পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসবে কি না বলা মুশকিল। তবে তাদের দলে ইতিমধ্যেই এমন সব নেতা নিত্যদিন জন্ম নিচ্ছেন যাদের সঙ্গে সমাজের কোনো সম্পর্ক নেই। ভুইফোঁড় এসব নেতাদের মুখনিঃসৃত বাণী শোনা এক অভিজ্ঞতার ব্যাপার। কেউ বলছেন বর্ণপরিচয় লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কারও মন্তব্য করোনাকালে হাসপাতাল নয়, দরকার মন্দির নির্মাণ। কোনো এক ফ্যাশন ডিজাইনার শান্তিনিকেতনে গিয়ে বলে বসলেন মেলার মাঠে যৌন ব্যবসা চলে! আর এই সেদিন বিজেপি সমর্থক বিশ্বভারতীর উপাচার্য স্বয়ং মুখ ফসকে বলে বসলেন ‘রবীন্দ্রনাথের জীবনে তিনজন মনীষীর প্রভাব অপরিসীম রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা মহর্ষি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’ এ নিতান্তই কোনো ছাপার ভুল বলে এড়িয়ে যাবেন না। তিনি ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সামনে চিবিয়ে চিবিয়ে ঠিক এই কথাটাই বলেছেন যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাবার নামও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর!
শান্তিনিকেতন নিয়ে সমস্যা নতুন নয়। সেখানকার অল্পবিস্তর দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, পারস্পরিক খেয়োখেয়ি বহু পুরনো। কবি সমর সেন কবেই আত্মচরিত ‘বাবু বৃত্তান্তে’ লিখেছিলেন ‘‘নিন্দুকেরা বলেন বিশ্বভারতী নাম বদলে এখন হয়েছে ‘বিশ্ব বা রথী’।’’ সেই রথীন্দ্রনাথও অবশ্য টিকতে পারেননি বিশ্বভারতীতে। অনেককেই চলে যেতে হয়েছে স্বপ্নের শান্তিনিকেতন থেকে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যাকে সংগীতের কাণ্ডারি বলতেন সেই শৈলজারঞ্জন মজুমদারকেও অপমানিত হয়ে চলে আসতে হয়েছিল শান্তিনিকেতন ছেড়ে। রবীন্দ্রনাথ বলতেন ‘দীনু ঠাকুর আমার গানের ভাণ্ডারি আর শৈলজা হচ্ছে সকল গানের কাণ্ডারি।’ তার অনেক পরে দেবব্রত বিশ্বাস বিতর্কে বিশ্বভারতীর ভূমিকা কী ছিল তা অনেকেরই জানা। তাই দূর থেকে শান্তিনিকেতন আমাদের সব থেকে আপন এসব শুনতে ভালো লাগলেও বাস্তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বপ্নের বিশ্বভারতীর মৃত্যুঘণ্টা আগেই বেজেছিল। এখন তা পৌঁছেছে চূড়ান্ত পর্যায়ে। আসলে এটাও ঠিক যে চারপাশের সমাজে অবক্ষয় ঘটবে আর শান্তিনিকেতন একটা দ্বীপের মতো রবীন্দ্রনাথের মুক্তচিন্তার পতাকা ওড়াবে এটাই এক অবাস্তব চিন্তা। রবীন্দ্রনাথ এক মস্ত ইন্ডাস্ট্রি, বিরাট বাজার। সেখানে পুঁজি লগ্নি করা মানেই একশো শতাংশ মুনাফা এটা বুঝতে সমাজের উচ্চবর্গের লোকজনের ভুল হয়নি। আমাদের অধিকাংশ উচ্চবর্গের বিশেষত্ব হচ্ছে তারা যা বলেন তা বিশ্বাস করেন না। আর যা বিশ্বাস করেন তা বলেন না। আমরা মনীষীদের মূর্তি গড়ি। ক্যালেন্ডার দেখে জন্ম-মৃত্যুর নির্দিষ্ট দিনক্ষণ মেনে ফুল চড়াই। কিন্তু তার দর্শনকে ভুলেও বিশ্বাস করি না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এখন অধিকাংশ মধ্যবিত্ত বাড়ির কাচের আলমারিতে শো-পিস। একটু আধটু রবীন্দ্র গান, রবীন্দ্র কবিতা পাঠ না করলে প্রগতিশীল হওয়া যায় না। তাই আমরা রবীন্দ্র অনুরাগী সাজতে ভালোবাসি। বাস্তবিক অর্থে হতে চাই না।