বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব অনেক হিসাবই পাল্টে দিয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে টাকার মান ধরে রাখতে বাজারে শত শত কোটি ডলার ছাড়তে হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। অথচ চলতি বছরের জুলাই থেকে উল্টো ভূমিকায় দেখা গেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। এবার টাকা নয় ডলারের পতন ঠেকাতে উদ্যোগ নিয়েছে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক এ সংস্থাটি। এ সময়ে আমদানি চাপ কমে যাওয়ায় এবং প্রবাসী আয় বাড়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে উদ্বৃত্ত ডলার কিনে উল্টো বিদেশি মুদ্রাটির বিনিময় মূল্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে প্রায় ১৬০ কোটি ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
করোনা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার ঋণ করে ৩ লাখ কোটি ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার পর থেকেই সারা বিশ্বে ডলারের মান নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়। ইতিমধ্যেই ইউরো, চীনা ইউয়ান, জাপানি ইয়েনসহ বিভিন্ন মুদ্রার বিপরীতে ডলারের পতন অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাশিয়া, চীন, ইরান, তুরস্ক তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার কমিয়ে অন্য মুদ্রায় রূপান্তর করছে। ইংল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ডলার বাদ দিয়ে নিজেদের মুদ্রা রিজার্ভে রাখার কথা বলছে। সারা বিশে^ মার্কিন ডলারের পতনের যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে সে সময়ে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় ধরে রাখতে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকার বিপরীতে ডলারের বিনিময় মূল্য স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে।
করোনায় গত মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশের ব্যবসা বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দেয়। মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্য আমদানি কমে যায়। এতে কমে গেছে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার। কিন্তু রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয়, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানসহ যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে তার বেশিরভাগই উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে। প্রায় সব ব্যাংকের হাতে এখন উদ্বৃত্ত ডলার থাকায় বাজারে চাহিদাও কমে গেছে। ডলার বিক্রি করতে না পারায় ব্যাংকগুলো প্রতিদিনই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আসছে। ডলারের মূল্য পতন ঠেকাতে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক অন্য ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ১৫৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা। এ সময়ে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ৩ হাজার ৮৪০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
এর আগে চলতি বছরের ১০ থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত শিডিউল ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ৩০ কোটি মার্কিন ডলার ক্রয় করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০১৭ সালের ৪ জুনের পর ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কিনলেও পুরো ২০১৯-২০ অর্থবছরের ২০ মে পর্যন্ত নিট ৮২ কোটি ২০ লাখ ডলার বিক্রি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ডলারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বিনিময় মূল্য ধরে রাখতে ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক ২৩৪ কোটি ডলার বিক্রি করেছিল। ডলারের স্থিতিশীল বিনিময় মূল্য প্রবাসী আয় ও রপ্তানিকারকদের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখছে। গত বৃহস্পতিবার আন্তঃব্যাংক বিনিময় হারে ডলারের সর্বনিম্ন বিনিময় মূল্য ছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা।
প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকগুলো ইচ্ছে করলেই বাড়তি ডলার নিজেদের কাছে ধরে রাখতে পারে না। প্রতিটি ব্যাংকেরই বৈদেশিক মুদ্রা রাখার জন্য সীমা দেওয়া আছে। এ সীমাকে এনওপি বা নেট ওপেন পজিশন বলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী একটি ব্যাংক মূলধনের ১৫ শতাংশের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা নিজেদের কাছে ধরে রাখতে পারে। নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ডলার থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে হয় বাংলাদেশ ব্যাংকে অথবা আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলার বিক্রি করতে হবে। কেউ নির্ধারিত সীমার বাইরে ডলার নিজেদের কাছে ধরে রাখলে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জরিমানা গুনতে হয়।
জানা গেছে, করোনার কারণে ভোগ ব্যয় কমে যাওয়ায় গত মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত আমদানি ব্যয় কমে গেছে। করোনায় বিদেশ ভ্রমণও বন্ধ রয়েছে। চিকিৎসা নিতেও সাধারণ মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন না। এবার সংক্ষিপ্ত হজের কারণে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়েছে। প্রবাসী আয়ে ২ শতাংশ নগদ সহায়তার কারণে রেমিট্যান্সে রেকর্ড হচ্ছে। জুলাই মাসে ২৬০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স দেশে এসেছে, যা একক মাস হিসেবে সর্বোচ্চ। চলতি আগস্ট মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৩৪ কোটি ডলার। আগস্টে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ও স্বাভাবিক ধারায় ফিরে এসেছে। করোনার কারণে বিদেশি ঋণ ও অনুদান বেড়েছে। এসব কারণেই দেশে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বেড়েছে। বিপরীতে ব্যয় কমায় ব্যাংকগুলোর কাছে উদ্বৃত্ত বিদেশি মুদ্রা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত বাজার থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৯৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার না কিনলে বাজারে প্রতি ডলার ৮০ টাকার নিচে নেমে যেতে পারত। এতে রপ্তানিকারক ও প্রবাসীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। এ কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনছে। অবশ্য এমন পরিস্থিতি বেশিদিন থাকবে না বলে ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে। আমদানি-রপ্তানি স্বাভাবিক হয়ে এলেই উল্টো বাজারে ডলার ছাড়তে হতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে, যেটা গত তিন বছর ধরে হয়ে আসছে।