গুস্তাভো কুয়ের্তেন : পেলের দেশের টেনিস কিংবদন্তি

জন্ম ব্রাজিলে, অথচ খেলেছেন টেনিস। চমক আরও আছে। গুস্তাভো কুয়ের্তেন ফরাসি ওপেন ছাড়া আর কোনো গ্র্যান্ড স্ল্যাম জেতা দূরে থাক, সেমিফাইনালেও উঠতে পারেননি। লাতিন আমেরিকার আরেক টেনিস তারকা গিলার্মো ভিয়াসের সঙ্গে মিল পাচ্ছেন? ডিয়েগো ম্যারাডোনার দেশ থেকে উঠে আসা ভিয়াস চারটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতেছেন। অথচ কোনো দিন উইম্বলডনের সেমিফাইনালে উঠেতে পারেননি। এটুকু ছাড়া আর্জেন্টাইন ভিয়ার সঙ্গে গুস্তাভোর কোনো মিল নেই।

১৯৭৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ ব্রাজিলের শহর সান্তা কাতারিনার রাজধানী ফ্লোরিনোপলিসে জন্ম কুয়ের্তেনের। কুয়ের্তেনের বাবা আলদো ছিলেন শখের টেনিস খেলোয়াড়। ১৯৮৫তে হার্ট অ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়। দুই বছর ধরে র‌্যাকেট আর বল নিয়ে ঘোরাঘুরি করা কুয়ের্তেনের বয়স তখন ৮ বছর। ওখানেই থেমে যেতে পারত তার টেনিস, যদি না মা সংসারের হাল ধরতেন। কুয়ের্তেন বলেন, ‘পেছনে তাকালে মনে হয় তারকা হওয়ার সুযোগ আমার সামান্যই ছিল। আমি যখন টেনিস খেলা শুরু করি তখন ফ্লোরিনোপলিসে এ খেলার চল ছিল না। আশির দশকে সেখানে টেনিস কোর্ট ছিল মাত্র পাঁচটা। এমন পরিস্থিতিতে আমার বাবার সাহায্য না পেলে টেনিস শুরুই করতে পারতাম না। তখন এবং এখনো আমার বাবাই জীবনের সেরা অনুপ্রেরণা। অল্প বয়সে আমি তাকে হারিয়েছিলাম। আমার মাও আমার কাছে অনুপ্রেরণা। পরিবারের সব দায়িত্ব তিনি নিয়েছিলেন। তার সাহস, প্রতিবন্ধী ভাইয়ের ছোট ছোট প্রচেষ্টা আর বড় ভাইয়ের শান্ত মানসিকতা অনেক সাহায্য করেছে। সর্বোপরি আমার কোচ ল্যারি পাসোস শিখিয়েছিলেন কখনো হাল ছাড়া যাবে না।’

ব্রাজিল তাকে আদর করে ডাকত গুগা নামে। নব্বই দশকের শুরু থেকেই বয়সভিত্তিক সব টুর্নামেন্ট জিতে সারা ফেলেছিলেন কুয়ের্তেন। অচিরেই দেশের র‌্যাঙ্কিংয়ে দুয়ে উঠে আসেন। ১৯৯৬-এ অস্ট্রিয়াকে ডেভিস কাপে হারানোয় ভূমিকা রাখেন। এরপরই ঘটে ফরাসি ওপেনের সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা।