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সত্যিই স্বপ্ন দেখতেন নতুন এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। যেখানে খোলা আকাশের নিচে শিশুরা প্রকৃতি ও জীবনের পাঠ নেবে। কাছের শ্রীনিকেতনে গড়ে তুলেছিলেন কৃষি গবেষণা কেন্দ্র। তিনি জানতেন যে এদেশের অর্থনীতি প্রায় পুরোটাই কৃষিনির্ভর। ফলে কৃষিচর্চাই হতে পারে জীবনচর্চা। সেই কোনকালে রবীন্দ্রনাথ সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গোসাবা গিয়েছিলেন হ্যামিল্টন সাহেবের সমবায় ব্যবস্থা গরিব মানুষের কীভাবে কাজে লাগে তা দেখতে। সমস্যা হচ্ছে শুধু শান্তিনিকেতন কেন, সর্বত্রই সংঘাতের পেছনে আছে রবীন্দ্র ভাবাদর্শের সঙ্গে তথাকথিত মুনাফা-পুঁজির দ্বন্দ্ব। রবীন্দ্রনাথ যে বিশ্ব মানবতার দর্শনে আস্থাশীল ছিলেন সেই দর্শনটাই তো আজ আক্রান্ত। বিশ্বভারতীর এখন যিনি উপাচার্য তিনি সরাসরি যে দর্শনে বিশ্বাসী তার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্ববীক্ষা শত যোজন দূরে। তাই এখন শান্তিনিকেতনকে কেন্দ্র করে যা কিছু ঘটছে তাতে আমি অন্তত বিন্দুমাত্র অবাক হচ্ছি না।
নব্বই দশকের পর এদেশের মুক্তবাজার অর্থনীতির হাত ধরে যে নব্য ধনী ভদ্রলোক সমাজের উদ্ভব ও বিকাশ, নিঃসন্দেহে দ্রুত বদলে যাওয়া শান্তিনিকেতনের পেছনে তাদের ভূমিকাও কিছু কম নয়। কয়েক বছরের মধ্যে শান্তিনিকেতন হয়ে উঠতে লাগল কলকাতার অভিজাতদের বিলাসের জায়গা; একধরনের উপনিবেশ। একদা হিন্দু বাঙালি মধ্যবিত্তের স্বাস্থ্য উদ্ধার ও বেড়ানোর পাকাপাকি জায়গা ছিল বিহারের দেওঘর, মধুপুর, হাজারিবাগ, কারমাটার প্রভৃতি এলাকা। নকশালপন্থি রাজনীতি বনাম উচ্চবর্গের সংঘাতে অগ্নিগর্ভ বিহার বঙ্গসন্তানদের পছন্দের তালিকা থেকে বাদ পড়ল। নতুন ‘তীর্থক্ষেত্র’ হয়ে উঠল শান্তিনিকেতন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য বলে বাঙালি অস্মিতা টগবগে চেহারা নিল। শান্তিনিকেতনে একটা ছোট্ট বাড়ি করেছি বলার মধ্যেই ফুটে উঠল অহমিকা ও দেখনদারি। এই নব্যধনীরা বদলে দিল স্থানীয় অর্থনীতি-সমাজনীতি। শান্তিনিকেতনকে ঘিরে যে গ্রামজীবন, তাও পাল্টে যেতে লাগল অত্যন্ত দ্রুত। প্রান্তিক গোয়ালপাড়া ঝাঁ-চকচকে আধুনিক হয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দিল স্থানীয় ভূমিসন্তানদের। উন্নয়নের নতুন মডেলের ঠেলায় আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামগুলোর সমাজ-সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন এলো। কৃষি-অর্থনীতির বদলে নগরায়ণের সস্তাশ্রমিক জোগানের মুখ্য ভূমিকা নিতে বাধ্য হলেন আদিবাসী জনজাতির মানুষজন। নতুন নতুন যে টাউনশিপ, মাল্টিস্টোরেড শপিং মল গড়ে উঠেছে তাকে কেন্দ্র করে জন্ম নিল অজস্র নতুন পেশা। দালাল, ফাটকাবাজ, ঠিকাদার, ইট-বালি-সিমেন্টের সিন্ডিকেট, আরও হরেক রকম কারবার। গড়ে উঠল রাজনৈতিক মাফিয়া ও ভূমিদস্যুদের