বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ কার্যক্রম এখনো হতাশাজনক অবস্থায় রয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম মাসে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২ শতাংশে। চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার অনেক নিচে অবস্থান করছে।
২০১৯-২০ অর্থবছরে বেসরকারি খাতের ঋণ লক্ষ্যমাত্রার অনেক পেছনে থাকলে করোনা পরিস্থিতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরাতে ২০২০-২১ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ ঋণপ্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও করোনা পরিস্থিতিতে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দায় ব্যবসায়ীরা ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে পারবেন কি-না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
অবশ্য করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলেও সরকার ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ৮ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। এমন অবস্থায় ভি-আকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য জুলাই মাসে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম ছিল। যদিও বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ ত্বরান্বিত করতে এবং মহামারী থেকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য সরকার বেশ কয়েকটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। তবে রপ্তানিমুখী শিল্পে শ্রমিকদের বেতন-ভাতার জন্য ঋণ বিতরণ ছাড়া বেসরকারি খাতের অন্যান্য ঋণ বিতরণ অনেক কম।
সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় প্রধান দুটি খাতে ৫০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের জন্য ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু সিংহভাগ ঋণ বিতরণ না হওয়ায় পরবর্তীতে দুই মাস সময় বাড়িয়ে অক্টোবর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। অবশ্য জুনের তুলনায় জুলাই মাসে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধিতে সামান্য উন্নতি দেখা গেছে। গত জুনে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিদ্যমান নীতিমালা শিথিল করার পরও ঋণপ্রবাহে কাক্সিক্ষত গতি আসছে না। দেড় যুগ পর নীতিনির্ধারণী সুদহার কমানো হয়েছে। ব্যাংকগুলো কম খরচে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যাতে তহবিল সংগ্রহ করতে পারে সেজন্য কমানো হয়েছে রেপোর সুদহার। এর আগে বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়াতে ব্যাংকঋণের সীমা বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু কোনো উদ্যোগই ঋণপ্রবাহ বাড়াতে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগমুখী করা যাচ্ছে না। সুফল মিলছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা শিথিলের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের পর থেকেই বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমতে দেখা গেছে। ওই অর্থবছরে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল ১৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। বেশ কিছু ব্যাংকের আগ্রাসী বিনিয়োগের কারণে ওই সময় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের শুরুতে বেসরকারি ঋণপ্রবাহের লাগাম টানতে ব্যাংকের ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) কিছুটা কমিয়ে আনে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর থেকে ঋণপ্রবৃদ্ধি কমতে থাকে। যদিও এরই মধ্যে কয়েক দফা এডিআর সমন্বয়ের সীমা বাড়ানো হলেও ঋণপ্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত আছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমে যায় ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা আরও কমে হয় ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আরও কমে যাচ্ছে বলে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন।
বেসরকারি খাতের বিনিয়োগপ্রবাহ বাড়াতে দীর্ঘ দেড় যুগ পর নীতিনির্ধারণী সুদ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ পুননির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে অন্যান্য নীতিনির্ধারণী সুদহার তথা রেপো ও রিভার্স রেপোর সুদহারও কমানো হয়েছে। করোনাকালীন সংকট মেটাতে সস্তায় উদ্যোক্তাদের মাঝে ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করতেই নীতিনির্ধারণী এসব সুদহারে কমিয়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ছাড়া গত ১ এপ্রিল থেকে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ধরনের ব্যাংকঋণের সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এ সুদহার কার্যকর করতে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগসীমা বাড়ানোর মাধ্যমে ২৬ হাজার কোটি টাকা বাড়তি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়। এ সময় সিআরআর হার দেড় শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়। এতে ব্যাংকগুলোর হাতে বাড়তি প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা চলে যায়। এসব উদ্যোগ নেওয়ার পরও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়েনি। করোনা পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে সতর্কতা অবলম্বন করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১০-১১ অর্থবছরে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি হয়েছিল সর্বোচ্চ ২৫ দশমিক ৮০ শতাংশ। ২০১১-১২ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি কমে হয় ১৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এর পরের ২০১২-১৩ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনকভাবে কমে দাঁড়ায় মাত্র ১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এরপর টানা তিন অর্থবছর প্রবৃদ্ধি বাড়ছিল।