দেখার জন্য সেভ করা যায়, প্রয়োজনে এডিটও করা যায়। তারা এর সংগীতের সঙ্গে নিজেদের তৈরি সুরও যোগ করতে পারেন। যে বিপুল সংগীত তারকাদের সুর আছে অ্যাপসটির ভান্ডারে, সেগুলো দিয়ে ব্যবহারকারীরা তাদের মিউজিক ভিডিওটি বানাতে পারেন, প্রয়োজনে সুর বদলাতে পারেন। ১৫ সেকেন্ডের ভিডিওটি আপলোডের আগে ফেইসবুকের মতোই অন্যান্য টিকটক বা তার মতো সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মতো শেয়ার করে নিতে হয়। সেভাবে অন্যরাও জনপ্রিয় গানগুলোতে নিজের ভিডিও শেয়ার করতে পারেন। নিজেদের ভিডিও সম্পর্কে মতামতগুলো ব্যবহারকারীরা সেই অনুসারে ভিডিও করে আপলোডের সুবিধা আছে। যে ভিডিওগুলো তৈরি করে ব্যবহারকারীরা অন্যদের দেখাতে চান না, সেগুলো মেইলের মতো ড্রাফটে রেখে দিতে পারেন। কেবল নিজেরা দেখতে পারেন।

অ্যাপসটি ডাউনলোড করে নেওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। সব ব্যবহারকারীর আলাদা ব্যক্তিগত টিকটক অ্যাকাউন্ট আছে। ফেইসবুকের মতো সেটি ব্যবহার করতে থাকেন। নিজেদের পছন্দের মানুষদের যুক্ত করেন। পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগের উপায় মতামত, মেসেজ, রি-অ্যাক্ট, দ্বৈত ভিডিও আদান-প্রদান বা একসঙ্গে তৈরি। তারা ভিডিওগুলো অন্য মাধ্যমগুলোর মতো নির্বাচিত, সবার জন্য, বন্ধুদের শেয়ার করতে পারেন। স্পার্ম বা অভিযোগ থাকলে কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করতে পারেন। অভিভাবকদের জন্য টিকটকের সাপোর্ট সেন্টার আছে। যোগ্য বিষয় না থাকলে ছেলেমেয়েদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে বা বিষয়টি নিয়ে মা-বাবা অভিযোগ করতে পারেন। ‘ফর ইউ’ পেজে ব্যবহারকারীদের অ্যাপে তাদের ভিডিও কার্যক্রমগুলো দেখানোর সুযোগ আছে। টিকটকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ব্যবহারকারী যে ধরনের বিষয় পছন্দ করেন, সেগুলো তার জন্য রাখা হয়। তারা সেগুলোতে তাদের পছন্দ, ভালো লাগছে না, আলাদাভাবে নিজের কাজ সংযুক্ত করতে পারেন। অন্যদের পছন্দের ভিডিওগুলোও যাতে উপভোগ করতে পারেন, সে সুযোগ আছে।

টিকটকের নীতি অনুসারে, ১৬ বছরের কম বয়সের ছেলেমেয়েরা পেজটি ব্যবহারের সুযোগ পায় না। তারা সুরের পাতা, কোনো হ্যাশট্যাগও দেখতে পারে না। ফর ইউ পেজের মাধ্যমে অন্যরা ভিডিওগুলো দেখতে পারেন। ব্যবহারকারীরা সেভ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ভিডিও, হ্যাশট্যাগগুলো, ফিল্টারগুলো ও সাউন্ডগুলো সেভ বিভাগে সেভ করে রাখতে পারেন। ব্যবহারকারীদের মন্তব্যের ভিত্তিতে ভিডিও তৈরির অপশন আছে টিকটকে। ২০২০ সালে টিকটকের নতুন ফিচারগুলোর একটির নাম ‘ভার্চুয়াল আইটেম’। সামাজিক গণমাধ্যমের মাধ্যমে উপহার দেওয়ার নতুন অনুশীলন শুরু হয় এভাবে চীনে। এরপর থেকে অনেকগুলো বিউটি কোম্পানি ও ব্র্যান্ড টিকটকে তাদের বিজ্ঞাপন ও অংশগ্রহণ শুরু করেন। যুক্তরাষ্ট্রে কোয়ারেন্টাইনে এই সেবা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে যায়। সন্তানদের অনলাইনের জগতে সুরক্ষা দিতে মা-বাবাদের জন্য টিকটকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘ফ্যামিলি সেইফটি মুড’ চালু হয়। এখানে আছে স্ক্রিন টাইম ম্যানেজমেন্ট, গোপনীয়তা ও সরাসরি মেসেজ দেওয়ার সীমাবদ্ধতার সংযুক্তি। টিকটকে সিনেমার প্রিয় গানে নিজের কণ্ঠস্বর দেওয়ার সুযোগ আছে। এসব কারণে বিশে^র তরুণদের মধ্যে অবিবিশ্বাস্য জনপ্রিয় হয়েছে টিকটক। টিকটক ও তার সঙ্গী অ্যাপ তুইংয়ের ২০১৯ সালের জুলাইয়ে বিশে^ ৫০০ মিলিয়ন অ্যাকটিভ ব্যবহারকারী ছিলেন। এ বছরের জুলাইয়ে ২০০ বিলিয়নবার ডাউনলোড হয়েছে। প্রায় ৮০০ মিলিয়ন অ্যাকটিভ ব্যবহারকারী ছিলেন।

