জনপ্রিয়তা জয়ের মাপকাঠি নয়

যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী জো বাইডেন জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে ১২ পয়েন্ট বেশি পেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। চলতি মাসের ৩ থেকে ৮ তারিখ পর্যন্ত পরিচালিত এই জরিপে দেখা যায় জো বাইডেনের পক্ষে সমর্থন আছে শতকরা ৫২ শতাংশ ভোটারের আর ট্রাম্পের আছে ৪০ শতাংশ ভোটারের। ইকোনমিস্টসহ বেশ কয়েকটি সংস্থার জরিপেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে গত জুলাই মাস থেকে। তবে নির্বাচনের এখনো যেহেতু প্রায় দুই মাস বাকি, তাই জরিপের হিসাব বদলে যেতে পারে যেকোনো সময়। 

আর জরিপের ফলাফলে বিশেষ পরিবর্তন না এলেও যে বাইডেন হোয়াইট হাউজে যেতে পারবেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। জনমত বা জনরায় যদি দেশটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত জয়-পরাজয়ে ভূমিকা রাখত তবে ২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হয়ে ইতিহাস গড়তে পারতেন হিলারি ক্লিনটন। 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পদ্ধতি অন্য দেশগুলো থেকে আলাদা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের সরাসরি ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয়টি সব দেশে হলেও যুক্তরাষ্ট্রে বিষয়টি ভিন্ন।

সেখানে সরাসরি ভোট অনুষ্ঠিত হলেও প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের এখতিয়ার তাদের হাতে নেই। তারা মূলত পছন্দের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার মধ্য দিয়ে একটি নির্বাচকমণ্ডলীকে নির্বাচিত করেন। এই নির্বাচকমণ্ডলীর নাম ইলেকটোরাল কলেজ। প্রত্যেক চার বছর অন্তর, নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ পরে ইলেকটোরাল কলেজের নির্বাচকরা একত্রিত হন তাদের দায়িত্ব পালন করার জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী এই পদ্ধতিতেই একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, যা কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারের আইনের জটিল এক সমন্বয়ের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ইলেকটোরাল কলেজের মোট ভোটসংখ্যা ৫৩৮। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে একজন প্রার্থীকে এর ২৭০টি পেতে হয়। প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক ইলেকটোরাল ভোট রয়েছে। কোন অঙ্গরাজ্যে কত ইলেকটোরাল ভোট থাকবে, তা নির্ধারিত হয় সেখানে কতটি কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট রয়েছে, তার মাধ্যমে। প্রতিটি কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের জন্য একটি করে ভোট এবং দুজন সিনেটরের জন্য দুটি ভোট বরাদ্দ থাকে। ইলেকটোরাল কলেজ পদ্ধতিতে প্রত্যেকটি রাজ্যের হাতে থাকে কিছু ভোট। কোন রাজ্যের কতজন ইলেকটোর বা নির্বাচক থাকবেন সেটা নির্ভর করে ওই রাজ্যের জনসংখ্যার ওপর।

সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে। ফলে এই রাজ্যে ইলেকটোরের সংখ্যা সর্বোচ্চ, ৫৫। ছোট ছোট কিছু রাজ্য এবং ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ার আছে তিনটি করে ভোট। আলাস্কা এবং নর্থ ড্যাকোটা রাজ্যের হাতেও তিনটি করে ভোট।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিন প্রার্থীরা সারা দেশে ভোটারদের কাছ থেকে যেসব ভোট পান সেগুলোকে বলা হয় পপুলার (জনপ্রিয়) ভোট এবং ইলেকটোরাল কলেজের ভোটকে বলা হয় ইলেকটোরাল ভোট। কোনো একটি রাজ্যে যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি পপুলার ভোট পাবেন তিনি ওই রাজ্যের সবগুলো ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে যাবেন।

গত পাঁচটি নির্বাচনের মধ্যে দুটোতেই কম পপুলার ভোট পেয়েও ইলেকটোরাল কলেজ পদ্ধতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জর্জ বুশ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে প্রায় ৩০ লাখ কম পপুলার ভোট পেয়েও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। ট্রাম্পের আগে ২০০০ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রাথী আল গোর সারা দেশের মোট ভোটের ৪৮.৩৮ শতাংশ অর্জন করেন। জর্জ বুশ পান ৪৭.৮৭ শতাংশ। তার পরও জর্জ বুশ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, কারণ তিনি ২৭১টি ইলেকটোরাল ভোট পান যেখানে গোর পান ২৬৬টি।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে যখন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন দেশটির বিশাল আকার ও বিভিন্ন প্রান্তের মধ্যে যোগাযোগ কঠিন হওয়ার কারণে জাতীয়ভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজন করা প্রায় অসম্ভব ছিল। তখনো যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয় ঠিকমতো গড়ে ওঠেনি, অঙ্গরাজ্যগুলোও তাদের নিজেদের অধিকারের ব্যাপারে ছিল অনেক বেশি সোচ্চার, রাজনৈতিক দলগুলোকে সন্দেহের চোখে দেখা হতো এবং পপুলার ভোটকে মানুষ ভয় পেতেন।

সংবিধান প্রণেতারা ১৭৮৭ সালে সংবিধান রচনার সময় কংগ্রেস এবং জনগণের সরাসরি ভোটে (পপুলার ভোট) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুটো ধারণাই বাতিল করে দেন।

তাদের যুক্তি ছিল পপুলার ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে লোকেরা তাদের স্থানীয় প্রার্থীকে ভোট দেবেন এবং তার ফলে বড় রাজ্যগুলো আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে। ছোট ছোট রাজ্যগুলো এই ইলেকটোরাল কলেজ পদ্ধতিকে সমর্থন করে কারণ এর ফলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো এই পদ্ধতির পক্ষ নেয় কারণ সে সময় এসব রাজ্যে দাসের সংখ্যা ছিল অনেক। দাসদের ভোটাধিকার না থাকা সত্ত্বেও আদমশুমারিতে তাদের গণনা করা হতো। এছাড়া সংবিধান রচয়িতারাও চাননি যে রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে বসে শুধু আইনপ্রণেতারা দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করুক।