টেনিসে তখন পিট সাম্প্রাসের রাজত্ব চলছে। ফ্রেঞ্চ ওপেনে কুয়ের্তেনকে ফেভারিট ভাবার কোনো প্রশ্নই ছিল না। এটিপি র‌্যাঙ্কিংয়ের ৬৬ নম্বরে তিনি। অথচ সেই তিনি চার সাবেক চ্যাম্পিয়নকে হারিয়ে ১৯৯৭’র ফরাসি ওপেন চ্যাম্পিয়ন। লাল মাটির রোলাঁ গ্যারোঁতে ওটাই ছিল কোনো ব্রাজিলিয়ানের প্রথম শিরোপা। ১৯৬৬ সালে ব্রাজিলিয়ান নারী মারিয়া বুনো ইউএস ওপেন জিতেছিলেন। ৩১ বছর পর কুয়ের্তেনের হাত ধরে আবার গ্র্যান্ড স্ল্যামের স্বাদ পায় ব্রাজিল। কিংবদন্তি বিওন বোর্গের হাত থেকে শিরোপা নেওয়ার সময় কুয়ের্তেন এতটাই অপ্রস্তুত ছিলেন যে পোডিয়ামে উঠতে দেরি হয়েছিল।

সম্ভবত খ্যাতির বিড়ম্বনায় ব্যর্থ হয়েছিলেন গুগা পরের বছর। ’৯৮-র ফরাসি ওপেন খেলতে নেমেই মারাত সাফিনের কাছে হেরে বিদায়। খুব আশা নিয়ে সেই টুর্নামেন্ট কভার করতে প্যারিসে যাওয়া ব্রাজিলীয় সাংবাদিকরা খুব হতাশ হয়েছিলেন। দুই বছর পর তা সুদে-আসলে উসুল করে দিয়েছিলেন কুয়ের্তেন। টেনিসে নিজের সেরা মুহূর্ত জানতে চাইলে কুয়ের্তেন বলেন ২০০০ সালের কথা, ‘সেরা মুহূর্ত অনেক। তবে দুটি বেছে নিতে হলে বলব ২০০০ সালের টেনিস মাস্টার্স কাপের কথা। টুর্নামেন্ট শুরুর সময় নাম্বার ওয়ান হওয়ার পাঁচ ভাগ সুযোগও ছিল না আমার। প্রথম ম্যাচ হেরেছিলাম। পিঠে সমস্যা হচ্ছিল। মনে হয়নি টুর্নামেন্ট শেষ করতে পারব। অথচ চ্যাম্পিয়ন হলাম। অন্যটা ২০০১ সালের ফরাসি ওপেন। মিচেল রাসেলের বিরুদ্ধে খেলতে কোর্টে পা রাখার পর এত ভালো লেগেছিল যে কী বলব। যদিও ওটা ফাইনাল ম্যাচ ছিল না তবু দর্শক অভিবাদন আমাকে আপ্লুত করেছিল।’

টেনিসের হল অব ফেমে ঠাঁই পেয়েছেন কুয়ের্তেন এই তিন ফ্রেঞ্চ ওপেন জিতেই। সাম্প্রতিক টেনিস তারকাদের মধ্যে নোভাক জকোভিচের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পান তিনি। নিজের সময়ে আন্দ্রে আগাসির সঙ্গে লড়াই উপভোগ করতেন। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘মারাত সাফিন, ইয়োভগেনি কাফেলনিকভ এবং আন্দ্রে আগাসির বিপক্ষে কোর্টের লড়াই পছন্দ করতাম। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আমি অন্তত পাঁচবার খেলেছি। হার-জিত নির্ভর করত পরিস্থিতির ওপর। তবে কোর্টে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ছিলেন আগাসি। এছাড়া পিট সাম্প্রাসের কথা বলাবাহুল্য। প্রথমবার তার বিপক্ষে খেলতে নেমে আমি ভলি মারতে ভুলে গিয়েছিলাম। লিসবনে টেনিস মাস্টার্স কাপে আমি কীভাবে যে পিট সাম্প্রাসকে হারিয়েছিলাম এখনো বিশ্বাস করতে পারি না।’

ব্রাজিলিয়ান হিসেবে তার টেনিস কিংবদন্তি হয়ে ওঠা কি আমরা বিশ্বাস করতে পারি? কিংবা কোর্টে তার অবিশ্বাস্য ফোর হ্যান্ড। বুঝতে পারার আগেই যা প্রতিপক্ষের কাছ থেকে পয়েন্ট ছিনিয়ে নিত।