অভিষেক টেস্টেই হেরেছিল বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর থেকে শুরু হয়েছিল সে ম্যাচ। ঠিক এক বছর পর বাংলাদেশ প্রথম ড্র করেছিল। প্রতিপক্ষ ছিল জিম্বাবুয়ে। অভিষেকের পাঁচ বছর পর একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়ও পেয়েছিল তারা। এবার বলুন তো প্রথম ইনিংসে লিড পায় কবে বাংলাদেশ? ২০০৩ সালের ২৯ আগস্ট পেশোয়ার টেস্টে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ৬৬ রানের লিড নিয়েছিল খালেদ মাহমুদ সুজনের দল।
সেটি বাংলাদেশের ২৩তম টেস্ট। শুরু হয়েছিল ২৭ আগস্ট। টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া বাংলাদেশ জাভেদ ওমরের সেঞ্চুরি (১১৯), হাবিবুল বাশারের ৯৬ আর মোহাম্মদ আশরাফুলের ৭৭-এ ৩৬১ রান করে। এই রান তারা করে শোয়েব আখতারের আগুন ঝরানো বোলিংয়ের বিপক্ষে। পিন্ডি এক্সপ্রেস ৫০ রানে ৬ উইকেট নিয়েছিলেন।
তবে বাংলাদেশ লিড পেয়েছিল দুই স্পিনারের কল্যাণে। মোহাম্মদ রফিক আর অলোক কাপালি। ১১৮ রানে ৫ উইকেট নেন বাঁ-হাতি স্পিনার রফিক। আর লেগ স্পিনে কাপালি করেন হ্যাটট্রিক। বাংলাদেশের হয়ে প্রথম হ্যাটট্রিক করেন তিনি। শেষ তিন বলেই উইকেট নিয়েছিলেন। ফলে পাকিস্তানের প্রথম ইনিংস ২৯৫ রানে গুটিয়ে যায়। ওপেনার মোহাম্মদ হাফিজ ছাড়া টপ অর্ডারের পাঁচ ব্যাটসম্যানকে আউট করেছিলেন রফিক। আর সাব্বির আহমেদ, দানিশ কানেরিয়া এবং উমর গুলকে পরপর তিন বলে আউট করে বাংলাদেশের পক্ষে টেস্টে প্রথম হ্যাটট্রিকটি করেন কাপালি।
কিন্তু প্রথম ইনিংসের লিডটাকে কাজে লাগতে পারেনি বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৯৬ রানেই গুটিয়ে যায় লাল-সবুজরা শোয়েব-উমর গুল-সাব্বিরদের পেস আক্রমণ সামলাতে না পেরে। ১৬৩ রানের টার্গেট ১ উইকেট হারিয়েই তুলে নেয় পাকিস্তান। ১০ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হন শোয়েব। এই ম্যাচে ২৫ ওভার বল করেও উইকেট পাননি মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। ফলে মুলতানের উইকেটে ঘাস থাকা সত্ত্বেও অধিনায়কের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তাকে বাদ দিয়েছিলেন কোচ ডেভ হোয়াটমোর।
সেই ম্যাচেও প্রথম ইনিংসে লিড নিয়েছিল বাংলাদেশ। ২৮১ রান করে পাকিস্তানকে আটকে দিয়েছিল ১৭৫ রানে। মাশরাফী-আলমগীর কবিরের জায়গায় দলে নেওয়া হয় মঞ্জুরুল ইসলাম আর তাপস বৈশ্যকে। কিন্তু দুর্দান্ত বল করেছিলেন রফিক আর অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজন স্বয়ং। প্রথম ইনিংসে ৯ উইকেট নেন দুজনে (রফিক ৫, সুজন ৪)। ১০৬ রানের লিড নেওয়া বাংলাদেশ ১৫৪ রান করে ২৬১ রানের টার্গেট দেয় পাকিস্তানকে। দুর্দান্ত লড়াই করেছিল বাংলাদেশ। জেতার খুব কাছেও পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু ইনজামাম-উল-হকের অপরাজিত ১৩৮ রানের অনবদ্য ইনিংস স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছিল। ১ উইকেটে জেতার পর মুলতানের সুলতানকে গোলাপ পাপড়ি ছিটিয়ে বরণ করেছিল পাকিস্তান। তবে সেই জয়ে কলঙ্কের দাগও ছিল। প্রতারণা করেছিলেন অধিনায়ক রশিদ লতিফ। তিনি জানতেন দ্বিতীয় ইনিংসে ২২ রানে ব্যাট করতে থাকা অলক কাপালির ক্যাচ ঠিকভাবে নেওয়া হয়নি। তবু ঠিক দাবি করে আম্পায়ারকে আউট দিতে বাধ্য করেছিলেন। সেই অপরাধে ম্যাচ রেফারি তাকে পাঁচ ম্যাচ নিষিদ্ধ করেছিল।
