বলকান যুদ্ধে নারী ও শিশুদের জন্য সাহায্য নিয়ে গিয়েছিলেন ম্যাগনাস ম্যাকফারলেন-ব্যারো। ভাই ফারগাসকে নিয়ে সেখানে কাজ করেছেন তিনি। মেরি’স মিলসের মাধ্যমে দুবেলা খাবার দিয়ে ১৬টি দেশের ৬ লাখ দরিদ্র শিশুকে বিদ্যালয়মুখী করেছেন। টাইম ম্যাগাজিনে সবচেয়ে প্রভাবশালীদের তালিকায় ঠাঁই পাওয়া ম্যাগনাসকে নিয়ে লিখেছেন ওমর শাহেদ
মহামারী ‘কভিড-১৯’ থেকে বাঁচতে বিশ্বজুড়ে নিরাপদে থাকতে হচ্ছে সবাইকে। নিজেকে রোগের হাত থেকে বাঁচানোর চেয়েও পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ বেশি উদ্বিগ্ন পরের বেলার খাবার জোগাড় করবেন কীভাবে? সংক্রমণের শুরুর দিকে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রোগটি দ্বিগুণ ক্ষুধার্তের জন্ম দেবে। বাস্তবেও তেমনটাই দেখা যাচ্ছে। বিশ্বের প্রায় ২৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার জ্বালায় জীবনের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। তবে বেশ কয়েকটি দেশে ক্ষুধার হাত থেকে শিশুদের বাঁচাতে এগিয়ে এসেছে মেরি’স মিলস নামে এক প্রতিষ্ঠান। এর প্রধান এক স্কটিশ, নাম ম্যাগনাস ম্যাকফারলেন-ব্যারো।
মাছচাষি থেকে মানবদরদি
জন্ম ১৯৭২ সালে, গ্রেট ব্রিটেনের অন্তর্ভুক্ত স্কটল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলীয় ঐতিহাসিক কাউন্টি আগাইলে। পেশায় আগে ছিলেন মাছচাষি। গ্রামের পুকুরে বিখ্যাত স্যামন মাছ চাষ করতেন। ভালোই কাটছিল দিন। বদলে গেল ১৯৯২ সালে। টেলিভিশনে খবর দেখলেন, বসনিয়ার যুদ্ধে নারী ও শিশুরা মারা যাচ্ছে, ক্ষুধার জ্বালায় তাদের জীবন বিপন্ন। কেঁদে উঠল ২০ বছরের যুবকের প্রাণ। সাহায্যের সিদ্ধান্ত নিলেন ম্যাগনাস ও তার ভাই ফারগাস। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও মানুষের কাছ থেকে নানা সাহায্য সংগ্রহ করে বাড়ির বাগানের একটি ছাউনির নিচে জমাতে লাগলেন। সবাইকে অবাক করে তারা পুরনো ল্যান্ড রোভার গাড়িতে চিকিৎসাসামগ্রীসহ খাবার আর পোশাক নিয়ে চলে গেলেন ইউরোপের যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে। এই ফাঁকে আরও দান এসে জড়ো হতে লাগল ছাউনির নিচে। ফিরে এসে দুই ভাই অবাক। সেগুলোও নিয়ে গেলেন। মোট ২৩ বার বসনিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে গেছেন তারা।
মানবদরদি কাজ করতে গিয়ে প্রথম বছরেই চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে হলো ফারগাসকে। ম্যাগনাসের মাছের ব্যবসাও লাটে উঠল। বাড়ি বিক্রি করে নিজেদের খরচ জোগাতে হলো। তবুও তারা আজীবন অসহায় শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর ব্রত নিলেন। বর্তমানে বিশ্বর সবচেয়ে গরিব দেশগুলোতে শিশুদের নিয়মিত সকাল-দুপুরের খাবার দিয়ে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসছেন। অনন্য এ মানবসেবার জন্য মেরি’স মিলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী হিসেবে ম্যাগনাসকে ২০১০ সালে বিখ্যাত মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন বছরের সেরা ১০ নায়কের একজন নির্বাচিত করেছে। নিজ দেশেও সম্মানিত তারা। ২০১৫ সালে বিখ্যাত মার্কিন সাময়িকী ‘টাইম’ ম্যাগনাসকে বছরের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ জনের তালিকায় ঠাঁই দেয়।
ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাতিসংঘের বৈশি^ক শিক্ষা উদ্যোগের বিশেষ দূত গর্ডন ব্রাউন লিখেছেন, ‘বিখ্যাত আবিষ্কারক-চিকিৎসক ডেভিড লিভিংস্টোন, অলিম্পিকে স্বর্ণজয়ী দৌড়বিদ, তারকা রাগবি খেলোয়াড় এরিক লিডলের মতো গর্ব করার মতো রতœ আছে স্কটল্যান্ডের। ম্যাগনাস ম্যাকফারলেন-ব্যারো, সে পথ অনুসরণ করছেন। তার মেরি’স মিলস কদিনের মধ্যে ১২টি দেশে ১০ লাখ ছাত্রছাত্রীকে খাওয়াবে। কাজের শুরু বসনিয়ায়। পরে মালাউয়ি গেলে ১৪ বছরের এক কিশোর ম্যাগনাসকে জানায়, তার স্বপ্ন হলো একদিন পেট পুরে খাবে। এবার শিশুদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। হাজারো ছেলেমেয়েকে একবেলার খাবার দিয়ে বিদ্যালয়ে পড়তে নিয়ে আসবেন। প্রভাব পড়ল জাদুকরী। সবচেয়ে গরিব একটি দেশের বিদ্যালয়গুলোতে ছেলেমেয়েদের উপস্থিতি ৫০ ভাগ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। তিনি ‘আপ ফর স্কুল’ নামে আরেকটি বিশেষ প্রকল্প পরিচালনা করছেন। তাতে বিশ্বের ৬ থেকে ১১ বছরের মোট ৫৮ কোটি বিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়া ছেলেমেয়েকে আবার ফিরিয়ে আনবেন। ভালো বক্তা তিনি। সাতটি সন্তানের এ পিতা বলেছেন ‘খাবার ও লেখাপড়ার বিনিময়ে শিশুদের ভালো জীবনদানের আগপর্যন্ত বিশ্রাম নেব না।’
তার বই
কাজ ও স্বপ্ন নিয়ে ম্যাগনাসের লেখা বইটির নাম ‘দ্য শেড দ্যাট ফিড অ্যা মিলিয়ন চিলড্রেন দ্য মেরি’স মিলস স্টোরি’। স্বপ্নের বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যে কঠিন, অদ্ভুত পরিস্থিতি, নানা ঘটনা ও বিপর্যয় পেরিয়ে চলছেন সেসবের বর্ণনা আছে ওই বইয়ে। সাধারণ মানুষদের সামান্য কিন্তু অসামান্য ভালোবাসা, সহযোগিতায় কীভাবে বিশ্বের সব শিশুর ক্ষুধাকে দূর করা সম্ভব হচ্ছে সে সম্পর্কেও বিস্তর লিখেছেন তিনি। তার গল্প অন্যদের আশাবাদী করছে।
প্রকাশের পর ম্যাগনাসের বইটি টাইম ও সিডনি টাইমসের বেস্ট সেলার হয়। বিশ^খ্যাত এ শিশুপ্রেমিক যুক্তরাজ্যের দ্য ইউনিভার্সিটি অব হাল, দ্য গ্লাসগো ক্যালেডোনিয়ান ইউনিভার্সিটি, দ্য ইউনিভার্সিটি অব স্টারলিং ও ইউনিভার্সিটি অব এডিনবার্গের সম্মাননা ডিগ্রিতে সম্মানিত। বিভিন্ন সমাবেশ ও মঞ্চে অনেকগুলো উদ্দীপনাময় ছোট ও বড় বক্তব্য তিনি রেখেছেন। খাদ্যের নোবেল ‘ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ-২০১৩’র মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক তিনি। তরুণদের অনেক আয়োজন, উৎসব; খ্রিস্টানদের নানা আলোচনায় আমন্ত্রিত হয়ে বহুবার বক্তব্য রেখেছেন। উদ্যোক্তা, খাদ্য বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের বিভিন্ন সভায় আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে অভিজ্ঞতা, করণীয় জানিয়েছেন। তার স্ত্রী জুলি। স্বেচ্ছাসেবা করতে গিয়েই তার সঙ্গে পরিচয়। মেরি’স মিলের অন্যতম নিবেদিতকর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠাতার নজরকাড়ার পর তারা বিয়ে করেন।
বিনামূল্যের খাবার