মেলবন্ধন। চারপাশের চমৎকার প্রকৃতির বদলে দেখা যেতে লাগল অত্যাধুনিক হোটেল, রিসোর্ট। সোনাঝুড়ির হাটে শনিবার রবিবার উপচে পড়ল ট্যুরিস্ট ভিড়। কখনো সখনো রাত নামতে না নামতেই রিসোর্টে বাবু মনোরঞ্জনে আদিবাসী লোকসংস্কৃতির আসর বসতে লাগল। আরবান শান্তিনিকেতনের দাপটে কবেই হারিয়ে গেছে পৌষমেলার গা থেকে সহজ-সরল গ্রামীণ গন্ধ। একদা শান্তিনিকেতনের পৃথিবী বিখ্যাত মানুষজনের আড্ডার ঠেক কালোর দোকান এখন আর নিয়মিত খোলে না। পাশের স্থানীয় ‘কফি হাউস’ নবদ্বীপে এখনো তরুণদের ভিড় হয়। তবু সেখানেও কান পাতলে বোঝা যায় কোথাও একটা ছন্দপতন ঘটে গেছে।
শান্তিনিকেতন আজ নিছক স্মৃতির জনপদ। ঘণ্টাঘর, উপাসনাগৃহ, চীন ভবন, কলা ভবন, সংগীত ভবন, রামকিঙ্কর বেইজের অসাধারণ সব ভাস্কর্য। আর আছে অসংখ্য গল্প; সৈয়দ মুজতবা আলী, বিধুশেখর শাস্ত্রী, অনাদি দস্তিদার হয়ে কণিকা বন্দ্যোপধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, অমর্ত্য সেন এরকম কত নাম গল্পের চরিত্র। অবন ঠাকুর, নন্দলাল বোস, রামকিঙ্কর বেইজ এসব নাম তো আছেই। মা এখনো রিকশায় যেতে যেতে তরুণ মেয়েকে দেখান ‘ওই দ্যাখ প্রতীচী। ক্ষিতিমোহন সেনের বাড়ি। তার নাতিই বিশ্ববরেণ্য অর্থনীতিবিদ, নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন।’ কিংবা ‘গুরুপল্লীর এ বাড়িতেই থাকতেন কনিকা বন্দ্যোপধ্যায়।’ স্মৃতি কত দৃশ্য ফিরিয়ে দেয়। তরুণ মোহন সংগীত ভবনে যাচ্ছেন পেছনে পেছনে গুরু শৈলজারঞ্জনের হাতে মাফলার। ছাত্রীর পাছে ঠা-া লেগে না যায় তাই মাফলার নিয়ে ছুটে আসা। সাইকেল চালিয়ে পাশ দিয়ে চলে গেলেন সোমনাথ হোর বা দীনকর কৌশিক। রাণী চন্দের উঠোনে এখনো রয়ে গেছে জামগাছ। শ্যামবাটি পার হয়ে ক্যানালের ধার বড় বেশি হট্টগোল; বর্ষার কোপাইয়ে জল টইটম্বুর। সব আছে কিন্তু কোথায় যেন প্রাণটাই হারিয়ে গেছে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের।
উপাচার্য হয়ে বিজেপি সমর্থক বিদ্যুৎ চক্রবর্তী বিশ্বভারতীতে আসার পর থেকে অশান্তি বাড়ছে। একের পর এক ফতোয়া জারি করে তিনি শান্তিনিকেতনকে কঠিন এক অনুশাসনের নামে পুরোপুরি এক কয়েদখানায় পরিণত করতে চাইছেন। ঐতিহাসিক পৌষমেলার মাঠ পাঁচিল তুলে ঘিরে দেওয়ার চেষ্টা করা নিয়ে হালের অশান্তি শুরু। তা চরমে ওঠে আগস্ট মাসের মাঝামাঝি। আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও অশান্তি যে সহজে মিটবে না তা নিশ্চিত। আসলে সংকট মতাদর্শের। যার কোনো সমাধান নেই। ফলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতন এখন জ্বলন্ত এক আগ্নেয়গিরি। কবে কখন তা বিস্ফোরণ ঘটাবে কেউ তা জানে না। যে মাঠ নিয়ে ‘যৌন ব্যবসা চলে’ বলে অভিযোগ তার নিরাপত্তা কিন্তু উপাচার্যেরই হাতে। কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে সিকিউরিটি খাতে। সুতরাং অগ্ন্যুৎপাত হলে তার দায় শাসক ঘনিষ্ঠ উপাচার্য এড়াতে পারেন না, তা ভুইফোঁড় নেতারা কি জানেন না?
লেখক : ভারতের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা
sdastidar27@gmail.com