মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়া-যশোর অঞ্চলের কথা উঠলেই বীর সেনানী আবু ওসমান চৌধুরীর নাম বারবার উচ্চারিত হয়। তাকে বাদ দিয়ে কুষ্টিয়া-যশোর তথা ৮ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার সুযোগ নেই।
এই বরেণ্য মুক্তিযোদ্ধা ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি চাঁদপুরের মদনেরগাঁও গ্রামে জন্ম নেন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বিএ পাস করার পর ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন পান। ১৯৬৮ সালের এপ্রিল মাসে তিনি পদোন্নতি পেয়ে মেজর হন।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আবু ওসমান চৌধুরী ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ থেকেই ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস বা ইপিআরের সৈনিক, পুলিশবাহিনীর সদস্য এবং আনসারদের সংগঠিত করেছিলেন। সেই সময়ে এইচ. টি. মাহবুবও ঝিনাইদহে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। আবু ওসমান চৌধুরী সীমান্ত থেকে ইপিআরের মেজর হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ এবং ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, সব সামরিক কর্মকর্তা কিন্তু এ ভূমিকা পালন করেননি। মাত্র কয়েকজন হাতে গোনা সামরিক কর্মকর্তা এ ধরনের ভূমিকা রেখেছিলেন। তাদের মধ্যে আবু ওসমান চৌধুরী অন্যতম।
প্রকৃত অর্থে আবু ওসমান চৌধুরী ও তার সহযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে থেকে বিদ্রোহ করেছিলেন। দেশ যদি স্বাধীন না হতো, তাহলে এ অপরাধের জন্য তাদের মৃত্যুদণ্ড হতো। তিনি সীমান্তের কিছু অঞ্চলকে মুক্তাঞ্চল হিসেবে টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় যে মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়, সে সরকারকে এক প্লাটুন সৈন্য নিয়ে গার্ড অব অনার দেন তিনি। এরপর মুক্তিযুদ্ধের আট নম্বর সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। এপ্রিল মাসে এই সেক্টরের অপারেশনাল এলাকা ছিল কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর ও পটুয়াখালী জেলা। মে মাসের শেষে অপারেশন এলাকা সঙ্কুচিত করে কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনা জেলা, সাতক্ষীরা মহকুমা এবং ফরিদপুরের উত্তরাংশ নিয়ে এই সেক্টর পুনর্গঠিত হয়। আবু ওসমান চৌধুরীর পরে মেজর এম.এ মঞ্জুরকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল কল্যাণীতে। সেক্টরের সৈন্যদের মধ্যে ৩০০০ ছিল নিয়মিত বাহিনী এবং ২৫০০০ গেরিলা সৈন্য। নিয়মিত বাহিনী কয়েকটি এলাকায় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে এবং গেরিলা বাহিনী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কয়েকটি ঘাঁটি গড়ে তোলে। এই সেক্টরের সৈন্যরা যুদ্ধে এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করে। নিয়মিত বাহিনী বাংলাদেশের ৭-৮ মাইল অভ্যন্তরভাগে ঢুকে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে এবং এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যাতে পাকবাহিনী তাদের ওপর আক্রমণ পরিচালনায় উদ্বুদ্ধ হয়। আক্রমণকারী পাকিস্তানি বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে তাদের শক্তিক্ষয় করা হতো এভাবে।
আমি আবু ওসমান চৌধুরীকে মুক্তিযুদ্ধে নির্ভীক ভূমিকার জন্য বিশেষভাবে মূল্যায়ন করতে চাই। এসব সামরিক কর্মকর্তার বিদ্রোহ করা সে সময়ে খুবই জরুরি ছিল। তাদের ভূমিকা আসলেই অনস্বীকার্য। আমরা মেজর নাজমুল হকের কথা ভুলে গিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের ৭ নম্বর সেক্টরের এই কমান্ডার ১৯৭১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মিত্রবাহিনীর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে ভারতের শিলিগুড়ি ক্যান্টনমেন্ট থেকে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানার অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা ছোট সোনা মসজিদের প্রাঙ্গণে মেজর নাজমুল হকের সমাধি রয়েছে। তার মৃত্যুর পর মেজর কাজী নুরুজ্জামানকে ৭ম সেক্টরের নতুন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই একই সেক্টরে সে সময়কার ক্যাপ্টেন রশীদ এবং ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দীন চৌধুরী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। চট্টগ্রামে সে সময়ের মেজর জিয়াউর রহমান বিদ্রোহ করেছিলেন। কুমিল্লায় বিদ্রোহ করেছিলেন তখনকার মেজর খালেদ মোশাররফ। মেজর জলিলও বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে এসব সামরিক কর্মকর্তা আসলেই অসামান্য অবদান রেখেছিলেন।