শুরুতে এ সংস্থার নাম ছিল ‘স্কটিশ ইন্টারন্যাশনাল রিলিফ’ (এসআইআর)। ২০০২ সালে আফ্রিকার মালাউয়ির কিশোরটির পেট পুরে খাওয়ার ইচ্ছের কথা শুনে ম্যাগনাস এ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তখনই সিদ্ধান্ত নেন, বিনা খরচে খাইয়ে শিশুদের বিদ্যালয়ে এনে লেখাপড়ায় আগ্রহী করে তুলবেন। দেশটিতে প্রায়ই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গ্রামনির্ভর কৃষি অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৮ বছর আগে প্রথম উদ্যোগেই দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ২০০ শিশুকে খাবার দিয়ে মৌলিক শিক্ষাগ্রহণের পথ করে দিয়েছিলেন। তারা দুই ভাই বিশ্বজুড়ে বিনা পয়সায় খাওয়ানোর প্রচারণা চালিয়ে শতাধিক দেশের বিদ্যালয়ে মোট ১০ লাখ শিশুর দুই বেলা খাবারের জোগান দিয়েছেন।
ম্যাগনাস ও ফারগাস ধর্মপ্রাণ ক্যাথলিক খ্রিস্টান। একসময় এসআইআরের নাম বদলে রাখেন ‘মেরি’স মিলস’ (মাতা মেরির দেওয়া খাবার)। তবে তার সংগঠন ধর্মচর্চা করে না, শিক্ষা ও জীবনের জন্য কাজ করে। তাদের শিক্ষার্থীদের পরিবারগুলো খুব গরিব, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করানোর সামর্থ্যটুকুও নেই। বাড়িতে পড়ার তেমন পরিবেশ নেই, উৎসাহও নেই। বরং কাজে দিলে সংসার আরেকটু ভালো চলে। এমন ছেলেমেয়েদের বিদ্যালয়ে খাবারের লোভ দেখিয়ে নিয়ে আসছেন। মালাউয়ির পর ধীরে ধীরে কার্যক্রম ছড়াতে শুরু করে। করোনাভাইরাসের আক্রমণের আগপর্যন্ত তারা ১৬টি দেশে ছয় লাখ শিশুকে লেখাপড়ায় মনোযোগী করেছেন। তাদের সবচেয়ে বড় কার্যক্রম এখনো আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্বের দেশ মালাউয়িতে। অন্যান্য দেশের মতোই স্বেচ্ছাসেবী, মা-বাবা ও সমাজের গণ্যমান্যদের নিয়ে শিক্ষকদের সাহায্যে তারা কাজ করছেন। দেশটির মোট ৩০ ভাগ ছাত্রছাত্রীকে বিদ্যালয়ে নিয়ে এসেছে ‘মেরি’স মিলস’। এটা অবিশ্বাস্য সাফল্য। এ মহাদেশের আরেক দেশ লাইবেরিয়াতেও তাদের অসাধারণ সাফল্য আছে। এখানেই তারা দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৭ সালের গৃহযুদ্ধে প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে দেশটি। ভালো করে কথা বলাই শেখেনি দেশটির এমন শিশুদের হাতেও অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়। এ দেশের ৪০ হাজার শিশুকে তারা প্রতিদিন বিদ্যালয়ে নিয়ে আসছেন। এখানেও স্বেচ্ছাসেবী ও শিক্ষকরা তাদের কাজের প্রাণ।
মেরি’স মিলস এখন আফ্রিকা, এশিয়া, প্রশান্ত মহাসাগর ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে কাজ করছে। সেসব দেশের ছেলেমেয়েরা প্রতিদিন সকাল, দুপুরের খাবার পেতে বিদ্যালয়ে যায়। বর্তমানে সংস্থাটির কার্যক্রম পরিচালনায় অর্থ প্রদান করে ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, পর্তুগাল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ক্রোয়েশিয়া ও বসনিয়া-হার্জেগোভিনিয়ার বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি।
প্রতিটি বিদ্যালয়ের পাশে সংস্থাটির রান্নার স্থান নির্ধারণ করা হয়। সাধারণত শিক্ষক ও মা-বাবারা স্বেচ্ছাসেবী জোগাড় করেন। স্বেচ্ছাসেবীরা কেনাকাটা, রান্না ও খাবার বিলির কাজ করেন। তাদের বিশেষ পুষ্টিকর খাবার ভুট্টা দিয়ে ‘লিকুনি ফালা’ বানানোর প্রশিক্ষণ দেয় মেরি’স মিলস। তাদের আরও আছে ‘ব্যাকপ্যাক প্রজেক্ট’। প্রকল্পটির মাধ্যমে শিশুদের স্কুল ব্যাগগুলোকে প্রয়োজনীয় উপকরণে পূর্ণ করে দেওয়া হয়। দেওয়া হয় পোশাক, জুতোও। মালাউয়িতে উদ্যোগটি সফল হয়েছে। এখন খাবারের বিনিময়ে লেখাপড়া শেখানোর ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
মানবতার ডাকে