এত কাছে গিয়েও টেস্ট হেরে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়েন ৭ উইকেটশিকারি অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজন। পরে তিনি বলেন, ‘সবাই কাঁদছিল। হারটাও অবিশ্বাস্য লাগছিল। শেষ বল পর্যন্ত মনে হয়েছিল উইকেট নিতে পারব। আসলে ভাগ্য আমাদের সঙ্গে ছিল না।’
পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে জয় এখনো অধরা বাংলাদেশের। ১১ টেস্টের ১০টিতে হার। ড্র করা একমাত্র ম্যাচটিতে খুলনায় দারুণ ব্যাট করেছিল বাংলাদেশ। ২০১৫ সালের টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৩৩২-এর পর দ্বিতীয় ইনিংসে তামিম ইকবালের ডাবল সেঞ্চুরিতে ৬ উইকেটে ৫৫৫ করে বাংলাদেশ। মাঝে পাকিস্তান করে ৬২৮।
টেস্টের প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ লিড নেয় আবার টেস্টে প্রথম জয়ের ম্যাচে। চট্টগ্রামে ২০০৫ সালে ৪৮৮ রান করে জিম্বাবুয়েকে ৩১২ রানে অলআউট করেছিল বাংলাদেশ। ২০৪ রানে দ্বিতীয় ইনিংস ঘোষণা করে জিম্বাবুয়ের সামনে ৩৮১ রানের টার্গেট রাখে খালেদ মাসুদ পাইলটের দল। তাইবুর জিম্বাবুয়ে অলআউট হয় ১৫৪ রানে।
দেড় বছর পর টেস্টে আবার লিড নেয় বাংলাদেশ। ২০০৬ সালের সে ম্যাচে ফতুল্লায় ৪২৭ রান করে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস ২৬৯ রানে গুটিয়ে দেয় বাংলাদেশ। সেই ইনিংসে রফিক নেন ৫ উইকেট। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৪৮ রান করা বাংলাদেশ ৩০৭ রানের টার্গেট দেয় অস্ট্রেলিয়াকে। সে ম্যাচেও রিকি পন্টিংয়ের হার না মানা সেঞ্চুরিতে ৩ উইকেটে হারে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৬ টেস্টের একমাত্র জয় পায় বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে লিড নেওয়ার মাধ্যমেই। ২০১৭তে মিরপুরে ২৬০ রান করে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস ২১৯তে আটকে দেয় বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেরা ২২১ রান করার পর অস্ট্রেলিয়াকে ২৪৪-এ আটকে দিয়ে ২০ রানে ম্যাচ জেতে সাকিব আল হাসানের ১০ উইকেটের কল্যাণে (প্রতি ইনিংসে ৫ উইকেট)।
নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে খেলা ১৫ টেস্টের দুটিতে প্রথম ইনিংসে লিড নিয়েও জেতা হয়নি বাংলাদেশের। ২৪৫ রান করে কিউইদের ১৭১ রানে অলআউট করে ৭৩ রানের লিড পায় আশরাফুলের দল। দ্বিতীয় ইনিংসে ২৪২ রান করে ৩১৭ রানের টার্গেট দেয় বাংলাদেশ। কিন্তু অধিনায়ক ড্যানিয়েল ভেট্টোরি ৭৬ রানের ইনিংস খেলে ম্যাচটা বের করে নেন।