অভিযোগ

ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার স্পর্শকাতর তথ্য ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে নেওয়ার মাধ্যমে চীনা সরকারের বিপক্ষে গোয়েন্দাবৃত্তির অভিযোগ করেছে। তারা বলেছেন, চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির কাছে প্রধান উদ্যোক্তাদের জবাবদিহির জন্য আলাদা বিভাগ আছে। তাদের অনেক গোয়েন্দা আছেন, যাদের চাকরিই গোপনীয় তথ্য সংগ্রহ করা। ভারত ২০১৯ সালের এপ্রিলে একটি আদালতের রায়ের পর তার দেশে টিকটককে নিষিদ্ধ করে। তারা অভিযোগ করেছেন, এটির ব্যবহার দ্রুতগতিতে বেড়েছে। এখন আপিল চলছে। এরপর ২০২০ সালের এপ্রিলে টিকটকসহ কয়েকডজন চীনা মালিকানার অ্যাপস নিষিদ্ধ করার পর ভারত সরকার জানিয়েছে, তারা অ্যাপসগুলোর বিপক্ষে সহযোগিতা ও লুকিয়ে তথ্য আদান-প্রদানের অভিযোগ পেয়েছে। মার্কিন সরকার ২০১৯ সালের শেষের দিকে একটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি রিভিউ কমিটি চালু করে। সম্প্রতি তারা অভিযোগ করেছে, টিকটকসহ আরও কটি চীনা অ্যাপস সরাসরি চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে তথ্য দিচ্ছে। ব্রিটেনের ইনফরমেশন কমিশনারের অফিস ও অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্প্রতি এই অ্যাপগুলোর বিষয়ে অনুসন্ধান করেছে, কিন্তু তারা যা খুঁজছে সেটি বের করতে পারেনি। তবে টিকটক যে অবিশ^াস্য দ্রুত বেগে এগোচ্ছে, সেটি নিঃসন্দেহ। ২০১৮ সালের জুলাইয়ের হিসাবে এই অ্যাপে দিনে গড়ে ৫২ মিনিট থাকেন ব্যবহারকারীরা। এটিই অ্যাপলের অ্যাপ স্টোরের সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড করা অ্যাপস। ২০১৮ সালের অর্ধেকে অ্যাপসটি ডাউনলোড করেছেন ১০৪ বিলিয়ন মানুষ। মাত্র এক বছরের মধ্যে চীনে ছোট ভিডিও বানানোর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৯৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন। 

ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান

২০২০ সালের ৭ জুলাই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার সরকার টিকটককে নিষিদ্ধের বিবেচনা করেছেন। রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এরপর বলেছেন, এটি তার দেশে খুব সমস্যা তৈরি করছে। তবে কয়েকজন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ চীনের সরকারের জন্য টিকটকের তথ্য সংগ্রহের কোনো নির্দিষ্ট নজির পাননি। অনেকে এও বলেছেন, এমন আরেকটি মার্কিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকের চেয়ে এটি কম তথ্য সংগ্রহ করে। ৩১ জুলাই ট্রাম্প বলেন, চীনা কোম্পানি বাইটড্যান্স এর মালিকানা না ছাড়লে নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম বন্ধ করে দেবেন। মাইক্রোসফট একে কিনে নেওয়ার জন্য আলোচনা করেছে বলে খবর এসেছে। পরে ক্রেতার তালিকায় আসে ওরাকলের নামও।

টিকটকের কারণে ২০২০ সালে ভোট দিতে পারবেন এমন নতুন ভোটারদের ট্রাম্পের বিপক্ষে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তারাই এর প্রধান ভোক্তা। বিক্রির দিকে কম আগ্রহ থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়ায় নিষিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কায় চীনা কোম্পানি বাইটড্যান্স সেদিকে এগিয়ে যায়। এরপর মাইক্রোসফট একটি খসড়া চুক্তির পরিকল্পনা ট্রাম্পের কাছে পুনর্বিবেচনার জন্য জমা দেয়। টিকটকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানেজার ভেনেসা পাপাস এরপর বলেছেন, তাদের অন্য কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা নেই। তারা সবচেয়ে নিরাপদভাবে অ্যাপসটি তৈরি করছেন। মাইক্রোসফট আবার আলোচনায় বসে। তারা তাদের প্রধান নির্বাহী ভারতীয় আমেরিকান সত্য নাদেলা ও প্রেসিডেন্টের আলোচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান। হোয়াইট হাউজের উপদেষ্টারা প্রেসিডেন্টকে আইন ও রাজনীতির পাল্টাপাল্টির লড়াইয়ের ভয়ে টিকটক নিষিদ্ধ করা থেকে সরে আসতে আহবান জানিয়েছেন। তারপর তিনি মাইক্রোসফট বা অন্য কোনো মার্কিন কোম্পানির কাছে এটি বিক্রির জন্য পাঁচ থেকে ছয় দিনের সময় দেন। ৬ আগস্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৪৫ দিনের মধ্যে বাইটড্যান্স স্বত্ব বিক্রি না করলে টিকটক নিষিদ্ধের নির্বাহী আদেশ দিয়েছেন।