আর্তমানবতার সেবায় বিভিন্ন দেশে কাজ করছে মেরি’স মিলস। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বলকানের ভয়াল ১০ বছরের সেই যুদ্ধের ভেতরেই স্বেচ্ছাসেবা দিয়েছেন ম্যাগনাস, ফারগাস ও তাদের দল। যুদ্ধের পর সেখানে কাজ করেছেন। তারপর ইউরোপের পুবের দেশগুলোতে; সবচেয়ে বেশি রোমানিয়াতে কাজ করেছেন। সেখানে এইডসে মা-বাবা হারা রোগাক্রান্ত শিশুদের ফেলে রাখা হতো জীর্ণ কুটিরে। সাত বছর বয়সেও তারা হাঁটতে পারত না খাবারের অভাবে। পরে তাদের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা দিয়ে বাঁচানো হয়েছে। সেখান থেকে ‘লুনা হাউস’ নামে বিশেষ ধরনের খেলনা, বইসহ বাড়িতে নিয়ে গিয়েছেন তারা। এখন সেই শিশুরা সাবালক।
২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশে আঘাত হানে প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’। ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষের মৃত্যুর খবর দিয়েছে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো। সে সময় বানের পানি ১০ থেকে ১৫ ফিট উঁচুতে বয়ে গেছে। বগুড়ায় মাটি ও খড়ের পলকা বাড়িঘর ভেঙে ভেসে গেছে। এখানে সর্বস্বান্ত গরিবদের ত্রাণ দিয়েছে মেরি’স মিলস। এলাকাবাসীর আবেদনের পর তাদের নিয়ে ভেঙে পড়া একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে উন্নত নকশায় সাইক্লোন সেন্টার ও বিদ্যালয় ভবন হিসেবে দুই স্তরে গড়ে দিয়েছে। ২০০৮ সালের ২ মে মিয়ানমারে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াল গ্রীষ্মম-লীয় ঘূর্ণিঝড় ‘নার্গিস’ আঘাত হানে। এতে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের মৃত্যুর খবর দেওয়ার পর দেশের সরকার আর কোনো মরার খবর দেয়নি। হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি, সম্পদ হারিয়েছে। বাঁচার কোনো উপায় ছিল না তাদের। দেশটিতে আগে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে নিয়ে কাজে নামে মেরি’স মিলস। তুমুল বন্যায়ও তারা যেতে পেরেছে প্রবল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে। বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় খাওয়ার পানি, খাবার ও পোশাক বিলিয়েছে। পুনর্বাসন প্রকল্পগুলো শুরু করেছে সব সয়ে। ধ্বংস হওয়া তিনটি বিদ্যালয়, একটি এতিমখানা গড়ে দিয়েছে। ফলে অনেক মানুষ ও এতিমদের থাকার, খাবারের জায়গা হয়েছে। ২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি বিকেল ৫টায় ক্যারিবীয় সাগরের পাশের দেশ হাইতিতে আঘাত হেনেছে ৭ মাত্রার ভয়ংকর ভূমিকম্প। এতে প্রায় দুই লাখ মানুষ মারা গেছে। লাখ লাখ পরিবার বাড়িঘর, সম্পদ হারিয়েছে। রাজধানী পোর্ট অব প্রিন্স ধ্বংস হয়ে গেছে। আগে থেকে আমেরিকার এ অংশের সবচেয়ে গরিব দেশটিতে সহযোগী সংগঠনগুলোর মাধ্যমে কাজ করছিল মেরি’স মিলস। রাজধানীতে তাদের দপ্তর ভেঙে পড়ার পাশাপাশি কর্মীরাও মারা গিয়েছিল। দেশের সবচেয়ে গরিবদের বাস পাশের শহর সোলেইতে, সেখানে মেরি’স মিলের আটটি বিদ্যালয়ই ভেঙে পড়ে। ভূমিকম্পের পরপরই হাইতিতে যান ম্যাগনাস। উদ্ধার ও সাহায্য কাজে নেতৃত্ব দেন।
