পঞ্চগড়ে দুটি প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত মাদ্রাসার নাম ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে একই নামে নতুন দুটি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা গড়ে তুলে তা জাতীয়করণের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি থেকে দাখিলে উন্নীত হওয়ার পর পুরনো দুটি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার নামে একটি চক্র হুবহু নামকরণ ও বিভিন্ন কাগজপত্র জালিয়াতি করে নতুন ওই দুটি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা স্থাপন করে। নতুন কোনো ইবতেদায়ি মাদ্রাসা জাতীয়করণের তালিকায় স্থান পাবে না তাই পুরনো মাদ্রাসার নাম ব্যবহার করার কৌশল নিয়েছে প্রতারক চক্রটি। তবে বিতর্ক এড়ানোর জন্য জালিয়াতি করে গড়ে ওঠা মাদ্রাসা দুটির কোনোটিতে সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়নি।
আগের ইবতেদায়ি মাদ্রাসা থেকে পরবর্তী সময়ে দাখিল পর্যায়ে উন্নীত হওয়া মাদ্রাসা দুটি হলো সদর উপজেলার সাতমেড়া ইউনিয়নের ‘ডুবানুচী বরকতিয়া দাখিল মাদ্রাসা’ ও ‘শুরিভিটা দাখিল মাদ্রাসা’। স্থানীয় একটি চক্র ওই দুটি মাদ্রাসার নামসহ বিভিন্ন কাগজপত্র জালিয়াতি করে জাতীয়করণের তালিকায় অন্তর্ভুক্তের চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে। জাতীয়করণের জন্য জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে স্বতন্ত্র মাদ্রাসার যে তালিকা পাঠানো হয়েছে তাতে জালিয়াতি করে স্থাপন করা দুটি মাদ্রাসার নামও রয়েছে। এমনকি সেই তালিকার শুরুতেই রয়েছে জালিয়াতি করে স্থাপন করা ওই দুটি মাদ্রাসার নাম। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাসহ স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে কাগজপত্র জালিয়াতি করে মাদ্রাসা দুটির নাম জাতীয়করণের তালিকায় ওঠানো সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছে এলাকাবাসী। এদিকে নতুন স্থাপন করা মাদ্রাসা দুটিতে এরই মধ্যে নিয়োগ বাণিজ্যের নামে জালিয়াত চক্রটি প্রায় ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পঞ্চগড় সদর উপজেলার সাতমেরা ইউনিয়নের ডুবানুচী গ্রামে ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ডুবানুচী বরকতিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা। ডুবানুচী গ্রামের নামের সঙ্গে পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বোরকা নদীর নাম মিলিয়ে নামকরণ করা হয় মাদ্রাসাটির। মাদ্রাসাটি ১৯৯৪ সালে দাখিল পর্যন্ত অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি পায়। এরপর থেকে ওই মাদ্রাসার নামকরণ হয় ডুবানুচী বরকতিয়া দাখিল মাদ্রাসা। কিন্তু হঠাৎ ২০১৮ সালে ওই মাদ্রাসার ২০ কিলোমিটার দূরে একই উপজেলার কামাতকাজল দিঘী ইউনিয়নের খারুয়াগ্রামে হুবহু ‘ডুবানুচী বরকতিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা’ নাম দিয়ে একটি স্বতন্ত্র মাদ্রাসা গড়ে ওঠে।
অন্যদিকে পঞ্চগড় সদর ইউনিয়নের শুরিভিটা গ্রামে ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘শুরিভিটা হাসনায়নীয়া নজিরিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা’। গ্রামের নামের সঙ্গে স্থানীয় হাসনাইন পীরের নাম ও জমিদাতা নজিরউদ্দিনের নামানুসারে মাদ্রাসাটির নামকরণ করা হয়। মাদ্রাসাটি ২০০১ সালে দাখিল অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি পায়। মাদ্রাসাটি দাখিল পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার পর এর নামকরণ করা হয় শুরিভিটা দাখিল মাদ্রাসা। কিন্তু গত বছর ওই মাদ্রাসা থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে একই উপজেলার কামাতকাজল দিঘী ইউনিয়নের বন্দেরপাড়া গ্রামে হুবহু ‘শুরিভিটা হাসনায়নীয়া নজিরিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা’ নাম দিয়ে আরেকটি স্বতন্ত্র মাদ্রাসা স্থাপন করা হয়। স্থানীয়রা বিষয়টি নিয়ে বেশ বিস্মিত। হঠাৎ করে আলাউদ্দিনের চেরাগের মতো গড়ে ওঠা দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তারা বিন্দুমাত্র অবগত নন। মাদ্রাসা দুটির নামও জানেন না তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হঠাৎ গড়ে ওঠা মাদ্রাসা দুটির নামের সঙ্গে যুক্ত কোনো স্থান বা ব্যক্তি নেই ওই এলাকায়। এমনকি মাদ্রাসার নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরাও জানেন না কোথা থেকে দেওয়া হলো এই নাম। আর মাদ্রাসা দুটির পক্ষে যেসব কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে তার অধিকাংশই জাল। জমি রেজিস্ট্রির দলিলটিও জাল। ২০১৮ ও ’১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও মাদ্রাসা দুটির প্রতিষ্ঠাকাল দেখানো হয়েছে ১৯৬৫ সাল। পুরনো তারিখের পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ দেখানোর মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে শিক্ষক নিয়োগ। প্রতিটি শিক্ষকের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা। এছাড়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে মাদ্রাসা দুটির কর্র্তৃপক্ষ বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোতে (ব্যানবেইস) ভুয়া তথ্য সরবরাহ করেছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদনে একটি মাদ্রাসায় ছয়টি আধাপাকা কক্ষ সংবলিত ভবনের কথা উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে সেখানে একটি তিন কক্ষের টিনশেড ও টিনের বেড়ার ঘর ছাড়া কিছু দেখা যায়নি। শিক্ষার্থীদের যে তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে সেটিও শুধু কাগজে-কলমে। কোনো কাগজপত্র যাচাই না করেই উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম প্রামাণিক ও সাবেক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিমাংশু কুমার রায় সিংহ ব্যানবেইসে তথ্য পাঠানোর কাগজে স্বাক্ষর করেছেন। আর এ ভুয়া কাগজপত্রের ওপর ভর করেই এগিয়ে যাচ্ছে প্রতারক চক্র।
কামাতকাজল দিঘী ইউনিয়নে ‘শুরিভিটা হাসনায়নীয়া নজিরিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা’ নামে নতুন মাদ্রাসা গড়ে তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মোজাহার আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এক-দুই বছর আগে মাদ্রাসার ঘর তোলা হয়। এর আগে কখনো এখানে মাদ্রাসার অস্তিত্ব ছিল না। মাদ্রাসার যে নাম ব্যবহার করা হয়েছে সেই নামে আমাদের এলাকায় কোনো জায়গা বা ব্যক্তির নাম নেই। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা দরকার। ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যে তথ্য দেওয়া হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।’
জালিয়াতির মাধ্যমে মাদ্রাসা গড়ে তোলার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে নতুন প্রতিষ্ঠিত ডুবানুচী বরকতিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাদ্রাসাটি অনেক আগে প্রতিষ্ঠিত। গত বছর থেকে ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে আমাদের শিক্ষার্থীরা।’ তবে ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা কেন ২০১৯ সালে প্রথম ইবতেদায়িতে অংশ নিল এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।
মাদ্রাসার নামকরণের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘মাদ্রাসার আশপাশের ওইটুকু জায়গা আমরা ডুবানুচী বলি।’ তবে বরকতিয়ার শব্দটির বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি।
মাদ্রাসাটির ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ফজল হক জানান, ২০১৮ সালে মাদ্রাসা করার জন্য জমি দেন তিনি। মাদ্রাসার নাম জানা নেই। তার এক ছেলেকে সহকারী শিক্ষক হিসেবে মাদ্রাসায় চাকরি দেওয়া হয়েছে। আরেক ছেলে অন্য মাদ্রাসাটির প্রধান শিক্ষক। জয়নুল নামের এক ব্যক্তি মাদ্রাসা দুটি স্থাপনের সহযোগিতা করছেন। দুটি মাদ্রাসারই কাগজপত্র তৈরি থেকে শুরু করে সব অফিসে যোগাযোগসহ দৌড়ঝাঁপ সবকিছু করছেন ওই ব্যক্তি।
শুরিভিটা হাসনায়নীয়া নজিরিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুরি নামে এক লোক ছিল, তার নামেই এই মাদ্রাসা হয়েছে।’ তবে হাসনায়নীয়া ও নজিরিয়ার শব্দ দুটির বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারেননি। এছাড়া একই নামে একাধিক মাদ্রাসা থাকতে পারে বলেও দাবি করেন মিজানুর রহমান।
ডুবানুচী বরকতিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার আজিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের মাদ্রাসার নাম নকল করে অন্য এলাকায় স্বতন্ত্র মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন খবর শুনে আমরা সত্যিই বিস্মিত। প্রতিষ্ঠিত একটি মাদ্রাসার নাম জালিয়াতি করে কীভাবে তারা মাদ্রাসা স্থাপন করতে পারে তা আমাদের মাথায় আসে না। আমরা সংশ্লিষ্টদের প্রতি দাবি জানাই, যেন বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
অন্যদিকে শুরিভিটা দাখিল মাদ্রাসার সুপার মো. সাইফুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের মাদ্রাসার নাম জালিয়াতি করে কামাতকাজল দিঘী ইউনিয়নের একটি গ্রামে স্বতন্ত্র মাদ্রাসা করা হয়েছে বলে জেনেছি। কিন্তু তারা এত বড় জালিয়াতি করল, কেউ বিষয়টি টের পেল না, এটিই বড় আশ্চর্যের বিষয়।’
জালিয়াতির মাধ্যমে গড়ে ওঠা মাদ্রাসা জাতীয়করণে সহায়তার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম প্রামাণিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ওই মাদ্রাসাগুলোর কাগজপত্র চেয়েছিলাম। একটি প্রতিষ্ঠান দিয়েছে, আরেকটি এখনো দেয়নি। কাগজপত্র পেলেই তা যাচাই করে দেখা হবে। তদন্তের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা যেন পরীক্ষা দিতে পারে তাই আমি প্রত্যয়ন দিয়েছি।’ তবে তদন্ত প্রতিবেদন ও ব্যানবেইসে ভুল তথ্য পাঠানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
অন্যদিকে পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবদুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে স্বতন্ত্র মাদ্রাসার যে তালিকা পাঠানো হয়েছে তা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে পাঠানো হয়েছে। জালিয়াতি করার বিষয়টি আমাদের জানা নেই। তবে এমনটি করে থাকলে নিশ্চয়ই সেই তথ্য আমরা কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে প্রেরণ করতে পারব।’