পেঁয়াজের দাম কমাতে সরকারিভাবে আমদানি

ভারী বর্ষণের প্রভাবে সরবরাহে ঘাটতি হওয়ায় ভারতে পেঁয়াজের দাম আরও বেড়েছে। বর্তমানে দেশটির প্রধান পাইকারি বাজার লালসাগাঁওয়ে প্রতি কেজি পেঁয়াজ প্রায় ২৩ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এর প্রভাবে গত তিন সপ্তাহ ধরে দেশের বাজারে চড়ছে এ নিত্যপণ্যটির দাম। সংকট নিরসনে এবার নিজস্ব উদ্যোগেই পেঁয়াজ আমদানি করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সরকারের বিপণন সংস্থা টিসিবি ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্রও আহ্বান করেছে। মন্ত্রণালয় আশা করছে, ভারতের বাজারেই পণ্যটি নিয়ে যা-ই ঘটুক না কেন, জনগণকে এবার ভুগতে হবে না। এছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণ ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য আগামী রবিবার থেকে দেশব্যাপী টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রি শুরু হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত বছর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করলে দেশে পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। তখন সরকার কয়েকটি বড় কোম্পানিকে পেঁয়াজ আমদানির দায়িত্ব দিয়েছিল। কিন্তু তারা সময়মতো তা সরবরাহ করতে পারেনি। ফলে বাজারে সংকট আরও চরমে পৌঁছায়। বাধ্য হয়ে সরকার আকাশপথে জরুরি ভিত্তিতে পেঁয়াজ আমদানি করে। তাই এবার আর সরকার কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। এজন্য টিসিবিকে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছিল।

দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা বিতর্কসাপেক্ষে ২৫-২৭ লাখ টন। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ টন আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়, যার ৯০ ভাগ আসে ভারত থেকে। গত বছর ১৩ সেপ্টেম্বর দেশটি পেঁয়াজ রপ্তানিতে টনপ্রতি সর্বনিম্ন ৮৫০ ডলার মূল্য নির্ধারণ করে দিলে দেশের বাজারেও পণ্যটির দাম বাড়তে থাকে। আর ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করলে অস্বাভাবিকভাবে দেশে পেঁয়াজের দাম বাড়ে। ১৬ নভেম্বর তা কেজিপ্রতি ১৫০ টাকায় পৌঁছায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার জরুরি ভিত্তিতে সরকারি-বেসরকারিভাবে আকাশ, সড়ক ও নৌপথে মিয়ানমার, তুরস্ক, মিসর, চীন ও পাকিস্তান থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে। এ বছর মার্চের দিকে বাজার স্বাভাবিক হয়। তবে ভারতে নতুন করে দাম বাড়ায় গত ২০ আগস্ট থেকে আবারও পেঁয়াজের দাম বাড়তে শুরু করেছে। বর্তমানে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৬৫-৭০ ও ভারতীয় পেঁয়াজ ৫০-৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার এবার পেঁয়াজ আমদানি করলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। গত বছর যে প্রতিষ্ঠানগুলো সংকটকালে পেঁয়াজ আমদানি করেছিল তারাও এবার থাকছে। এছাড়া নিয়মিত আমদানিকারকরাও পেঁয়াজ আমদানি করবে। ইতিমধ্যে আমদানিকারকদের অনুরোধে শুল্ক কমানোর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় চাইছে আগামী অক্টোবর-ডিসেম্বর বাজারে পর্যাপ্ত পেঁয়াজের সরবরাহ রাখতে। এর মধ্যেই বাজারে নতুন পেঁয়াজ উঠে যাবে। তখন আর কোনো সংকট থাকবে না বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভারতের সংবাদপত্র দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ৬ সেপ্টেম্বরের অনলাইন সংস্করণে বলা হয়েছে, মহারাষ্ট্র প্রদেশে গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে পেঁয়াজ ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে ওই প্রদেশের অন্যতম প্রধান পাইকারি বাজার লালসাগাঁওয়ে পণ্যটির সরবরাহ কমে দাম বেড়ে যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত জুলাইয়ে সেখানে প্রতি ১০০ কেজি পেঁয়াজ ৭৫০ রুপিতে বিক্রি হয়েছিল। আগস্টে তা বেড়ে ৮৫০ রুপি হয়। অথচ বর্ষায় কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতি ১০০ কেজি পেঁয়াজের দাম বেড়ে ১ হাজার ৯৬৮ রুপি হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ হাজার ২৭৩ টাকা। অর্থাৎ বর্তমানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ প্রায় ২৩ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশ মূলত এই মহারাষ্ট্র থেকেই পেঁয়াজ আমদানি করে থাকে।

