টেকসই ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি উপকূলবাসীর

পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর অব্যাহত ভাঙন, ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও সম্প্রতি অধিক উচ্চতার জোয়ারের তোড়ে জেলার প্রায় ৩০ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এসব ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে প্লাবিত হয় ভাঙন কবলিত এলাকা।

ভাঙন কবলিত এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুম এলেই বাঁধ নির্মাণ শুরু হয়। এতে বাঁধ টেকসই হয় না, শুকনো মৌসুমে বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তারা। সেই সঙ্গে টেকসই ও স্থায়ী বেড়িবাঁধের দাবি উপকূলবাসীর।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে জেলার বিভিন্ন এলাকার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে বরগুনা সদর উপজেলায় ৪১/২ থেকে ৪১/৬বি পোল্ডারে পূর্ব আমতলী, ফুলঢলুয়া, কাকড়াবুনিয়া, সাজিমারা, নলী, কাঠালতলী, ছোটবালিয়াতলী, আঙ্গারপাড়া, ডৌয়াতলা, গলাচিপা, গুলিশাখালী, পূর্ব পাতাকাটা, ফুলঝুড়িতে ৬ কিলো ১০০ মিটার।

পাথরঘাটা উপজেলায় ৩৯/১ থেকে ৪০/১ পোল্ডারের পরীঘাটা ছোনবুনিয়া, কালমেঘা, ঘুটাবাছা, দক্ষিণ কূপধন, কাকচিড়া, চরলাঠিমারা, রুহিতা, জিনতলা, পদ্মা, হাজিরখাল এলাকায় ৫ কিলো ৪৬০ মিটার। বামনা উপজেলায়৩৯/১ডি পোল্ডার থেকে ৩২/এ, কড়ইতলা, রামনা, অযোদ্ধা, পূর্ব সফিপুর, কালিকাবাড়ি, চেচাং, বুকাবুনিয়া, বড় তালেশ্বর, পূর্ব বলইবুনিয়া, পশ্চিম বলইবুনিয়া এলাকায় ৩ কিলো ৯৮৬ মিটার।

বেতাগী তে ৪১/৭ এ পোল্ডার এবং ৪১/৭বি পোল্ডারে বকুলতলী, কুমড়াখালী, পশ্চিম কাউনিয়া, ছোট বদরখালী ৩৭০ মিটার। আমতলী উপজেলায় ৪১/১ থেকে ৫৪/বি পোল্ডারে ঘটখালী, কুকুয়া, পূর্বচিলা, শাখারিয়া, আঠারোগাছিয়া, সোনাখালী বুধবারেরহাট ১ কিলো ৩৩০ মিটার।

তালতলী উপজেলায় ৪৪/বি এবং ৪৫ পোল্ডার থেকে নিউপাড়া, জয়ালভাঙ্গায় ১ কিলো ৮০০ মিটার বাঁধ তিন নদীর অব্যাহত ভাঙনে বিলীনের মুখে  রয়েছে। এ ছাড়া সম্পূর্ণ বিলীন হওয়া ৩৬০ মিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।

আগস্ট মাসে অধিক উচ্চতায় জোয়ার প্রবাহিত হওয়ার জেলার প্রায় ৯ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর মধ্যে বরগুনা সদর উপজেলায় তিনটি স্থানে ৫ কিলো ৪৫ মিটার। পাথরঘাটা উপজেলার কালমেঘা, ছোনবুনিয়া নামক এলাকায় এক কিলো ২৬৩ মিটার, বামনার উপজেলায় অযোধ্য, কালিকাবাড়ী এলাকায় ৪৩৬ মিটার, তালতলীতে ১ কিলো ২১০ মিটার এবং বেতাগী উপজেলার বুড়ামজুমদার এলাকায় ২০ মিটার বাঁধ জোয়ারের পানির তোড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যে কোনো সময় এসব বাঁধ ভেঙে নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড বরগুনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার ২২টি পোল্ডারে ৯০৫ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে ঘূর্ণিঝড় আম্পান ২১ কিলোমিটার এবং সম্প্রতি অধিক উচ্চতায় জোয়ার প্রায় ৯ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রভাবে জেলায় প্রায় ৩০ কিলোমিটার বাঁধ বর্তমানে নদীর ভাঙনের মুখে পড়েছে।

এ ছাড়া ৩৬০ মিটার নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয় । এসব বাঁধ সংস্কারের জন্য তিনটি প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থ বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয় আবেদন করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলেই জরুরি ভিত্তিতে বাঁধের সংস্কার কাজ শুরু করবো।

পাথরঘাটার বলেশ্বর নদের তীরে পদ্মা এলাকায় সদর উপজেলার গুলিশাখালী গ্রামের বাসিন্দা খাইরুল আলম স্বপন বলেন, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় কর্তৃপক্ষের বাঁধ নির্মাণের টনক নড়ে। ঝড় থেমে গেলে তাদের আর খবর থাকে না। এ ছাড়া নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করায় এসব বাঁধ দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

একই উপজেলার চরলাঠিমারা গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সাত্তার খান বলেন, বেড়িবাঁধ ঠিক না করায় মানুষের দুঃখ-কষ্ট চোখে দেখার মতো নয়। প্রতিদিন বেলা দুইটার দিকে জোয়ার শেষে পানিতে ভাসতে হয় । যত দ্রুত সম্ভব আমাদের এই এলাকার ভাঙা বাঁধগুলো সংস্কার করা প্রয়োজন।

তালতলী উপজেলার জয়ালভাঙা এলাকার বাসিন্দা আকলিমা বেগম বলেন, জরুরি ভিত্তিতে বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে জোয়ার পানি ঢুকে ঘর-বাড়ি ও ফসল তলিয়ে যায়। এ ছাড়া কোনো সবজি চাষ করতে পারি না। ঘর-বাড়ি ও ফসল রক্ষার ভাঙা বাঁধ নির্মাণ করা উচিত ।

তেতুলবাড়িয়া এলাকার বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন বলেন, আমার ভাঙা গড়ার জীবন, ঘূর্ণিঝড় সিডরে আমারে এই এলাকার বাঁধ নদীতে বিলীনের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ হয়নি। প্রতি বছর ঝড়– জলোচ্ছ্বাসে আমাদের বাড়ি ঘর, ফসলি জমি নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড বরগুনা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী কায়সার আলম বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের, বৃষ্টি ও অমাবস্যার প্রভাবে উপকূলের নদ-নদীতে অস্বাভাবিক জোয়ারের পানির তোড়ে জেলার পাঁচটি উপজেলায় প্রায় ৯ কিলোমিটার বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এ ছাড়া ঘূর্ণিঝড় আম্পানে জেলার আরও ২১ কিলোমিটার বাঁধ নদীতে বিলীনের মুখে পড়েছে। এসব বাঁধের সংস্কারের ও পুনর্নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি আমরা। পেলেই কাজ শুরু করা হবে।