নব্বই দশকের শুরু থেকেই টেলিভিশনের ছোট পর্দা মাতিয়ে আসছেন জাহিদ হাসান। মফস্বল থেকে ঢাকায় এসে জয় করে নেন দর্শকের হৃদয়। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। টানা কাজ করে গেছেন। করোনা মহামারীর মধ্যেও তার কাজ অব্যাহত ছিল। কিন্তু গত কোরবানির ঈদের নাটকে কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন জনপ্রিয় এই অভিনেতা। ১১ জুলাই থেকে জ্বর ও ঠান্ডাজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। তবে এখন পুরোপুরি সুস্থ আছেন। তাই বলে শ্যুটিং শুরু করছেন না এখনই। স্বাস্থ্যবিধি মেনে শ্যুটিং করার মতো উপযোগী পরিবেশ নেই এমনটি জানিয়ে এখন সব ধরনের শ্যুটিং থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন তিনি। জাহিদ হাসান বলেন, ‘আমি এখন কোনো কাজ করছি না। কাজের বাইরে খুব একটা কথা বলতেও পছন্দ করি না। শুধু এটুকু বলতে পারি, আমি আরও একমাস কোনো শ্যুটিং করব না। কাজে ফিরলে আবারও সবার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করব। এখন নিজেকে সময় দিচ্ছি।’
জাহিদ হাসানকে যারা কাছ থেকে চেনেন তারা জানেন তিনি কতটা কাজপাগল। কাজ ছাড়া থাকতে পারেন না। সেই তিনি দীর্ঘ তিন মাস ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেন না। এটা তার জন্য অনেক বড় বিরতি বলা যায়।
তবে শারীরিক অসুস্থতার জন্য যে তিনি কাজ থেকে দূরে আছেন তা কিন্তু নয়। জাহিদ হাসান বলেন, ‘করোনার উপসর্গ থাকায় কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিলাম ঠিকই। তবে করোনা পরীক্ষায় ফল নেগেটিভ আসে। তারপরও চিকিৎসকের পরামর্শে বাসাতেই ছিলাম। ঈদের পর সবাই কাজে ফিরেছে। কিন্তু আমি নিজেকে আরও একটু সময় দিতে চাই। কারণ শ্যুটিংয়ের পরিবেশ নিয়ে আমি কিছুটা চিন্তিত। সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেই কাজে ফিরব।’ তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘ সময়ে ঘরে থেকে থেকে যাতে বোরিং না লাগে তাই লেখালেখির কাজ করছি। বেশ কিছু নাটকের গল্প মাথায় এসেছে। সেগুলো লিখব।’
কিছুদিন আগে জাহিদ হাসানের শাশুড়ি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। এ নিয়ে তার স্ত্রী দেশসেরা মডেল ও নৃত্যশিল্পী সাদিয়া ইসলাম মৌ এখনো মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এ সময় পরিবারকে সময় দেওয়াটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন জাহিদ হাসান।
অসুস্থতার কারণে গত ঈদে খুব বেশি কাজ করতে পারেননি জাহিদ হাসান। অল্প দু-একটা কাজের মধ্যে হিমু আকরামের পরিচালনায় ‘গফুর কাকার তরমুজ’ নাটকটি বেশ ভালো সাড়া ফেলেছে। এ নাটকের শ্যুটিং চলাকালীনই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। ঈদে অন্যদের কাজও খুব একটা দেখা হয়নি তার।
নাটকের নায়কদের মধ্যে তিনি বরাবরই উজ্জ্বল। সিনেমা করে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তার অভিনেতা হওয়ার গল্পটা শোনা যাক তার মুখেই, “মনে পড়ে, ছেলেবেলায় সিরাজগঞ্জে থাকতে শীতের সময় যাত্রাপালা দেখতাম। সিরাজগঞ্জ শহরে মঞ্চনাটকের দল ছিল। সেখানে নাটক দেখার কথাও মনে পড়ে। ওখানে টিকিট কেটে মঞ্চনাটক দেখার প্রচলন ছিল। একবার শুনলাম, সিরাজগঞ্জ শহরে ‘নবাব সিরাজদ্দৌলা’ যাত্রাপালা হবে। ঢাকা থেকে দল আসবে। আনোয়ার হোসেন নবাবের চরিত্রে অভিনয় করবেন। ওই যাত্রাপালা দেখার জন্য সে কী আগ্রহ আমার! আব্বাকে বললাম, যাত্রা দেখব। বিশ টাকা দিয়ে আব্বা বলেছিলেন, ‘যাও’। আনোয়ার হোসেনকে দেখে এসো। স্টেজের খুব কাছে মাটিতে বসে সেই রাতে ‘নবাব সিরাজদ্দৌলা’ যাত্রাপালা দেখেছিলাম। ওই প্রথম অভিনয়ের প্রেমে পড়ি। স্কুল পাস করে সিরাজগঞ্জ শহরেই কলেজে ভর্তি হই। কলেজে পড়ার সময়ে তরুণ সম্প্রদায় নাট্যদলে যোগ দিই। সেই দলের হয়ে কয়েকটি নাটকে অভিনয় করি। ইন্টারমিডিয়েট পাস করে আসি ঢাকায়। কারণ, অভিনেতা হতে হবে। ১৯৮৬ সালে ‘বলবান’ নামের একটি সিনেমায় অভিনয় করার সুযোগ পাই। ১৯৮৯ সালে বড় একটি সুযোগ আসে আমার জীবনে। বিটিভিতে তালিকাভুক্ত হই। তবে এখনকার মতো ওই সময়ে টিভি নাটকে অভিনয় করাটা অত সহজ ছিল না। ১৯৯০ সাল আমার জীবনে টার্নিংয়ের বছর। সে বছর মঞ্চনাটক শুরু করি। যোগ দিই নাট্যকেন্দ্রে। একই বছর প্রথমবার টিভি নাটকে অভিনয়ের সুযোগ পাই। প্রথম টিভি নাটকটি ‘জীবন যেমন’। ভাগ্য প্রসন্ন ছিল বলে প্রথম টিভি নাটকেই গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র পেয়েছিলাম। সম্মানী পেয়েছিলাম ১,২০০ টাকা। এরপর ‘সমাপ্তি’, ‘সখী ভালোবাসা কারে কয়’, ‘কাশবনের কন্যা’, ‘ছবি শুধু ছবি নয়’ নাটকগুলোতে অভিনয় করি। আরও পরে এসে অভিনয় করি হুমায়ূন আহমেদের ‘নক্ষত্রের রাত’, ‘আজ রবিবার’, ‘সবুজ ছায়া’, ‘সবুজ ছাতা’ ধারাবাহিকগুলোতে। এভাবেই বদলে যায় আমার অভিনয় জীবনের গল্প।”