চীন-ভারত সীমান্ত উত্তেজনা

অপহরণ-গুলিবর্ষণের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

চীনের বিরুদ্ধে অরুণাচল প্রদেশ থেকে ৫ ভারতীয়কে অপহরণের অভিযোগ করেছে ভারত। প্রদেশটির এক বিধায়ক গত শনিবার প্রথম এই অভিযোগ তুললেও বিষয়টি নিয়ে দুদেশের মধ্যে কথা চালাচালির খবর আসে গত সোমবার। তবে আরও বড় খবরটি আসে গতকাল মঙ্গলবার। গতকাল চীন অভিযোগ করে, ভারতীয় সেনারা বিরোধপূর্ণ সীমান্তে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা ভেঙে ফাঁকা গুলি ছুড়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, চীনের অভিযোগ সত্যি হলে গত ৪৫ বছরের মধ্যে সম্ভবত এই প্রথম ওই এলাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটল। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, দুদেশের সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যেই এ অভিযোগ তুলল চীন। দেশটির দাবি গত সোমবার প্যাংগং হ্রদের দক্ষিণ তীরে দুপক্ষের মুখোমুখি অবস্থানের এক পর্যায়ে এ ঘটনা ঘটেছে।

গতকাল চীনের সামরিক বাহিনীর দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বাহিনীটির পশ্চিমাঞ্চলীয় কমান্ডের মুখপাত্র ঝ্যাং শুইলি জানিয়েছেন, পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে চীনের সীমান্তরক্ষীরা ‘পাল্টা পদক্ষেপ’ নেয়। তবে চীনের সীমান্তরক্ষীদের নেওয়া ‘পাল্টা পদক্ষেপ’ কী ছিল, চীনের সৈন্যরাও সতর্কতামূলক গুলি ছুড়েছে কি না, বিবৃতিতে এসব পরিষ্কার করে বলা হয়নি।

এদিকে অরুণাচল প্রদেশ থেকে ৫ ভারতীয়কে অপহরণের বিষয়ে বিবিসি জানাচ্ছে, গত ৫ সেপ্টেম্বর প্রথম এক টুইটে চীনের বিরুদ্ধে অপহরণের অভিযোগ করেন বিধায়ক তাপির গাও। তবে এ বিষয়ে আর বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি। এরপর ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার এক সদস্য বলেছেন, চীনের সামরিক বাহিনীর কাছে হটলাইনে বার্তা পাঠানো হয়েছে। তবে এই ঘটনার ব্যাপারে ‘বিস্তারিত কিছু জানানোর নেই’ বলে জানিয়েছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

চীনা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান বলেছেন, পেইচিং কখনো তথাকথিত অরুণাচল প্রদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি, এ অঞ্চল দক্ষিণ তিব্বত অঞ্চলে। ওই অঞ্চলে ৫ ভারতীয় নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে ভারতীয় সেনাবাহিনী যে প্রশ্ন করেছে সে সম্পর্কে এখনো আমাদের বিস্তারিত কিছু জানানোর নেই।

গত শনিবার ‘দ্য অরুণাচল টাইমস’ পত্রিকা ওই ৫ ভারতীয় শিকার করতে গিয়ে অপহৃত হয়েছেন বলে খবর প্রকাশ করেছে। তবে তারা কখন নিখোঁজ হয়েছিলেন সেটিও তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার জানা যায়নি। ভারতীয়দের অপহরণের বিষয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, চীনের সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে বার্তা পাওয়ার অপেক্ষায় আছে ভারতের সেনাবাহিনী।

কিন্তু সেই বার্তা দেওয়ার আগেই চীন অভিযোগ করল, ভারতীয় সেনারা লাদাখের বিরোধপূর্ণ সীমান্তে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা ভেঙে ফাঁকা গুলি ছুড়েছে। পিপলস লিবারেশন আর্মির মুখপাত্র সিনিয়র কর্নেল ঝ্যাং শুইলিকে উদ্ধৃত করে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম গ্লোবাল টাইমস জানিয়েছে, ভারতীয় সৈন্যরা ‘বেআইনিভাবে লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি)’ অতিক্রম করে শেনপাও পাহাড়ি এলাকায়, প্যানগং সো লেকের দক্ষিণ তীরে প্রবেশ করেছে। তিনি বলেন, ভারতের এই পদক্ষেপ দুপক্ষের সমঝোতার গুরুতর লঙ্ঘন, ওই এলাকায় উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে...যা সেখানকার প্রকৃতির জন্য খুবই ক্ষতিকর।

তবে ভারতের তরফ থেকে এখনো এই বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য বেইজিংয়ের ভারতীয় দূতাবাসের কাছে রয়টার্সের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হলেও তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি তারা।

পশ্চিম হিমালয় অঞ্চলের ওই স্পর্শকাতর সীমান্তে দুপক্ষই দীর্ঘদিন ধরে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার না করার একটি প্রটোকল মেনে চলছে, তবে এই সমঝোতা মেনে চলা হলেও তা হতাহতের ঘটনা এড়াতে পারেনি।

চীন ও ভারতের মধ্যে ১৯৯৬ সালের একটি সমঝোতা অনুযায়ী, লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোলে কোনো দেশই আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিস্ফোরক বহন করবে না। তবে সৈনিকদের মধ্যে অতীতেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। জুন মাস থেকে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে যখন লাদাখ অঞ্চলে দুদেশের সৈন্যদের মধ্যে সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সৈন্য নিহত হয়। পরে গত আগস্ট মাসে ভারত অভিযোগ করে, সপ্তাহে দু’বার করে সীমান্ত এলাকায় সামরিক উত্তেজনা তৈরি করছে চীন। উভয় অভিযোগই অস্বীকার করে চীন দাবি করেছে, সীমান্ত অস্থিরতার জন্য ভারত দায়ী।

সীমান্তবিরোধ অবসানে গত তিন দশকে দুদেশের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। সর্বশেষ গত ৫ সেপ্টেম্বর মস্কোয় চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। সেখানেও অচলাবস্থা নিরসনের পরিবর্তে দুজনের মধ্যে কথার লড়াই শুরু হয়। বৈঠকের পর চীন বিবৃতি দিয়ে বলেছে, ভারতের ভুলের কারণে সীমান্তে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বেইজিং তার ভূমির এক ইঞ্চিও ছাড় দেবে না। অন্য দিকে ভারত বলেছে, চীন সীমান্তে ব্যাপকহারে সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে। তারা আগ্রাসী আচরণ করে একতরফাভাবে স্থিতাবস্থা নষ্ট করছে।