লালসাগাঁও পাইকারি বাজার সমিতির চেয়ারম্যান জয়দুত হোলকার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘আমাদের ধারণা, বর্ষায় আমাদের ক্ষেতে থাকা পেঁয়াজের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বর্তমানে যে দাম আছে তাও আরও কিছুটা বাড়তে পারে।’

হিলিতে এক দিনের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ৫ টাকা : দিনাজপুরের হাকিমপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, মাঝে এক দিন দাম কমার পর আবারও হিলি স্থলবন্দরে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। এক দিনের ব্যবধানে গতকাল প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ৫ টাকা বেড়ে ৩৭-৩৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এছাড়া ওই বন্দরে আমদানির পরিমাণও কমেছে। আগে প্রতিদিন ৪০-৫০ ট্রাক পেঁয়াজ আমদানি হলেও এখন তা কমে ২০-২৫ ট্রাকে নেমে এসেছে।

ওই বন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানিকারক বাবলুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুই সপ্তাহ আগেও এ বন্দরে ১৮-২২ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি হতো; কিন্তু প্রতিদিনই এ দাম বেড়ে চলেছে। আগে নাসিক, ইন্দোর, ব্যাঙ্গালোরসহ বিভিন্ন প্রজাতির পেঁয়াজ আমদানি হলেও এখন শুধু ইন্দোর জাতের পেঁয়াজ আসছে।’

রবিবার থেকে টিসিবির পেঁয়াজ : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল জানানো হয়েছে, ১৩ সেপ্টেম্বর (রবিবার) থেকে দেশব্যাপী স্বল্পমূল্যে পেঁয়াজ বিক্রি করবে টিসিবি। ইতিমধ্যে পেঁয়াজ কেনা ও ডিলার নিয়োগের কার্যক্রম চলছে। তবে ঠিক কতটি ট্রাকের মাধ্যমে ও প্রতি কেজি কত টাকা মূল্যে পেঁয়াজ বিক্রি হবে তা এখনো নির্ধারণ হয়নি। আজ (বৃহস্পতিবার) বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জনসংযোগ কর্মকর্তা লতিফ বকশি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বছর আড়াইশোরও বেশি ট্রাকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। এবারও আমরা সারা দেশে বিক্রি করব। তবে কতটি ট্রাক থাকছে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। নতুন মৌসুমের পেঁয়াজ ওঠা পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কেউ যদি পেঁয়াজ মজুদ করে বাজার কারসাজি করে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন। ইতিমধ্যে বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের তৎপরতা শুরু হয়েছে। এটা চলমান থাকবে।’

টিসিবির মুখপাত্র হুমায়ুন কবির গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ট্রাক সংখ্যা, জনপ্রতি কত কেজি পেঁয়াজ কিনতে পারবে ও মূল্য নির্ধারণ নিয়ে কাজ চলছে। আগামীকাল (আজ বৃহস্পতিবার) এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। আমরা এখন স্থানীয়ভাবে পেঁয়াজ কিনছি। আন্তর্জাতিক দরপত্রের প্রক্রিয়া চলমান আছে।’