পাকিস্তান ছিল সামরিক রাষ্ট্র। এরকম রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী যখন বিভাজিত হয়ে যায়, তখন তার সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হয়ে যায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পেছনে প্রথমত বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ কাজ করেছিল এবং দ্বিতীয়ত ইপিআর, পুলিশ এবং বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহ ভূমিকা রেখেছিল। আবার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর সি আর দত্ত ছুটিতে এসেছিলেন। তিনি ফিরে না গিয়ে রণাঙ্গনে যোগ দিয়েছেন। মীর শওকত আলীও একইরকমভাবে রণাঙ্গনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সেক্টর কমান্ডার এবং তাদের অধীনস্থ সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা প্রত্যেকেই মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন।
আমরা যখন ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি এবং শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গণআদালত গঠন করি, তখন আবু ওসমান চৌধুরী নির্ভীকভাবে এবং নিঃশঙ্কচিত্তে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি জাহানারা ইমামকে সাহস জুগিয়েছিলেন। পাশাপাশি, কর্নেল (অব.) কাজী নুরুজ্জামানও যোগদান করেছিলেন। সেক্টর কমান্ডারদের সবাই কিন্তু সে লড়াইয়ে যোগ দেননি। অনেকে অবশ্য আগেই বিভিন্ন কারণে হত্যার শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু এ কয়েকজন সেক্টর কমান্ডার শহীদ জননীর নেতৃত্বাধীন সে লড়াইয়ে যোগ দিয়েছিলেন। আবু ওসমান চৌধুরী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনে নির্ভীক এবং সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন।
আমরা যখন গণজাগরণ মঞ্চ করি, তখনও আবু ওসমান চৌধুরীকে পেয়েছি। আমরা এ কে খন্দকারকেও পেয়েছি। সে সময় এসব মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তার অনেকের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে। মেজর (অব.) রফিকুল ইসলামের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছিল। প্রকৃত অর্থে, মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে দু-একজন বাদে সবারই এ আন্দোলনে সমর্থন ছিল। তারা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী চেতনার শিবিরে থাকায় সরাসরি সমর্থন দিতে পারেননি, কিন্তু তাদের পরোক্ষ সমর্থন ছিল। দলীয় আনুগত্যের জন্য তারা প্রত্যক্ষ সমর্থন দিতে পারেননি। এ কে খন্দকার এবং আবু ওসমান চৌধুরীরা সেদিন আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে যে সাহস জুগিয়েছেন, তা অতুলনীয়। এসব মানুষের সাহসিকতা গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনে পাথেয় ছিল। সেদিন আনিসুজ্জামান স্যারও আমাদের পাশে ছিলেন। তিনি আজ আমাদের মধ্যে নেই, তার ভূমিকাও কিন্তু অসামান্য ছিল। অর্থাৎ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রাখা এসব অগ্রজ যেমন গণজাগরণ মঞ্চে ছিলেন, তেমনি গণআদালতের সময়েও ছিলেন। এমনকি ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানেও তারা ছিলেন। প্রকৃত অর্থে, তারা সব লড়াইয়ের সেনানী।
আবু ওসমান চৌধুরী ১৯৭১-এর রণাঙ্গনেই তার যুদ্ধ শেষ করেননি, তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্যে সরকারকে বাধ্য করার আন্দোলন, প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং মৌলবাদের বিরুদ্ধে সব সময় সরব ছিলেন। তিনি যখন শেষবারের মতো অসুস্থ হলেন, তখন আমার এসব আন্দোলনের জনসভায় তার নির্ভীক কণ্ঠস্বরের কথা মনে হচ্ছিল। দেশের ক্রান্তিকালে এসব মানুষ কিন্তু কোনো রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক মর্যাদার পরিচয়ে বের হন না, তারা দেশপ্রেমিক নাগরিক এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে বেরিয়ে আসেন। এটা কিন্তু আমরা পারি না। তাদের মতো মানুষদের কাছ থেকে এটা শিক্ষণীয়। আমি সবশেষে সদ্য প্রয়াত আবু ওসমান চৌধুরীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, নাট্যনির্দেশক ও চলচ্চিত্রকার