২০১১ সালে আফ্রিকার প্রবল খরায় চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সোমালিয়া। এই দুর্ভিক্ষে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ শিশু মারা যাচ্ছে বলে জানিয়েছিল জাতিসংঘ। ক্ষুধার্তদের সাহায্য, শিশুদের জীবন বাঁচানো, আবার সব গড়ে তুলতে তাদের শান্তিরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে কাজে নেমেছিল দক্ষিণ আফ্রিকার স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘গিফট অব দ্য গিভারস’। মেরি’স মিলসও কাজ করেছে। গিফট অব দ্য গিভারসের শরণার্থী শিবিরগুলোতে ৬০ লাখ ৮০ হাজার প্যাকেট খাবার তৈরি করে পাঠিয়েছে। রাজধানী মোগাদিসুতে লিকুনি ফালা খাইয়ে শিশুদের জীবন বাঁচিয়েছে।
সবার সঙ্গে
‘স্পন্সর অ্যা চাইল্ড’ একটি বিশেষ উদ্যোগ। একটি বিদ্যালয়ের সব শিশুকে খাওয়াতে পারে এর মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দল। মালাউয়ি ও লাইবেরিয়াতে কার্যক্রমটি ব্যাপকভাবে চালু আছে। ভালো চলছে আফ্রিকার আরও দুটি দেশ কেনিয়া ও জাম্বিয়াতে। মেরি’স মিলস কাজ করছে এমন যেকোনো দেশে মাত্র ১৫.৯০ ডলারের দিয়ে একটি শিশুকে সারা বছর সকাল ও দুপুরের খাবার খাওয়াতে পারে দাতা। বিদ্যালয়ে খাবার খেয়ে তার উন্নতির প্রতিবেদনও এ অভিভাবকের কাছে পেশ করে তারা। বিদ্যালয়ের রান্নাঘরে তার এমন কোনো স্মৃতি বা কথা লেখা থাকে যেটি দেখে সব শিশুই উদ্দীপ্ত হয়। কারও স্মৃতি, বিশেষ উদ্দেশ্যেও দাতারা এভাবে দান করে চলেছে। মেরি’স মিলস তাদের দানের টাকায় স্থানীয় বাজারের, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত, শিক্ষিত, তরুণ উদ্যোক্তার পণ্য কেনার চেষ্টা করে। যাতে দেশটির অর্থনীতিকে এগিয়ে দেওয়া যায়।
করোনাভাইরাসের সময়
‘কভিড-১৯’ রোগটি ছড়িয়ে গেল বলে দেশে দেশে শিশুদের বাঁচাতে বিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে ম্যাগনাস ও তার দল সবচেয়ে প্রয়োজনের সময়ে বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারছেন না। তবে কোনো শিশুই না খেয়ে থাকবে না এ মহৎ উদ্দেশ্য থেকে সরে যায়নি সংগঠনটি। এপ্রিল থেকেই তারা খুব দ্রুত কাজে নেমেছে। স্থানীয় সরকার প্রশাসন ও গণ্যমান্যদের সঙ্গে নতুন নতুন উপায়ে শিশুদের খাবার বিলি করছে। একটি হলো গণ্যমান্য ও পিতামাতারা বিদ্যালয়গুলোতে যাওয়া শুরু করলেন। নানা ধরনের দানের খাবার এনে বাড়িতে রান্না করে নিজের এবং অন্য পরিবারগুলোকে খাওয়াচ্ছেন। মেরি’স মিলের স্বেচ্ছাসেবীরা প্রতিটি এলাকায় রান্না করা খাবার বিলি করছেন। সব স্থানে সামাজিক দূরত্বের নিয়মাবলি মেলে কাজ করছেন সবাই। ফলে গত পাঁচ মাস ধরে মেরি’স মিলস বিশ্বের ১৫টির বেশি দেশে শিশুদের খাওয়াতে পারছে। ভারত, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, হাইতি ও মালাউয়িতে কভিড-১৯ রোগের আগে যত শিশুকে খাওয়াত, এখন আরও অনেকের কাছে পৌঁছতে পেরেছে তারা। প্রতিষ্ঠাতা বলেছেন, ‘করোনাভাইরাসের মাস দুই আগেও কোনো কর্মী যদি বলতেন, এত ছেলেমেয়েকে খাওয়ানো যাবে বিশ্বাস করতাম না। তবে এখন আমরা কোনো শিশুকেই অভুক্ত না রাখার অঙ্গীকার পূরণের নতুন উপায় বের করে কাজ করতে পারছি।’ তবে শিশুদের জন্য তার ভালোবাসা কমেনি ‘কখনো কখনো বিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দেওয়ার ভালো কারণ পাওয়া যাবে, কিন্তু শিশুদের খাওয়ানো বন্ধ করার ভালো কোনো কারণ কখনই পাওয়া যাবে না। আমরা সবখানে মানুষের ভালো মানসিকতার ওপর নির্ভর করে এত ভালোভাবে কাজ করে চলেছি। তাদের ছোট ছোট কাজগুলোর পেছনে আছে শিশুদের প্রতি ভালোবাসা। অন্তর থেকে অনুভব করছি, প্রতিটি মানুষ আমার মতো কাজ করছেন দুঃসহ এই দিনগুলোতে।’