পৃথিবীতে যেসব জাতি উন্নততর রাষ্ট্র গঠনে সফল হয়েছে তাদের সবারই সাফল্যের অন্যতম সোপান মাতৃভাষায় উন্নতি। মাতৃভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ছাড়া যেমন সমাজ-সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না, তেমনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠা ছাড়া উন্নততর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না। পরিতাপের বিষয় হলো, বায়ান্নে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অকাতরে রক্ত দেওয়া বাঙালি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে লাখো প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সফল হলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আজও বাংলা ভাষার চর্চা অনেকটাই পিছিয়ে। মাতৃভাষা চর্চায় এই পশ্চাৎপদতা উচ্চশিক্ষা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় আইনকানুন সব ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান। রাষ্ট্রব্যবস্থায় মাতৃভাষা বাংলার প্রতি এই বিমুখতা নিয়ে আজকাল কথা অনেক হলেও কাজের কাজ কমই হচ্ছে। স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক পেরিয়েও দেড়শ বছরেরও বেশি পুরনো ঔপনিবেশিক পুলিশ আইন দিয়েই এখনো পুলিশ প্রশাসন পরিচালনা মাতৃভাষা বাংলার প্রতি বিমুখতার অন্যতম দৃষ্টান্ত বলা যেতে পারে। আশার কথা হলো সম্প্রতি ব্রিটিশ শাসকদের তৈরি করা পুলিশ আইনটি বাংলা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই উদ্যোগের ধীরগতি যেমন সন্তোষজনক নয়, তেমনি উদ্যোগটি কি কেবলই ভাষাগত রূপান্তরের নাকি আইনটির যুগোপযোগী সংশোধনের তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে ‘বাংলায় হচ্ছে পুলিশের ব্রিটিশ আইন’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আগেই আইনটিকে বাংলায় রূপ দেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্রিটিশদের তৈরি ‘পুলিশ অ্যাক্ট-১৮৬১’ এবং ‘পুলিশ অধ্যাদেশগুলো’ বাংলায় রূপান্তর করতে বছর তিনেক আগে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়। আদেশ পেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশ সদর দপ্তরকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে এ বিষয়ে গঠিত কমিটি ৮টি আইন ও অধ্যাদেশ বাংলা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এসব আইন ও অধ্যাদেশ ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বাংলা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে খসড়া হিসেবে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ১৮৬১ সালের পুলিশ অ্যাক্ট এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ সৃষ্টির অধ্যাদেশ রয়েছে। কিন্তু এরপর কয়েকটি বৈঠক ছাড়া এই কর্মকাণ্ডের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এদিকে করোনা পরিস্থিতিতে গত চার মাস ধরে কমিটির কোনো বৈঠক হয়নি। তবে কমিটির বক্তব্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে তারা কেবলই আইনগুলোর বিভিন্ন ধারা-উপধারা-প্রবিধি ইত্যাদি বাংলায় রূপান্তরের কাজই করছেন, আইনগত সংস্কারের কোনো বিষয় তাদের লক্ষ্যই নয়। যা খুবই পরিতাপের বিষয়।
বাংলা তথা সমগ্র ভারতের ক্ষমতা দখলের পর ব্রিটিশ শাসকরা উপমহাদেশে প্রথম পুলিশ আইনটি তৈরি করেছিল। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার উপনিবেশিত ভারত থেকে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় এবং ব্রিটিশদের বাণিজ্যিক স্বার্থ সংরক্ষণের হাতিয়ার হিসেবে পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠন করে। সে সময়েই ‘পুলিশ অ্যাক্ট-১৮৬১’ প্রণয়ন করা হয়। এরপর ১৮৮৪ সালে ‘বেঙ্গল পুলিশ ম্যানুয়াল’ নামে পুলিশের প্রথম প্রবিধিমালা প্রকাশ করে। ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৫ ও ১৯৪৩ সালে আরও দুই দফায় পুলিশ আইনটি সংশোধন করে। কিন্তু এর পর থেকে পুলিশ আইনটি আর সংশোধন হয়নি। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও ওই আইন দিয়েই পুরো পাকিস্তান আমল চলেছে এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশের বিগত প্রায় পাঁচ দশকও ওই আইন দিয়েই চলছে। এমতাবস্থায় পুলিশ আইনটি কেবল বাংলা ভাষায় অনুবাদ করা কোনোভাবেই অর্থবহ হবে না। আইনের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পুলিশের ব্রিটিশ আমলের আইনের কয়েকটি ধারা শুধু বাংলা করলে হবে না। পুরো আইনটিই সংশোধন করে যুগোপযোগী করতে হবে।
একটা বিষয় এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, পুলিশ আইনই হোক কিংবা অন্য যেকোনো আইন, তা রাষ্ট্রভাষা বাংলায় হওয়া যেমন জরুরি তেমনি তা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পরিচালনা এবং স্বাধীন দেশের নাগরিকদের অধিকার রক্ষা ও কল্যাণের জন্য যুগোপযোগী হওয়াটাও জরুরি। এই দুইয়ের কোনো একটিকে বাদ দিয়েই সামনে এগোনোর পথ নেই। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’, তাই এই আইন বাংলায় হতে হবে। তেমনি স্বাধীন দেশে উপনিবেশের আইন চালু রাখলে স্বাধীনতা কি আর অর্থবহ থাকে? অথচ যেমন পুলিশ প্রশাসন চলছে ইংরেজি ভাষায় রচিত ঔপনিবেশিক আইনে তেমনি দেশের উচ্চ আদালতেও এখনো রাষ্ট্রভাষা বাংলা অবহেলিতই রয়ে গেছে। এই লজ্জাকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে অবিলম্বে যুগোপযোগী সংস্কার করে রাষ্ট্রভাষা বাংলায় পুলিশ আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করা জরুরি। এজন্য অবশ্যই সরকার তথা দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের বাইরে একটি দায়িত্বশীল ও সেবামূলক পুলিশ বাহিনী পরিচালনার অঙ্গীকার করতে হবে।